প্যারিস অলিম্পিক ২০২৪
প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০২ আগস্ট ২০২৪ ২০:১৮ পিএম
দেশের হয়ে নবম অলিম্পিক পদক জিতলে বাইলস।
সেদিন কি খুব করে কেঁদেছিলেন সিমোন বাইলস? কাঁদতেও পারেন, আবার নাও
পারেন! রক্তে যার জয়ের নেশা, হৃদয় ক্যানভাসে বিশ্বজয়ের ছক, তাকে বরং নীরবতা আর সহনশীলতাতেই
মানায়। ২০১৯ সালের টোকিওর দহন, টুইস্টিজের সঙ্গে মরণপণ লড়াই ও শূন্যতাÑ মার্কিন কিংবদন্তিকে
শিখিয়েছে অনেক কিছুই। তবে কোনো মুহূর্তই যে বাইলসের চেয়ে বড় নয়, সর্বজয়ের শক্তি তার
মানসপটে, সেটিই প্রমাণ করলেন প্যারিস অলিম্পিকে। একই সঙ্গে বুঝিয়ে দিলেন বেদনার রঙ
কখনও কখনও সোনালি। ইতোমধ্যে ৩৩তম অলিম্পিকে মার্কিন জিমন্যাস্ট জিতে নিয়েছেন দ্বিতীয়
সোনা। গড়েছেন কীর্তি-রেকর্ড। শুধু অলিম্পিকেই ছয় স্বর্ণের মালিকানা এখন বাইলসের।
প্যারিসে জিমন্যাস্টিকসের দলগত ইভেন্টে সোনা জিতে প্রত্যাবর্তন রাঙিয়েছিলেন
বাইলস। এবার নারীদের অল-অ্যারাউন্ডেও সোনা জিতে নিলেন কিংবদন্তি এই মার্কিন জিমন্যাস্ট।
গত বৃহস্পতিবার সোনা জয়ের পথে তার স্কোর ১৫.০০৬। এই ইভেন্টের রুপা জিতেছেন ব্রাজিলের
রেবেকা আন্দ্রাদে এবং ব্রোঞ্জ জিতেছেন তারই স্বদেশি সুনিসা লি। বাইলস আর্টিস্টিক জিমন্যাস্টিকসে
মেয়েদের অল-অ্যারাউন্ড ইভেন্টে শুরু করেছিলেন ভল্ট দিয়ে। মেয়েদের ব্যক্তিগত এই ইভেন্টে
আছে চারটি রাউন্ড-ভল্ট, আনইভেন বারস, ব্যালান্স বিম ও ফ্লোর এক্সারসাইজ। বাইলস শুরু
করেছিলেন ভল্ট দিয়ে। সেখানে মোট ১৫.৭৬৬ স্কোর করেন। আনইভেনে বারসে স্কোর করেন ১৩.৭৩৩।
আর ব্যালান্স বিমে ১৪.৪৬৬ স্কোর। তিনটি রাউন্ড শেষে শীর্ষে ছিলেন। ফ্লোর এক্সারসাইজের
পর নিশ্চিত করেন সোনা। এটি বাইলসের ক্যারিয়ারের ৬ষ্ঠ অলিম্পিক সোনা এবং সব মিলিয়ে ৯ম
পদক। আর চলতি আসরে যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম স্বর্ণপদক, সব মিলিয়ে ৩৪তম।
নিজেদের দ্বিতীয় সোনা জেতার দিনে দারুণ কীর্তি গড়েছেন বাইলস। ৭২ বছর
পর সবচেয়ে বেশি বয়সি হিসেবে এই ইভেন্টে সোনা জয়ের কীর্তি গড়লেন। ১৯৫২ সালে মেলবোর্ন
অলিম্পিকে ৩০ বছর বয়সে অল-অ্যারাউন্ডে সোনা জিতেছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়নের মারিয়া গোরোখোভস্কিয়া।
এবার ২৭ বছর বয়সে জিতলেন বাইলস। বলতেই হয় প্যারিসে দারুণভাবে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে
যাচ্ছেন তিনি। তার চেয়েও বলা যেতে পারে, সুযোগ সদ্ব্যবহার, তা উপভোগের আনন্দ বিলাচ্ছেন
রোজ! তিনি দেখাচ্ছেন কীভাবে সেরাদের সেরা হতে, বিরুদ্ধস্রোতে টিকে থাকতে হয়। যেমনটা
বলেছিলেন বাইলসের প্রথম কোচ আইমি বোরম্যান। অলিম্পিকের বিশেষ এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন,
‘তার (বাইলস) কোনো আনুষ্ঠানিক ট্রেনার ছিল না। তার ভাই তাকে বাড়ির পেছনে হ্যান্ডস্প্রিংয়ের
অনুশীলনের জন্য ব্যবস্থা করে দেয়। খুব অল্প সময় থেকেই সে মানুষের (জিমন্যাস্ট) খেলা
দেখত, সেটা পূর্ণ মনোযোগ দিয়েই এবং সেটা অনুশীলন করত।’ বাইলসের পূর্ণ মনোযোগ ও ট্যালেন্ট
নিয়ে সাবেক এই কোচ একটি উদাহরণ পেশ করেন ঠিক এভাবেÑ ‘একদিন সে চিয়ারলিডারদের নাচতে
দেখে। সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠেÑ আমিও এটা করতে চাই। অথচ সে আগে কখনও নাচেনি। সে এটি দারুণভাবে
করতে পারে, করে দেখায়ও। শুধু একবার দেখেই পারফরম্যান্স, যা দেখে সবাই অবাক হয়।’
বাইলস মার্কিনিদের কাছে কিংবদন্তি। জিমন্যাস্টিকসের গোট বা গ্রেটেস্ট
অব অল টাইম। সোনা উদযাপনের দিনে দেশের হয়ে নবম পদক জয়ের দিনেই সেটিই বুঝিয়ে দিলেন।
এদিন বাইলস পদক উদযাপন করেছেন গলায় ৫৪৬টি হীরা দিয়ে তৈরি লকেট পরে। সেই লকেট দেখতে
ছাগলের মতো। এর অর্থ গোট বা গ্রেটেস্ট অব অল টাইম। এ নিয়ে তার ব্যাখ্যা, ‘ঠিক করে রেখেছিলাম,
সবকিছু ভালো হলে এই গোট নেকলেস পরব। জানি এটা নিয়ে আলোচনা হবে। এটা আলোচনা হওয়ার
মতোই। বিশ্বের সেরা অ্যাথলেট বলা হচ্ছে আমাকে। তবে আমি নিজেকে টেক্সাসের সেই বাইলস
মনে করি, যে ফ্লিপ করতে ভালোবাসে।’
এটা ঠিক যে, এভাবে ফিরতে পারবেন ভাবনাতেও আসেনি বাইলসের। যার আকাশ
মেঘে ডেকে গিয়েছিল। সেখানে আজ ঝলমলে চাঁদ। অনুভূতিটা তাই একটু ভিন্ন রকমই বাইলসের।
খেলা শেষে বলেছেন, ‘বিশ্বাসই হচ্ছে না, আমি এটা জিততে পেরেছি। এখন এটা নিয়ে তেমন কোনো
অনুভূতি হচ্ছে না, তবে অলিম্পিক ভিলেজে (রুমে) যাওয়ার পর নিশ্চয় এটার গুরুত্ব বুঝতে
পারব। আমি কেবল বলতে পারি, আজকের পারফরম্যান্সে খুশি। আমার সামনে এখনও তিনটা ফাইনাল
বাকি। এখন একটু আনন্দ করার সময়।’
২০১৩ সালের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ দিয়ে আবির্ভাব ঘটেছিল বাইলসের।
২০১৬ সালের রিও অলিম্পিকে ছড়ান মুগ্ধতা। ২০১৯ সালে ধাক্কা। অনেকে তার শেষও দেখে ফেলেছিলেন।
কিন্তু দুঃসময় পেছনে ঠেলে কীভাবে ফিরে আসতে হয়, তা ভালো করেই জানা বাইলসের। ঘুরে দাঁড়ানোর
‘ডিএনএ’ ছোটবেলাতেই আত্মস্থ। তারচেয়ে বরং বাইলসের রয়েছে ঈশ্বরের মানসিকতা। যেমনটা বলেছিলেন
স্বদেশি নোয়াহ লাইলস। মুহূর্ত তৈরিই হয় তার জন্য, যে দৃঢ়প্রত্যয়ী ও সাহসী।