প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০২৪ ১৯:৩৯ পিএম
মঙ্গলবার আবাহনীর ক্লাব প্রাঙ্গণে ছিল তাঁরার মেলা। প্রবা ফটো
গত ৫ আগস্ট বাংলাদেশের জন্য এক ঐতিহাসিক দিন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখে পতন হয় আওয়ামী লীগ সরকারের। কিন্তু ওই দিন দুপুর থেকে সন্ধ্যায় দেশের ক্রীড়াঙ্গনে ঘটে এক কলঙ্কিত ঘটনা। একদল দুস্কৃতিকারী আবাহনী লিমিটেডের ক্লাবে প্রবেশ করে ব্যাপক লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নি সংযোগের ঘটনা ঘটায়। ৫২ বছরে আবাহনীর সকল অর্জণের স্মৃতিচিহ্নস্বরূপ ট্রফিগুলো লুট করে নিয়ে যায় তারা। ঘটনার প্রতিবাদে গেল কয়েকদিন ধরেই সোচ্চার আবাহনীর বর্তমান ও সাবেক খেলোয়াড়েরা। মঙ্গলবার ক্লাব প্রাঙ্গনে এসে তারা আরও একবার আকুতি জানিয়েছেন ট্রফিগুলো ফিরে পাওয়ার।
লুটপাট ও ভাঙচুরের পর গত রবিবার ক্লাবের বেশ কয়েকজন খেলোযাড় ও কর্মকর্তা গিয়েছিলেন ক্লাব পরিদর্শনে। দুই দিন পর মঙ্গলবার ক্লাব প্রাঙ্গণে ছিল তাঁরার মেলা। এসেছিলেন বর্ষীয়ান ক্রীড়া সংগঠক আবদুস সাদেক, দেওয়ান শরিফুল আরেফিন টুটুল, আহমেদ সাজ্জাদুল আলম ববি ও তারকা ফুটবলার আশরাফ উদ্দিন আহমেদ চুন্নু, আব্দুল গাফফার, শেখ মোহাম্মদ আসলাম, খুরশিদ আলম বাবুল, গোলাম গাউস, ইকবাল হোসেন, জাকির হোসেন, সত্যজিত দাস রুপু ও বিপ্লব ভট্টাচার্য। এছাড়া সাবেক ক্রিকেটারদের মধ্যে খালেদ মাহমুদ সুজন, গাজী আশরাফ হোসেন লিপু, দিপু রায় চৌধুরী, ইমরান হামিদ পার্থ, জাহিদ হোসেন শোভনরা উপস্থিত ছিলেন।
ক্লাব প্রাঙ্গনে আসা সাবেক, বর্তমান খেলোয়াড়েরা সবাই ছিলেন ব্যধিত, বিমর্ষ ও বিধ্বস্ত। সবার কণ্ঠেই ছিল ট্রফিগুলোর জন্য হাহাকার। সাবেক হকি খেলোয়াড় ও বর্ষীয়ান ক্রীড়া সংগঠক আবদুস সাদেক বলেছেন, ‘বিগত ৫২ বছরে আবাহনী দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ক্লাব। এই সময়ে আমরা যে ট্রফি অর্জন করেছি তার সংখ্যা কত আমি নিজেও জানি না। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় কয়দিন আগে, ক্লাব থেকে শত শত ট্রফি কে বা কারা নিয়ে গেছে। আমি আপনাদের মাধ্যমে তাদের কাছে অনুরোধ করতে চাই, আপনারা ট্রফিগুলো ক্লাব প্রাঙ্গণে ফিরিয়ে দিয়ে যান।’
আবাহনীর পরিচালক কাজী এনাম আহমেদ মনে করেন এই ক্লাবটি দেশের মানুষের ক্লাব, সমর্থকদের ক্লাব, বিশেষকরে ধানমন্ডির ক্লাব। তিনি হারিয়ে যাওয়া ট্রফি ফিরে পেতে সরকারকে অনুরোধ করে বলেন, ‘ক্লাবে যে আক্রমনটা হয়েছে মনে অনেক ব্যাথা পেয়েছি। আমাদের যে অর্জন, এতগুলো ট্রফি নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমি সরকার ও প্রশাসনকে অনুরোধ করবো আমাদের নিরাপত্তার বিষয়টি দেখেন। গত কয়েকদিন দেখেছি, অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে কেবল আবাহনী নয়, আরও কয়েকটি ক্লাবে এরকম হামলা হয়েছে। আপনারা দয়া করে ক্লাবগুলো, তাদের কর্মকর্তাদের নিরাপত্তার বিষয়গুলো দেখেন।’ এরপর আগামী মৌসুমে দল গঠন নিয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে এনাম আহমেদ বলেন, ‘আমি সমর্থকদের বলতে চাই, গত ৫২ বছর ধরে আবাহনী ছিল। এবারও আবাহনী দল গঠন কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। আপনারা আশ্বস্ত হতে পারেন, আবাহনী এভাবেই সামনে আরও ৫২ বছর দল গঠন করে যাবে।’
আবাহনীর সাবেক ক্রিকেটার ও বর্তমান বিসিবির প্রধান নির্বাচক গাজী আশরাফ হোসেন লিপু ট্রফিগুলো ফেরতের অনুরোধ জানিয়ে বলেছেন, ‘আমার বয়স যখন ২০ বছর, ১৯৮০ সালে আমি আবাহনীতে খেলোয়াড় হিসেবে খেলতে আসি। বহু স্মৃতি জড়িয়ে এখানে, খেলোয়াড় হিসেবে খেলেছি, সংগঠক হিসেবে ছিলাম। আমি খুবই মর্মাহত। যারা এগুলো নিয়ে গেছেন, তারা যদি কোনও মাধ্যমে কিংবা নিজেরা এসে ট্রফিগুলো ফেরত দিয়ে যান, খুশি হবো। এই বয়সে এসে আপনাদের কাছে আমার এই চাওয়া। আমাদের কোনও ক্ষোভ নেই আপনাদের ওপর।’ ট্রফি ফিরে পেতে যদি কোনো অর্থের প্রয়োজন হয় সেটিও দিতে রাজি আছে ক্লাব। আবাহনীর সাবেক ফুটবলার ও অধিনায়ক দেওয়ান শফিউল আরেফিন টুটুল বলেছেন, ‘এই ট্রফিগুলো বিক্রী করে কিন্তু খুব বেশি টাকা পাওয়া যাবে না। যারা নিয়েছেন ট্রফিগুলো, আপনারা এগুলো ঘরেও রাখতে পারবেন না। ঘরে রাখলে কেউ এসে প্রশ্ন করলে কোন সদুত্তরও দিতে পারবেন না। তাই আপনারা যদি এই ট্রফিগুলো ফিরিয়ে দিয়ে যান আমরা অত্যন্ত খুশি হবো। ট্রফি ফিরিয়ে আনতে যদি কাউকে অর্থও দিতে হয়, সেটা দিতে আমরা রাজী আছি।’ তার এই কথায় সম্মতি জানান পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা ক্লাবের পরিচালক এনাম আহমেদ।
আবাহনীর আরেক সাবেক ক্রিকেটার ও বর্তমানে বিসিবির পরিচালক খালেদ মাহমুদ সুজনও এসেছিলেন আবাহনী ক্লাব পরিদর্শনে। খেরোয়াড় হিসেবে আকাশি-নীল জার্সিতে খেলেছেন স্রেফ তিন বছর। তবে এই ক্লাবটির সঙ্গে তার সম্পর্কটা অন্যরকম। কেননা কোচ হিসেবে তিনি আবাহনীতে কাজ করেছেন অনেক বছর। স্বাভাবিকভাবেই আর সবার মতো তারও মন খারাপ এবং তিনি মনে করেন খেলাধুলায় রাজনীতি না থাকা উচিত। অমুক ক্লাব অমুক রাজনেতিক দলের এমন ভাবনাটাও ভাবা ঠিক বলে মনে করেন না সুজন, ‘ট্রফিগুলো খেলোয়াড়দের অনেক কষ্টের ফসল। অনেক ঘাম ঝড়িয়ে এই ট্রফিগুলো আমরা সবাই মিলে অর্জন করেছি। এই ট্রফিগুলো যখন চলে গেছে, সেটা আমাদের জন্য অনেক কষ্টের। এটা স্বর্ণের বা হিরার কোন ট্রফি নয়। তবে আমাদের কাছে এসব ট্রফি অনেক অমূল্য। অনেকে আবাহনী বলতে আওয়ামী লীগ বোঝায়, মোহামেডান বলতে বিএনপি বোঝায়। এটা ঠিক না। আমরা তো ঘুরে ঘুরে দুই ক্লাবেই খেলেছি। আমি মনে করি খেলার সঙ্গে রাজনীতিকে জড়ানো ঠিক নয়। যাদের জন্য এই ক্লাব ছিল রুটি রুজির স্থান- তাদের কী হবে? সেই কথাটাও একটু ভাবুন।’