প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৭ আগস্ট ২০২৪ ২২:১৭ পিএম
আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০২৪ ২২:২৮ পিএম
বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা কোনটি? এমন প্রশ্ন করলে প্রায় সকলেই বেছে নেবেন ক্রিকেটকে। দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের সকলেই ক্রিকেটকে ভালোবাসেন। কিন্তু কঠিন হলেও চরম সত্য এই যে, দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ে এখনও প্রতিনিধিত্ব করেননি কোনো আদিবাসী ক্রিকেটার। নিজের মেধা ও সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়ে এবার সেই দুয়ার খুলেছেন অনিকেত দেব বর্মন। শ্রীমঙ্গল থেকে উঠে আসা এই তরুণ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ক্রিকেটার যুব ক্রিকেট লিগে নজর কেড়ে জায়গা পেয়েছেন বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের প্রাথমিক দলে।
অনিকেত অনেক চড়াই উতড়াই পেরিয়ে দেশের ক্রিকেটের সর্বোচ্চ পর্যায়ে এসেছেন। সামনে ভালো করলে ইতিহাসের পাতায় আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে যাবেন। বেশ লম্বা ও লিকলিকে স্বভাবের এই তরুণের স্বপ্নটাও এখন বেশ বড়। একদিন লাল-সবুজের জার্সি গায়ে জড়াতে চান ডানহাতি এই পেসার। শনিবার মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের সবুজ গালিচায় নিজের সেই স্বপ্নের কথাই শোনালেন যুব দলের ক্যাম্পে সুযোগ পাওয়া এই ক্রিকেটার, ‘আমি একদিন বাংলাদেশ দলের হয়ে খেলব।’
ক্রিকেটে আসার পিছনের গল্প বলতে গিয়ে অনিকেত বলেন, ‘ছোট বেলায় খেলাধুলা ভালো লাগতো। বড় ভাইদের সঙ্গে খেলতাম। তখন হাত ভেঙে বোলিং করতাম। ক্লাস ফাইভে ওঠার পর পড়াশোনার জন্য শহরে (শ্রীমঙ্গলে) চলে আসি। পড়াশোনার পাশাপাশি আমি খেলাধুলা করতাম। তখন একটা একাডেমিতে ক্রিকেট বলে অনুশীলন করতাম। মৌলভীবাজারের হয়ে অনূর্ধ্ব-১৬ দলে ট্রায়াল দিয়েছিলাম। ট্রায়ালে টিকেছিলাম কিন্তু স্কোয়াডে সুযোগ পাইনি। একই সঙ্গে আমি লিগে অংশ নেই। সেখানে স্যাররা আমার বোলিংয়ের প্রশংসা করেন। আমি তখন বয়সভিত্তিক দলে নাম দেই। হবিগঞ্জ দলের হয়ে অংশ নেই। সেখানে আমি ভালো করি। এরপর বিভাগীয় দলে আমি সুযোগ পাই। সেখানে ভালো করায় আমি যুব ক্রিকেট লিগে সুযোগ পাই। সেখানেও আমার বোলিং ভালো হওয়ায় আমাকে এখানে (অনূর্ধ্ব-১৯ দলের ক্যাম্পে) সুযোগ দেওয়া হয়েছে।’
হবিগঞ্জ জেলার বাহুবল থানাধীন আদিবাসীদের গ্রাম খালুগুচিয়ার ছেলে অনিকেত। পিছিয়ে থাকা সেই জনপদের মানুষের খেলাধুলার আগ্রহ বলতে কেবলই ছিল ফুটবল। ক্রিকেট সেখানে যেন বিলাসিতা। অথচ ছোটবেলা থেকে ঘরে থাকা সাদা কালো টিভিতে শোয়েব আক্তার, ব্রেট লি আর তাসকিন আহমেদদের বোলিং দেখে অনিকেতের পেসার হওয়ার উড়াল দেওয়ার শুরু। শুরুতে পরিবারকে পাশে পাননি। এখন পরিবারই তার অনুপ্রেরণার নাম।
অনিকেত বলেন, ‘আমি সব সময়ই পেসার ছিলাম। পরিবার থেকে কোনো সাপোর্ট পাইনি। আমি তখন পালিয়ে পালিয়ে খেলতাম। আমাকে বাসা থেকে এসে নিয়ে যেত (পাড়ার বন্ধুরা)। বাবা খেলতে না করতেন। বলতো, খেলে কি করবে? বকা দিত। আমাকে মারতোও। এখন বলে আগে খেলে আসো। আমি যখন বিভাগীয় দলে খেলছি তখন থেকে আমার পরিবার সাপোর্ট করা শুরু করেছে।’
অনিকেত শৈশবের গল্পও শোনালেন, ‘ছোট বেলায় আমার বাসায় সাদা কালো টিভি ছিল। টিভিতে ক্রিকেট খেলাই বেশি দেখা হতো।ভারতের খেলাই বেশি দেখা হতো। মোটামুটি সব খেলোয়াড়ের নাম জানতাম। ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা জন্মায়। তখন থেকেই বড় ভাইদের সঙ্গে খেলতাম। আমার আইডল বাংলাদেশের তাসকিন আহমেদ। পাকিস্তানের শোয়েব আক্তার ও ব্রেট লি।’
খেলাধুলার পাশাপাশি পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন অনিকেত। এবার শ্রীমঙ্গল সরকারী কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছেন। কিন্তু দেশে চলমান রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে তিনটির পর পরীক্ষা দিতে পারেননি। সামনে পরীক্ষা চালু হলে ক্যাম্প ছেড়ে পরীক্ষা দিতে যেতে হবে তাকে। পরীক্ষার পর আবার পূর্ণ মনোযোগে যোগ দেবেন ক্যাম্পে।
আধুনিক ক্রিকেটে ক্রিকেটারদের বুট বাধ্যতামূলক। অথচ খেলা শুরুর দুই বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও অনিকেতের ছিল না কোনো বুট। নিজেই জানিয়েছেন, বুট যে লাগত সেই খবরও তিনি জানতেন না। বিভাগীয় দলে খেলার সুযোগ পেলে বন্ধুর পুরোনো বুট কিনে নেন। এরপর অনেক কষ্টে বাবার থেকে পেয়েছেন এক জোড়া বুট। এখন সেই বুট পায়ে দিয়ে মিরপুরের ২২ গজে বল ছোড়েন দ্রুতগতির এই বোলার।
‘প্রথম যখন খেলতে নেমেছিলাম তখন জানতাম না যে পেসারদের বুট লাগে। এক দুই বছর পর জেনেছি। তখন বিভাগীয় এক দলের ক্রিকেটারের থেকে একটা বুট কিনেছিলাম। পরে বাবা এক জোড়া বুট কিনে দিয়েছিল। শুরুতে অতো ভালো বুট ব্যবহার করতে পারিনি। টাকা দিতে পারিনি। পরে বাবা দিয়েছে।’ - বলতে থাকেন অনিকেত।
অনিকেতের উঠে আসাকে বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য বড় পাওয়া হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। বোর্ডের গণমাধ্যম বিভাগের ডেপুটি ম্যানেজার জাহিদ চৌধুরী যেমনটা বলেছেন, ‘অনিকেত দেব আমাদের জন্য বড় পাওয়া। আমাদের অনূর্ধ্ব-১৯ দলের যেই প্রাথমিক স্কোয়াড আছে সেখানে আছে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী থেকে সেভাবে আমাদের ক্রিকেটার উঠে আসে না। বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য এটা ভালো দিক।’