আরিফুর রাজু
প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০২৪ ১৬:০৮ পিএম
আপনি যখনই কোনো পথ মাড়িয়ে
যাবেন, অনেক চিহ্নই রয়ে যাবে। গ্রীষ্মকালীন প্যারিস অলিম্পিক তেমনই অনেক কিছুর সাক্ষী।
১৬ দিনব্যাপী মনোজ্ঞ আসরের শুরু ও শেষের পরতে পরতে ছিল চমক, বিস্ময় ও বিতর্কিত অনেক
ঘটনা। ৩৩তম আসরে মোট ইভেন্ট ছিল ৩২৯টি। অংশগ্রহণকারী ১০ হাজারেরও বেশি। প্যারিসে উড়েছে
২০৬ দেশের পতাকা। ২৬ জুলাই সিন নদীতে হয়েছে এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। ১১ আগস্ট স্টেড ডি
ফ্রান্স স্টেডিয়ামে চোখ ধাঁধানো সমাপনীতে শেষ হয়েছে প্যারিস যাত্রা। গ্রেটেস্ট শো অন
আর্থ খ্যাত ২০২৪ সালের আসরের আলোচিত সাত ঘটনার দিকে চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক।
ব্যতিক্রমী উদ্বোধনী
অনুষ্ঠান : সচরাচর অলিম্পিকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয় আয়োজক দেশের
প্রাণকেন্দ্রে কিংবা প্রসিদ্ধ কোনো অ্যাথলেট স্টেডিয়ামে। প্যারিস অলিম্পিকে সেটির ভিন্নতা
দেখা গেছে। শহরের অদূরে সিন নদীতে গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয়। বৃষ্টিস্নাত
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান বিশ্বব্যাপী সুনাম কুড়ালেও একটি অংশ বেশ সমালোচনা জন্ম দেয়। ফ্রান্সের
সমকামী ডিজে বারবারা বুচের পারফরম্যান্সকে যিশুখ্রিষ্টের ‘লাস্ট সাপার’-এর প্যারোডি
হিসেবে অ্যাখ্যা দেন অনেকেই। এ নিয়ে রক্ষণশীল সমাজ ব্যাপক প্রতিক্রিয়া জানান। যদিও
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের শিল্পনির্দেশক টমাস জলি বিষয়টি অস্বীকার করেন। তবে আয়োজকদের আয়োজন
ছিল চেয়ে থাকার মতো। এদিন প্রায় ১০০টি নৌকা ও বার্জে করে আইফেল টাওয়ারের পূর্ব কোণের
অস্টারলিটজ সেতু থেকে ট্রোকাড রোতে মার্চ করেন অ্যাথলেটরা।
লাইলসের ফটো ফিনিশ
: সর্বকালের দ্রুততম মানব উসাইন বোল্টের কীর্তি ছোঁয়ার মিশনে প্যারিসে
পা রেখেছিলেন নোয়াহ লাইলস। ১০০ মিটার জয়ের পর সে পথেই ছিলেন। কিন্তু ২০০ মিটার স্প্রিন্টে
তার স্বপ্ন ভেঙে যায়। করোনায় আক্রান্ত লাইলসের ৪০০ মিটার স্প্রিন্টেও নামা হয়নি।
ট্রেবলের স্বপ্ন অপূর্ণ থাকলেও
ইতিহাসের সাক্ষী হয়েছেন লাইলস। আধুনিক অলিম্পিক ইতিহাসে সবচেয়ে সূক্ষ্ম ব্যবধানে ১০০
মিটার স্প্রিন্টের ফাইনালের বিজয়ী হন তিনি। জ্যামাইকার কিশান টম্পসনকে এক সেকেন্ডের
পাঁচ হাজার ভাগের এক ভাগের ব্যবধানে হারান যুক্তরাষ্ট্রের দৌড়বিদ।
জোকোভিচের স্বপ্নপূরণ:
জীবনে অনেক অর্জন তার। ২৪ গ্র্যান্ড স্ল্যামজয়ী সার্ভিয়ান টেনিস সম্রাট জোকোভিচের একটিই
আক্ষেপÑঅলিম্পিক সোনা। বিধাতা তার সেই ইচ্ছা পূরণ করেছে এবার। ২০০৮ সালে বোঞ্জজয়ী ৩৭
বছর বয়সি তারকা ২০২৪-এ এসে জিতলেন সোনার পদক। রোঁলা গাঁরোয় ফরাসি কার্লোস আলকারাজকে
হারিয়ে পঞ্চম টেনিস খেলোয়াড় হিসেবে ‘গোল্ডেন স্ল্যাম’ (চারটি গ্র্যান্ড স্ল্যাম ও অলিম্পিক
সোনা) জেতেন তিনি।
ভারত-পাকিস্তান লড়াই
: খেলা ও রাজনীতি ভিন্ন দুই মেরুর হলেও ভারত-পাকিস্তানের জনগণ সব সময়ই
এই দুটিকে এক করে ফেলেন। ক্রিকেটে প্রতিবেশী দুই দেশের খ্যাতি থাকলেও প্যারিসে জ্যাভলিনে
সোনার পদকে অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন ভারতের নীরাজ চোপড়া ও পাকিস্তানের আরশাদ নাদিম।
অলিম্পিকে রেকর্ড গড়ে চোপড়াকে পেছনে ফেলেন আরশাদ। নতুন অলিম্পিক রেকর্ড ৯২.৯৭ মিটার
দূরত্বে জ্যাভলিন ছুড়ে তিনি পাকিস্তানকে ব্যক্তিগত কোনো ইভেন্টে ইতিহাসে প্রথম স্বর্ণ
উপহার দেন। সোনা জয়ের পর আরশাদ বলেন, ‘ক্রিকেট ম্যাচেই কেবল দুই দেশের প্রতিদ্বন্দ্বিতা
দেখা যায়। কিন্তু অন্য ক্রীড়ায়ও এই ধরনের প্রতিযোগিতা আছে। একটি কথাই বলব ভারত-পাকিস্তানের
তরুণদের উদ্দেশে, যারা আমাদের অনুসরণ করে তাদের জন্য এটা ভালো একটি বার্তা। প্রতিদ্বন্দ্বী
হলেও এটা দুই দেশের জন্য একটি ইতিবাচক দিক।’
লিঙ্গ বিতর্ক : মাত্র ৪৬ সেকেন্ডে বক্সিং কোট ছেড়েছিলেন ইতালির অ্যাঞ্জেলা কারিনি। প্রতিপক্ষ বক্সার ইমানে খেলিফের মাঝে পুরুষের জিনগত বৈশিষ্ট্য রয়েছেÑ এমন অভিযোগ ছিল তার। যদিও আলজেরিয়ার এই নারী বক্সার লিঙ্গ পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়ে গত বছরের ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ থেকে বাদ পড়েছিলেন। এবার তাকে সুযোগ দেয় অলিম্পিক কর্তৃপক্ষ। তা ভালোভাবেই কাজে লাগান। জিতে নেন সোনা।
এর আগে খেলিফের শরীরে এক্সওয়াই
ক্রোমোজোমের উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছিল, যা মূলত পুরুষদের শরীরে মেলে। নারীদের ক্রোমোজোম
এক্সএক্স; দুই ক্রোমোজোমের পার্থক্য নারী-পুরুষের শারীরিক পার্থক্য ঠিক করে দেয়। সেই
এক্সওয়াই ক্রোমোজোম ছিল ইমানে খেলিফের শরীরে। তবে খেলিফ মনে করেন, অলিম্পিকে তার অংশ
নেওয়ার পুরো যোগ্যতা আছে। বলেছেন, ‘আমার জন্ম নারী হিসেবে, বেড়ে উঠেছি নারী হিসেবে,
অংশও নিয়েছি নারী হিসেবে।’
লোপেজের হাই ফাইভ : গত বছরে ক্যারিয়ারের পাট চুকিয়েছিলেন মিয়াইন লোপেজ। ততদিনে অবশ্য তিনি জায়গা করে নেন কালজয়ীদের কাতারে। অলিম্পিকে এক ইভেন্টে টানা চারবার সোনা জেতেন লোপেজ। প্যারিস অলিম্পিকে সেটিও টপকে গেলেন। টানা পাঁচবার সোনার পদক জিতলেন কিউবার এই রেসলার।
বয়স যেখানে মুখ্য নয় : প্যারিস অলিম্পিকে সবচেয়ে কম বয়সি চীনা স্কেটবোর্ডার ঝেং হাওহাও। ৭ আগস্ট যখন তিনি খেলতে নামেন তখন তার বয়স ছিল ১১ বছর ৩৬০ দিন। আসরে সবচেয়ে বেশি বয়স স্পেনের হুয়ান আন্তানিও হিমনেজ কোবো। ইকুয়াস্ট্রিয়ান ইভেন্টে নামেন তিনি। কোবো বর্তমান বয়স ৬৫ বছর।