প্যারিস অলিম্পিক ২০২৪
আরিফুর রাজু
প্রকাশ : ০৬ আগস্ট ২০২৪ ২১:২৯ পিএম
নিজেকে আরো ছাড়িয়ে গেলেন আরমান্ড ডুপ্লান্টিস। সংগৃহীত ছবি
ঘুম পাড়ানি মাসি-পিসি ছড়া কিংবা দু’চারের নামতা শেখার
বয়সে অনেক কিছুই হতে চাইতাম আমরা। চাঁদে যাওয়া, সুয্যি মামার কপালে টিপ পরিয়ে দেওয়া,
কত কী! অবশ্য পরিণত বয়সে ‘ইচ্ছাস্বপ্ন’ এদিক-সেদিক হয়। ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার ও শিক্ষকতার
মতো আদর্শ পেশার বাসনা পোষেন কেউ কেউ। আধুনিক যুগে অ্যাথলেট হওয়ার স্বপ্ন নেহাত কম
নয়। তবে খেরোখাতায় ইতিহাস লিখবেন, এমন সংখ্যাটা কমই! যারাই মননে উচ্চাশা লালন করেন,
তাদেরই আদর্শ হতে পারেন আরমান্ড ডুপ্লান্টিস। যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া এই সুইডিশ নিজের
শৈশব বাস্তবায়িত করেছেন। ৬.২৫ মিটার লাফিয়ে প্যারিস অলিম্পিকে গড়েছেন বিশ্বরেকর্ড।
ডুপ্লান্টিসের চার ভাই-বোন। পুরো পরিববার ক্রীড়ার সঙ্গে
সংশ্লিষ্ট। বাবা গ্রেগ ডুপ্লান্টিস নিজেই পলভোল্টার। মা হেলেনা ডুপ্লান্টিস সুইডেনকে
প্রতিনিধিত্ব করতেন। বাকি তিন ভাই-বোনও অ্যাথলেট। এমনই ক্রীড়াবান্ধব পরিবারের সন্তান
ডুপ্লান্টিস ছোটবেলায় স্বপ্ন দেখতেন একদিন দেশকে প্রতিনিধিত্ব করবেন, অলিম্পিকে ভেঙে
দেবেন রেকর্ড। একই সঙ্গে নিজেকে এমন একটি জায়গায় আবিষ্কার করবেন, যার যোজন দূরত্বেও
থাকবে না কেউ। ডুপ্লান্টিসের শৈশবের সে স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। গত সোমবার সোনার পদক ও বিশ্বরেকর্ড
গড়েন ৬৯ হাজার দশর্কের উপস্থিতিতে। একই সঙ্গে ৯ বার ভাঙেন বিশ্বরেকর্ড। সর্বশেষ বিশ্বরেকর্ডটাও
তার। এ বছরের এপ্রিলে শিয়ামেন ডায়মন্ড লিগে যেটা গড়েছিলেন ৬ দশমিক ২৪ মিটার উচ্চতা
অতিক্রম করে। এবার ১ সেন্টিমিটার বেশি উচ্চতা। বব রিচার্ডসনের পর প্রথম পুরুষ পোলভল্টার
হিসেবে টানা দুই অলিম্পিকে সোনা জিতলেন ডুপ্লান্টিস। এর আগে ১৯৫২ ও ১৯৫৬ অলিম্পিকে
সোনা জিতেছিলেন আমেরিকার বব। ডুপ্লান্টিসের রেকর্ডের দিনে ৫.৯৫ মিটার লাফিয়ে রুপা জিতেছেন
যুক্তরাষ্ট্রের স্যাম কেনড্রিকস। প্রতিযোগিতার ব্রোঞ্জ উঠেছে ৫.৯০ মিটার লাফানো গ্রিসের
ইমানুইল কারালিসের হাতে।
ঐতিহাসিক এ লাফে দুর্দান্ত কীর্তি গড়ার পর নিজেরই যেন
বিশ্বাস হচ্ছে না ডুপ্লান্টিসের। উচ্ছ্বাসে ভেসে যাচ্ছিলেন তিনি। স্বপ্নের উপাখ্যানের
দিনে বলেছেন এটি তার ছোটবেলার স্বপ্ন। স্বপ্ন দেখতেন এক দিন ইতিহাস বদলে দেবেন। ডুপ্লান্টিস
বলেছেন, ‘এ মুহূর্তে আমি অলিম্পিক
মঞ্চে বিশ্বরেকর্ড গড়েছি। সম্ভবত পোল ভল্টারদের জন্য এটাই সবচেয়ে বড় মঞ্চ। আমি ছোটবেলা
থেকেই স্বপ্ন দেখেছি অলিম্পিকে বিশ্বরেকর্ড ভাঙার। এখন পর্যন্ত যত জায়গায় প্রতিযোগিতা
করেছি, সবচেয়ে বেশি উৎসাহী দর্শকের সামনে সেটা করেই ফেললাম।’
প্রায় ৬৯ হাজার দর্শক, বিশেষত ফুটবল-ক্রিকেট কিংবা রাগবি
ম্যাচে এমন দর্শক চোখে পড়ে। টইটম্বুর গ্যালারি, ডুপ্লান্টিস, ডুপ্লান্টিস স্লোগান।
দশর্ক উন্মাতালে কেমন লেগেছিল সুইডিশ তারকার। বিশ্বরেকর্ড গড়ার মুহূর্তে নিজেকে কীভাবে
ঠিক রেখেছিলেন? ডুপ্লান্টিসের সাদামাটা উত্তর, ‘আমার পক্ষে যতটা সম্ভব ছিল, আমি নিজের
চিন্তাটা পরিষ্কার রাখার চেষ্টা করেছি। দর্শক উন্মাতাল হয়ে গিয়েছিল। এত শব্দ হচ্ছিল
যে আমার কাছে মনে হয়েছে, এটা আমেরিকান কোনো ফুটবল ম্যাচের মতো।’
ডুপ্লান্টিস এখানেই থামেননি। সেই মুহূর্তের বর্ণনা দিতে
গিয়ে ২৪ বছর বয়সি পোল ভল্টার বলেছেন, ‘এক লাখ ধারণক্ষমতার স্টেডিয়ামে (প্রতিযোগিতায়
নামার) নামার অভিজ্ঞতা আমার খুবই কম। কিন্তু আমি এভাবে আকর্ষণের কেন্দ্রে কখনোই ছিলাম
না। সবাই আমাকে যে শক্তিটা জোগাচ্ছিল, আমি শুধু সেটা কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছি। তারা
আমাকে অনেক শক্তি জুগিয়েছে, এটা কাজে লেগেছে।’
স্বপ্ন জয়ের পথে ধুকপুকানি আর স্নায়ুচাপ যে কম ছিল, সেটা
তো নয়। তবে লাফ শেষে ডুপ্লান্টিসের কাণ্ডে উপস্থিত দর্শকরা আনন্দ পেয়েছে। তুরস্কের
৫১ বছর বয়সি শুটার ইউসুফ দিকেচের মতো হুবহু অভিনয় করেন তিনি। বাম হাত প্যান্টের ফাঁকে
ঢুকিয়ে ডান হাত শুটের ভঙ্গিতে সামনে নেন। এ সময় নিজেকে খুবই শান্ত রাখেন, যেমনটা রেখেছিলেন
তুরস্কের পদকজয়ী দিকেচ। এ সময় ডুপ্লান্টিস বলেছেন, ‘মুহূর্তটা কতটা দারুণ ছিল, তা এখনও
ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। এটা এমন বিষয়গুলোর একটি, যা কি না আমার কাছে বাস্তব বলে মনে
হয় না। অভিজ্ঞতাটা এরকম যে মনে হয় অন্য কেউ আমার ওপর ভর করেছিল।’
ডুপ্লান্টিসের মতো যাদের শৈশবের ক্যানভাসে আঁকা আকাশছোঁয়ার
ছক, তাদের তো এমন অর্জন হবেই। শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ডুপ্লান্টিসের এবার স্কাইস্ক্র্যাপার
গড়ার পালা। টানা দুটি বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপ ও দুটি অলিম্পিক সোনার পদক। তার চেয়েও বরং
৬ দশমিক ২৫ মিটার উচ্চতার অনিন্দ্যসুন্দর লাফ, যা যুগ যুগ গেঁথে থাকবে মানুষের মনে।
হাতের পোলটার সামনের প্রান্তটা জুতসই জায়গায় ঠেকা দিয়ে আকাশপানে আরেকটি ‘অবিস্মরণীয়’
লাফ, দশর্কদের স্তব্ধ করিয়ে দিয়ে আরেকটি বিশ্বরেকর্ড, আরেকবার নিজেকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে
নিয়ে আসা। নিশ্চয় ডুপ্লান্টিস এমনটা করবেন, নিজের জন্য, ভক্তদের জন্য!