প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৬ আগস্ট ২০২৪ ২১:১০ পিএম
প্রায় এক যুগ ধরে সাম্রাজ্য চালানো পাপনও অনানুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন দ্রুতই পদত্যাগ করবেন— সংগৃহীত ছবি
বাংলাদেশ ক্রিকেটের আসল অবস্থা দেখতে চেয়েছিলেন নাজমুল হাসান পাপন। ভোটের জন্য তাই কাউন্সিলরদের ধারেকাছেও ঘেঁষেননি। কিন্তু তিনি না ঘেঁষলেও তাকে জাপ্টে রেখেছিলেন ভোটাররা। পরিচালক হলেন, বোর্ড সভাপতিও বনে গেলেন। অনেকটা এমন, কে দাঁড়াবে আমার বিরুদ্ধে! কেউ দাঁড়ায়ওনি। যারাই-বা তার বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করেছিলেন তাদের কেউ ছিটকে গেছেন, কখনও ছুড়ে ফেলা হয়েছে। এক, দুই করে তিনবার বিসিবির সভাপতি হওয়া পাপন গড়ে তুলেছিলেন একক সাম্রাজ্য। তার সেই সাম্রাজ্য এখন সমূলে ভাঙনের মুখে।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের স্ক্রিপ্ট রাইটার ছিলেন পাপন, তিনিই দিতেন ভয়েস, তার হাতেই হতো সব এডিটিং। তাই নিজের মতের বাইরের বা নিজের মনের বাইরের কিছুকে ঠাঁয় দিতেন না মিরপুরে। বোর্ডপ্রধান শুধু বোর্ড চালাননি, কথা বলেছেন টস, ম্যাচ থেকে অধিনায়কত্ব নির্বাচন নিয়েও। গুঞ্জন আছে, কোচ নির্বাচন বা বাদ দেওয়াতে তিনিই ছিলেন সর্বেসর্বা। নাজমুল হাসান পাপনের বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেইÑ পরিচালনা পর্ষদ গঠনে ক্ষমতার দাপট দেখানো, সংগঠকদের ওপর ছড়ি ঘোরানো, আঞ্চলিক ক্রিকেট ও কাউন্সিলরশিপে পক্ষপাতিত্ব, নির্দিষ্ট খেলোয়াড় কিংবা ব্যক্তিকে হেনস্থা থেকে শুরু করে প্রায় সব ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করতেন। নিজের পছন্দের ব্যক্তিকেই তার কাছে সবচেয়ে সেরা ও যোগ্য মনে হতো এবং তিনি তাকেই ক্ষমতার অধীন করতেন। এমন অবস্থায় ‘জী হুজুর, জী হুজুর’ করা ওই সংগঠক কখনও তার বিরুদ্ধে যেতেন না। তা ছাড়া বোর্ড থেকে অনৈতিক সুবিধা তো ভূরি ভূরি আছেই। কাউন্সিলরদের হাত করতে খসাতেন মোটা অঙ্কের টাকাও। দিতেন দামি দামি উপহার। শুধু ক্রিকেটাই থাকত অনাদরে, অবহেলায়।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ক্ষমতার পটে বদল এসেছে। সংস্কারের হাওয়া লেগেছে দেশে। সেই হাওয়ার ঝাপটা স্বাভাবিকভাবেই পড়েছে বিসিবিতে। যার দাপট এতটাই যে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যেতে পারে বিসিবির এতদিন যাবৎ সংরক্ষিত চেয়ার! বিসিবির তিনবারের প্রধান পাপনের আরেকটি পরিচয় তিনি একজন আওয়ামী লিগের নেতা। শেখ হাসিনার সরকারে তিনি ছিলেন যুব ও ক্রীড়ামন্ত্রী। অন্য সব দাপুটে নেতার মতো গা ঢাকা দিয়ে আছেন পাপনও। শুধু তিনিই নন, নাইমুর রহমান দূর্জয়সহ বোর্ডের প্রভাবশালী কয়েকজন পরিচালকও নিরুদ্দেশ। আ জ ম নাসির চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও পরিচালক শফিউর রহমান নাদেল সদ্য বিলুপ্ত হওয়া সংসদেরই একজন সদস্যÑ তারাও এখন লাপাত্তা। কেউ কেউ আছেন আত্মগোপনে। এমন অবস্থায় বোর্ডে পরিবর্তনটা অবশ্যম্ভাবী।
ক্রিকেট পাড়ায় গুঞ্জন, বিসিবিতে সমূলে পরিবর্তন এখন সময়ের ব্যাপার। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এসেছে। সেখানকার যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন আসিফ মাহমুদ। সচিবালয়ে তার কার্যদিবসের প্রথম দিনেই তিনি বোর্ডের কয়েকজন পরিচালকের সঙ্গে বসেছিলেন। সেখানে তিনি বিসিবি সভাপতির পদে অন্তর্বর্তীকালীন কাউকে নিয়োগের ব্যাপারে ভেবেছেন। বদলে যাচ্ছে পরিচালনা পর্ষদও। প্রায় এক যুগ ধরে সাম্রাজ্য চালানো পাপনও অনানুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন দ্রুতই পদত্যাগ করবেন।
‘মায়া’ এবং ‘ভালোবাসা’র ক্রিকেটে চাইলে তিনি নতুন যারা আসবেন, তাদের সাহায্যও করতে চান বলে সূত্রের খবর। তবে পাপনের পতনে মুখ খুলছেন এতদিনের ভুক্তভোগীরা। বিসিবিও এক দিন পরপরই তাই গর্জে উঠছে রাজনৈতিক স্লোগানে। কেউ কেউ নতুন নতুন ব্যানারে পুরোনোদের অযোগ্য বলে পদত্যাগ করার কথা বলছেন। এমতাবস্থায় সংস্কারে হয়তো পুরোনো পরিচালনা পর্ষদের কয়েকজন বিসিবিতে কাজ করতে পারেন। আইসিসির নীতি বলে, সরকারের কোনো হস্তক্ষেপ এলে নেমে আসতে পারে নিষেধাজ্ঞার খড়গ। বোর্ড প্রধান পাপনের সভাপতিত্বের মেয়াদ ২০২৫ সাল পর্যন্ত। তবে বিসিবির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, যদি তিনি তিনটি বোর্ড মিটিংয়ে অনুপস্তিতত থাকেন তবে তার পদ শূন্য ঘোষণা করা হবে।
তবে সার্বিকভাবে পাপনের লাপাত্তা থাকাটা ‘হাতি গর্তে পড়ার মতো হয়েছে।’ অনেকেই পাপনের ‘সেচ্ছ্বাচারিতা’র বিরুদ্ধে কথা বলছেন। দূর্নিতির খসড়া নিয়ে মহড়াও দিচ্ছেন অনেকে। পরিচালকের অনুপস্তিতির মাঝে থাকা বিসিবি তাই প্রায়ই কেপে উঠছে পাপন বিরোধী স্লোগানে।