হেলাল নিরব
প্রকাশ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ২১:১৮ পিএম
টেস্ট সিরিজ জয়ের পর উল্লাস। সেরাদের সেরা খুঁজতে বললে কোন দুজন বেছে নেবেন?— সংগৃহীত ছবি
পাকিস্তানের সাবেক ক্রিকেটার বা মিডিয়া যখন শান মাসুদদের পিন্ডি চটকাবেন, তখন নিশ্চিতভাবেই থাকবে দুটি নাম— লিটন দাস ও মেহেদী হাসান মিরাজ। ইতিহাস গড়া সফরে বাংলাদেশের আরও অনেকে নায়ক আছেন, কিন্তু আলাদা করে আসবে এই দুজনের নাম। আরও সোজাসাপ্টা বললে, পাকিস্তানের ভরাডুবির কাণ্ডারি এই দুজন। মিরাজ কখনও ব্যাটে, কখনওবা বল হাতে। উইকেটের সামনে-পেছনে সাবলীল লিটনও ছিলেন মূর্তিমান আতংক। গত দুই সপ্তাহে রাওয়ালপিন্ডি ক্রিকেট স্টেডিয়াম দুই হাত ভরে দিয়েছে দুজনকে। পাকিস্তানের মাটিতে কার্যত থ্রিলার লিখেছেন মিরাজ-লিটন।
পিণ্ডির মাঠ মনে রাখবে লিটনকে। তার মহাকাব্যিক সেই ১৩৮ রানের ইনিংস। আর প্রথম টেস্টে মিরাজের সেই ঘূর্ণি কিংবা হাল না ছাড়ার মানসিকতা। মহামূল্যবান অর্জনের সম্মুখ নেতা হিসেবে বহুদিন পরও উচ্চারিত হবে দুজনের নাম। বিশ্বরেকর্ড গড়া সেই ১৬৫ রানের জুটি কে ভুলবে! পাকিস্তান ভুলে যেতে চাইবে, কিন্তু মিরাজদের বারবার মনে করিয়ে দেবে, ‘এখানেই সাজিয়েছি ইতিহাস।’ অথচ এ বছরে সবচেয়ে বেশি সমালোচিত বোধহয় লিটনই হয়েছিলেন। জায়গা পাওয়ার শঙ্কা এতটুকু হলেও ছিল সিরিজসেরা মিরাজের। পেস আক্রমণের তীর্থভূমিতে কি স্পিনার খেলাবে টিম ম্যানেজমেন্ট? এমনি অসংখ্য প্রশ্ন নিয়ে এই সফরে যায় বাংলাদেশ।
সেরা একাদশে মিরাজ থাকলেন। শুধু থাকলেনই না, রাখলেন নিজের ছাপও। দ্বিতীয় টেস্টের দ্বিতীয় দিনেই নাম ওঠালেন পিন্ডির অনার্স বোর্ডে। এই সফরে সব ঠিকঠাক থাকলে বোর্ডে হয়তো আরও তিনবার লেখা লাগত নিজের নাম। প্রথম টেস্টের প্রথম ইনিংসে মিরাজের ব্যাটে আসে ৭৭ রান। ২৩ রানের আক্ষেপ। ওই টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে বল হাতে ঘূর্ণি। মাত্র ২১ রান দিয়েই ৪ উইকেট। ‘ইশ আরেকটা উইকেট’— আক্ষেপ করতে পারতেন মিরাজ। কিন্তু করেননি। বরং নিজেকে দ্বিতীয় টেস্টের জন্য ঢেলে সাজালেন। মিরাজের দায়িত্ব এবার আরও বাড়ল। বোলিংয়ে মুনশিয়ানা দেখালেন ফাইফার নিয়ে। আগের টেস্টের আক্ষেপ ঘোচালেন, নাম তুললেন অনার্স বোর্ডে। তারচেয়েও বেশি ঐতিহাসিক কিছু করেছেন লিটনকে নিয়ে। বাংলাদেশ যখন দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম ইনিংসে খাদের কিনারে, তখন হাল ধরলেন। প্রায় চার ঘণ্টা ব্যাট করে খেললেন ৭৮ রানের দুর্দান্ত ইনিংস। ইতিহাস ও রেকর্ডের সেই জুটিতে বাংলাদেশ পেয়ে গেল ঘুরে দাঁড়ানোর রসদ।
পিন্ডিতে ইতিহাস গড়ে আগের দিন বলা সেই কথাটিই পুনরাবৃত্তি করেছিলেন লিটন, ‘কৃতিত্ব দিতে হবে মিরাজকে।’ পাকিস্তানকে ব্যাক টু ব্যাক টেস্ট হারানোর পুরস্কার নিয়ে লম্বা সময় কথা বলেন লিটন। হাস্যোজ্জ্বল মুখে একে একে জানান সুখস্মৃতি। শোনান সেই সময়ের পরিকল্পনার গল্প। লিটন খুশি বাংলাদেশের এত বড় অর্জনে। মিরাজের বিশ্বাস, ‘দীর্ঘদিন ধরে দুঃসময় পার করে আসা বাংলাদেশ আবার ঘুরে দাঁড়াবে’
লিটন দাস দুমড়ে-মুচড়ে দিলেন পাকিস্তানকে। ১৩৮ রান এনে যখন থামলেন তখন বাংলাদেশ মাত্র ১২ রান পেছনে। দ্বিতীয় ইনিংসে হাসান-নাহিদ-তাসকিন পেসত্রয়ীর তোপের আগে আনা সেই স্বস্তি প্রভাবক হলো টেস্টে। বাংলাদেশ ১৮৪ রানের লক্ষ্য মামুলি বানিয়ে বসে। কোনো রকম ভুলচুক না করেই টেস্ট জয়। প্রথম টেস্টে ১০ উইকেটে জেতার পেছনেও ছিল লিটনের হাত। ওই টেস্টেও লিটন-মিরাজের জুটি ছিল। লিটন সেদিন ৫৬ রান করেছিলেন। স্ট্যামের পেছনে দুটি স্টাম্পিং বাদেও নিয়েছিলেন চারটি ক্যাচ। দ্বিতীয় টেস্টেও স্বমহিমায় লিটন।
এবারও পাকিস্তানের ছয় ব্যাটারকে আউট করতে অবদান রেখেছেন লিটন। এটা একটা রেকর্ডও। বাংলাদেশের হয়ে আগে কোনো উইকেটকিপার ব্যাটার এতটি উইকেট নেওয়াতে অবদান রাখতে পারেননি। মিরাজেরও হয়েছে হালিখানেক রেকর্ড। এসব হিসাবনিকাশ পরিসংখ্যান বাদ রাখলেও ১৬৫ রানের জুটির জন্য লিটন-মিরাজকে মনে রাখবে পিন্ডি। টেস্ট ইতিহাসে ৫০ রানের নিচে ৬ উইকেট হারানোর পর কোনো দল এত বেশি রান করতে পারেনি। ওই জুটিটি ছিল টেস্ট ইতিহাসে সপ্তম উইকেটে সর্বোচ্চ।
বাংলাদেশ যখন মঙ্গলবার পিন্ডিতে ইতিহাস গড়ার দ্বারপ্রান্তে, তখন পাকিস্তান নারী দলের সাবেক অধিনায়ক ও ধারাভাষ্যকার উরুজ মুমতাজ একটা পরিসংখ্যান মনে করিয়ে দিয়েছিলেন। প্রথম ইনিংসে ২৬ রানে ৬ উইকেট হারানো কোনো দল আগে কখনও টেস্ট জিততে পারেনি। যা কেউ পারেনি সেটাই করেছে বাংলাদেশ।
পিন্ডিতে ইতিহাস গড়ে আগের দিন বলা সেই কথাটিই পুনরাবৃত্তি করেছিলেন লিটন, ‘কৃতিত্ব দিতে হবে মিরাজকে।’ পাকিস্তানকে ব্যাক টু ব্যাক টেস্ট হারানোর পুরস্কার নিয়ে লম্বা সময় কথা বলেন লিটন। হাস্যোজ্জ্বল মুখে একে একে জানান সুখস্মৃতি। শোনান সেই সময়ের পরিকল্পনার গল্প। লিটন খুশি বাংলাদেশের এত বড় অর্জনে। মিরাজের বিশ্বাস, ‘দীর্ঘদিন ধরে দুঃসময় পার করে আসা বাংলাদেশ আবার ঘুরে দাঁড়াবে।’ পাকিস্তান জয় করে আসা নাজমুল হোসেন শান্তরা কি দেশের টেস্ট ইতিহাসের সবচেয়ে দারুণ সময় পার করে আসছেন? প্রশ্ন থাকতে পারে। কিন্তু যেভাবে টেস্টের গতিপথ বদলে দিয়েছেন মিরাজ-লিটন, তা হয়ে থাকবে দৃষ্টান্ত।