আরিফুর রাজু
প্রকাশ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ০৬:০৫ এএম
আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১১:১৮ এএম
পাকিস্তানের মাটিতে পাকিস্তানকেই হোয়াইট ওয়াশ করলো বাংলাদেশ
রাওয়ালপিন্ডিতে সিরিজ আদৌ ভুলতে পারবেন হাসান মাহমুদ? লিটন দাসও কি পারবেন ভুলতে? আর মুশফিকুর রহিম যা করে দেখালেন তাকে কী বলা যায়? অবিশ্বাস্য, অতিলৌকিক না অন্য কিছু! বাংলাদেশের দুই যুগের টেস্ট পথচলায় পাকিস্তানের মতো পূর্ণ শক্তির দলকে হোয়াইটওয়াশ করাটা এখন টক অব দ্য ওয়ার্ল্ড ক্রিকেট। রোমাঞ্চ আর থ্রিলার ভরা সিরিজে অনেক প্রথমের ফুল ফুটিয়েছে বাংলাদেশ। সব মিলিয়ে অনেক ফুলের সমাহারে বিনে সুতোর মালা হয়ে এসেছে বিজয়ের মালা।
সিরিজের প্রথম টেস্ট ১০ উইকেটে জয়, দ্বিতীয় ও শেষ টেস্ট রাঙাতে পারলেই ইতিহাস। এমন উচ্চাশায় বুক বেঁধেছিল টিম টাইগার্স। কিন্তু শেষ টেস্টের প্রথম ইনিংসেই বেকাদায় পড়ে নাজমুল হোসেন শান্ত ব্রিগেড। ২৬ রানে সফরকারীরা খুইয়ে ফেলে ৬ উইকেট। ত্রাণকর্তা হয়ে আসেন লিটন দাস ও মেহেদী হাসান মিরাজ। সপ্তম উইকেট জুটিতে দুজনে মিলে গড়েন ১৬৫ রান। মিরাজ ৭৮ রানে বিদায় নিলেও সাবলীল ছিলেন লিটন। এই উইকেটরক্ষক ব্যাটার শেষ পর্যন্ত সেঞ্চুরি তোলেন, ১৩৮ রানে সাজঘরমুখো হন।
পিন্ডিতে লিটন-মিরাজের জুটিতে নতুন বিশ্বরেকর্ড তৈরি হয়। ১৪৭ বছরের লাল বলের ইতিহাসে ৫০ রানের কমে ষষ্ঠ উইকেট পতনের পর সপ্তম উইকেটে সবচেয়ে বড় জুটি এটি। এর আগে ৫০ রানের কমে ৬ উইকেট খোয়ানোর পর সপ্তম উইকেটে সর্বোচ্চ জুটিটি ছিল ১১৫ রানের। সেই রেকর্ডটিও হয়েছিল পাকিস্তানে। এবার সেটি টপকে গেলেন বাংলাদেশের লিটন-মিরাজ।
প্রথম ইনিংসে মিরাজের সঙ্গে গড়া লিটনের রেকর্ড জুটিতে বাংলাদেশ উদ্ধার হয়েছিল ঠিকই, শঙ্কা জাগে দলীয় স্কোর নিয়ে। লিটনকে সঙ্গ দেওয়ার মতো স্বীকৃত ব্যাটার ছিল না লেজের সারিতে। তাসকিন আহমেদ ১ রান করে আউট হলে শঙ্কাটা জোরালো হয়। তবে নবম উইকেটে হাসান মাহমুদ ক্রিজে সেট হলে কিছুটা নির্ভার হন লিটন। নিজের চতুর্থ সেঞ্চুরি তো তোলেনই, সঙ্গে দলীয় স্কোর ২৬২ রানে টেনে তোলেন লিটন। একই সঙ্গে দখল নেন একটি নতুন রেকর্ড। লিটনের চার সেঞ্চুরির তিনটিই দলের বিপর্যয়কালে। দলের স্কোর পঞ্চাশের কম থাকা অবস্থায় ব্যাটিং অর্ডারে পাঁচের নিচে নেমে তিনটি সেঞ্চুরি করা বিশ্বের প্রথম ব্যাটসম্যান তিনি।
পরতে পরতে উত্তেজনা ছড়ানো শেষ টেস্টে আরেকটি বিরাট অর্জন হয় বাংলাদেশের পেসারদের। চতুর্থ দিনে নিজেদের দ্বিতীয় ইনিংসে ১৭২ রানে অলআউট হয় পাকিস্তান। যার সব উইকেট যায় তিন টাইগার পেসার হাসান মাহমুদ, নাহিদ রানা ও তাসকিন আহমেদের পকেটে। টেস্টে এই প্রথম এমন ঘটনা ঘটালেন বাংলাদেশের পেসাররা। ৫ উইকেট তোলেন হাসান, ৪ উইকেট নেন আরেক পেসার নাহিদ ও তাসকিন আহমেদ তোলেন একটি। এটাই প্রথম হলেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এর আগে ওয়ানডেতে আরও দুবার এই কীর্তি গড়েন বাংলাদেশের পেসাররা।
পেসারদের কীর্তির মধ্যে আলাদাভাবে বলতে হয় হাসান মাহমুদের কথা। বাংলাদেশের সপ্তম (সব মিলিয়ে) পেসার হিসেবে টেস্টে এক ইনিংসে ৫ উইকেট তুলেছেন হাসান। পাকিস্তানের মাটিতে তো বটেই, পাকিস্তানের বিপক্ষে তিনিই প্রথম। টেস্ট ক্রিকেটে পাকিস্তানের বিপক্ষে ৫ উইকেট শিকার করা আগের বাংলাদেশিদের সবাই ছিলেন স্পিনার। মাত্র তৃতীয় টেস্ট খেলতে নামা হাসানের এটিই প্রথম ৫ উইকেট।
দ্বিতীয় ইনিংসে হাসান প্রথম ফাইফারের দেখা ফেলেও প্রথম ইনিংসে পাঁচ উইকেট পূর্ণ করেন মিরাজ। ৬১ রানে ৫ উইকেট নেন বাংলাদেশের ডানহাতি অফ স্পিনার। মিরাজ এ নিয়ে ইনিংসে পাঁচ উইকেট পেলেন দশবার। প্রথম ইনিংসে ব্যাট হাতেও আরেকটি কীর্তি গড়েন। ৮ নম্বর বা এর পরে নেমে টেস্টে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ফিফটির মালিক তিনি। সাতটি সেঞ্চুরি আছে তার ৮ নম্বর বা এরপরে নেমে ব্যাটিং করে। এতদিন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের সঙ্গে যৌথভাবে প্রথম ছিলেন। রাওয়ালপিন্ডিতে ছাড়িয়ে গেলেন সেটিও।
অনেক প্রথমের মাঝে অনার্স বোর্ডে নাম লেখানোর পাল্লাটাও ভারি বাংলাদেশের। দুই ম্যাচ সিরিজে মুশফিকুর রহিম, লিটন দাস, হাসান মাহমুদ ও মেহেদী মিরাজ এই চারজন নাম লিখিয়েছেনÑ অনার্স বোর্ডে। শুরু থেকে শেষ, শঙ্কা-ডরহীন হয়ে ওঠা আলো ঝলমলে ট্রফি মঞ্চের পথটাও কিন্তু কম চ্যালেঞ্জের ছিল না। রোদ-বৃষ্টি লুকোচুরি, কন্ডিশন শঙ্কা মাড়িয়ে প্রথমের একেকটি ফুল দিয়েই বিজয়ের মালা গেঁথেছে বাংলাদেশ।