প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২১ আগস্ট ২০২৪ ২১:৩৮ পিএম
আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০২৪ ১৮:৪৫ পিএম
পাপন ছিলেন ক্রিকেট বোর্ডের একমাত্র স্ক্রিপ্ট রাইটার— সংগৃহীত ছবি
‘ডাক্তার আমাকে ক্রিকেট থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দূরে সরে যেতে বলেছে’ কিংবা ‘আমি আর বেশি দিন নাই’ — এই বাক্য দুটি শুনেছেন নিশ্চয়ই! ওসব কোনোভাবে বাদ পড়লেও ক্রীড়াপ্রেমী হিসেবে কানে একবার হলেও বেজেছে, ‘আমাদের টার্গেট নেক্সট ওয়ার্ল্ড কাপ, নট দিস ওয়ার্ল্ড কাপ।’ উপরের বাক্য তিনটির জনক কে, বুঝতে পেরেছেন? ঠিক ধরেছেন। নাজমুল হাসান পাপনের কথা বলা হচ্ছে এখানে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে যিনি আষ্টেপিষ্টে রেখেছিলেন। যার একনায়কাত্বন্ত্রে কেউ টু শব্দটি করার সাহস পেতেন না। বস ইজ দেয়ার (বিসিবি) অলওয়েজ রাইট।
মহাপরাক্রম বিসিবি বসের পতন হয়েছে। প্রধানমন্ত্রিত্ব হারিয়ে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালানোর পরই কম্পিত হয়েছে বোর্ড প্রেসিডেন্টের চেয়ার। যা সমূলে উৎপাটিত হয়েছে গতকাল বুধবার। দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী নাজমুল হাসান এমন একজনের কাছে ক্ষমতা হারিয়েছেন, যিনি একসময় তার বোর্ডের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়েছিলেন। দল নির্বাচনে বিসিবির হস্তক্ষেপ এবং দ্বি-স্তরবিশিষ্ট নির্বাচক কমিটির ফর্মুলার তীব্র বিরোধিতা করেন তখনকার প্রধান নির্বাচক ফারুক আহমেদ। পরে তিনি পদত্যাগই করে বসেন। আজ ভাগ্যের ফেরে সাবেক সেই প্রধান নির্বাচক বসেছেন বোর্ড সভাপতির আসনে।
২০১২ সালে সরকার-মনোনীত হয়ে বিসিবি সভাপতি হন পাপন। ২০১৩ সালের নির্বাচনের পর গতকাল পদত্যাগের আগ পর্যন্ত ছিলেন সভাপতি। তিন মেয়াদে দায়িত্ব নিয়ে বিসিবিতে নিজের সাম্রাজ্য খুলে বসেন। গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে ছিলেন আত্মগোপনে। শুধু তিনিই নন, তার আস্থাভাজন নাইমুর রহমান দূর্জয়সহ বোর্ডের প্রভাবশালী কয়েকজন পরিচালকও নিরুদ্দেশ। গতকালের জরুরি বোর্ড সভায় ছিলেন না চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আ জ ম নাসির ও সদ্য বিলুপ্ত হওয়া সংসদেরই একজন সদস্য শফিউর রহমান নাদেল। দুজনেই বোর্ডে ছিলেন প্রভাবশালী। খোদ বিসিবিপ্রধান পাপনেরও ছিল কয়েকটি পরিচয়। প্রথমত, তিনি ছিলেন বাংলাদেশের সবচেয়ে ধনী ক্রীড়া সংস্থার সভাপতি, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রিত্ব করতেন। ছিলেন সংসদ সদস্য। একাধারে কাজ করতেন বেক্সিমকোর উচ্চ পদে। এত কিছু করতে গিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেটকে তিনি এলেবেলে করে ছাড়েন।
পাপন ছিলেন ক্রিকেট বোর্ডের একমাত্র স্ক্রিপ্ট রাইটার। তিনিই দিতেন ভয়েস, তার হাতেই হতো সব ধরনের এডিটিং। প্রুফ চেকের ব্যাপারটাও করেছেন নিজ হাতে। তিনিই ছিলেন দশভুজা। সর্বেসর্বা। তার মতের বাইরের কোনো কিছুকেই ঠাঁই দিতেন না মিরপুরে। বোর্ডপ্রধান শুধু বোর্ড চালাননি, কথা বলেছেন টস, ম্যাচ থেকে অধিনায়কত্ব নির্বাচন নিয়েও। গুঞ্জন আছে, কোচ নির্বাচন বা বাদ দেওয়া সবকিছুই হতো তার ইচ্ছায়। নাজমুল হাসান পাপনের বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেইÑ পরিচালনা পর্ষদ গঠনে ক্ষমতার দাপট দেখানো, সংগঠকদের ওপর ছড়ি ঘোরানো, আঞ্চলিক ক্রিকেট ও কাউন্সিলরশিপে পক্ষপাতিত্ব, নির্দিষ্ট খেলোয়াড় কিংবা ব্যক্তিকে হেনস্থা থেকে শুরু করে প্রায় সব ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করতেন। নিজের পছন্দের ব্যক্তিকেই তার কাছে সবচেয়ে সেরা ও যোগ্য মনে হতো এবং তিনি তাকেই ক্ষমতার অধীন করতেন। এমন অবস্থায় ‘জী হুজুর, জী হুজুর’ করা ওই সংগঠক কখনও তার বিরুদ্ধে যেতেন না। তা ছাড়া বোর্ড থেকে অনৈতিক সুবিধা তো ভূরি ভূরি আছেই। কাউন্সিলরদের হাত করতে খসাতেন মোটা অঙ্কের টাকাও। শুধু ক্রিকেটটাই থাকত অনাদরে, অবহেলায়।
তার একযুগীয় আমলে পাপ-নামায় যোগ হতে পারে কয়েকটি স্টেডিয়ামের অকালমৃত্যু। খুলনার শেখ আবু নাসের স্টেডিয়াম, বগুড়ার শহীদ চান্দু স্টেডিয়াম কিংবা নারায়ণগঞ্জের খান সাহেব ওসমান আলী স্টেডিয়ামগুলো এখন ক্রিকেটহীন ভাগাড়। তার সময়ে আড়ালেই থেকেছে দেশের কোচেরা। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তাদের জায়গা হয়নি বিসিবির কোথাও। উল্টো কাড়ি কাড়ি অর্থ ঢালা হয়েছে বিদেশি কোচের পেছনে। তার ওপর কোচ নিয়োগে লবিংয়ের অভিযোগও ছিল বেশ। স্টেডিয়ামগুলোতে খেলা দেওয়ার বদলে মুজিববর্ষ উপলক্ষে খরচ করা হয়েছে কোটি কোটি টাকা। উল্টো খেলোয়াড়দের আন্দোলন করতে হয়েছিল বেতন বৃদ্ধির জন্য। মাঠকর্মী থেকে শুরু করে বিসিবিতে নিয়োগের ব্যাপারেও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ আছে পাপনের বিরুদ্ধে। খেলোয়াড় ও একের পর এক কোচকেও বিদায় নিতে হয়েছে অপমান সহ্য করে। মতের এবং মনের মতো না হলে বসে থাকতে হয়েছে ডাগ আউটে। ঝরে পড়েছে হাজারো সম্ভাবনা। দেশের বাকি সব স্টেডিয়াম যখন ধুঁকছিল তখন পূর্বাচলে শেখ হাসিনা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে পরামর্শকের জন্যই তার বোর্ড খরচ করেছিল ৭৬ কোটি টাকা। আঞ্চলিক ক্রিকেট এবং অবকাঠামোগত মানোন্নয়নের কথা বলে অপব্যয়ের ফিরিস্তিও আছে লম্বা। মানহীন ঘরোয়া লিগ, পক্ষপাতিত্ব, আম্পায়ারিং এবং বিপিএল আয়োজনের গড়িমসিরও অন্ত নেই। পাপনের পাপনামায় এতকিছু ‘না থাকার’ মাঝেও তৃপ্তির হয়েছিল ৯০০ কোটি টাকার এফডিআর। যা নিয়ে প্রায়ই বড়াই করতেন সাবেক বোর্ডপ্রধান। অবশেষে ‘মায়ার’ এবং ‘ভালোবাসার’ ক্রিকেটকে ছাড়তেই হলো তাকে।
সরকার পতনের পর মন্ত্রিত্ব হারালেও বোর্ড সভাপতির পদে ছিলেন পাপন। গতকাল পদত্যাগপত্র পাঠান ই-মেইলে। অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের জন্য সভাপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারি হস্তক্ষেপে নিষেধাজ্ঞার সম্ভাবনাও ছিল। তবে ক্রিকেট বোর্ডকে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে পাপনের পরবর্তী সভাপতি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বিসিবির গঠনতন্ত্র মেনে। পাপনের সাম্রাজ্যগড়া রাজ্য এবার ফারুক আহমেদের অধীনে।