আরিফুর রাজু
প্রকাশ : ১৫ জুলাই ২০২৪ ২১:০৮ পিএম
আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০২৪ ১৮:০৬ পিএম
একটু আগেও এই মাঠ মাড়িয়েছে স্নায়ুক্ষয়ী এক ‘লড়াই’। বিধ্বস্ততার ক্ষতচিহ্ন চারদিকে। আর্তনাদ, হাহাকার আর হারানোর শোকে কাতর শিবির। তখন বিজেতাদের কেউ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলে, ব্যাপারটি হতো অন্যরকম এক মানবিকতার গল্প। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘মরণের ডঙ্কা বাজে’ উপন্যাসের প্রফেসর লি যেন ফিরে এলেন ফ্লোরিডায়। হার্ড রক স্টেডিয়ামে তাকে স্মরণ করালেন আনহেল ডি মারিয়া। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার ইতি টানার দিনে প্রতিপক্ষের প্রতি মিস্টার এলেভেনের সহমর্মিতা মনে করিয়েছে অনেক কিছুই।
সোমবার মায়ামির হার্ড রকের মাঠে কী ঘটেছিল। বরং বলতে হবে, কী ঘটেনি। আর্জেন্টিনার রেকর্ড ১৬তম কোপা আমেরিকা জয়, লিওনেল মেসি-ডি মারিয়া যুগলের শেষ ট্রফি উৎসব, জেমস রদ্রিগেজের প্রাণপণ লড়াই ও ডাগ আউটে লিওনেল স্কালোনির মূর্তিমান রূপ— অনেক কিছুরই সাক্ষী মায়ামির এই মাঠ। যদিও সবকিছু চাপিয়ে আলোচনায় ডি মারিয়ার বিদায় এবং প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়দের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ।
কোপার ফাইনালে গোল না পেলেও আর্জেন্টিনার সর্বশেষ কয়েকটি ফাইনালে
যা হয়েছে, তার ধারাবাহিকতা ছিল সোমবার, ট্রফি জিতেই মাঠ ছাড়েন ডি মারিয়া। আন্তর্জাতিক
ফুটবলে বিদায়ের দিনে প্রতিপক্ষ কলম্বিয়ার প্রতিটি খেলোয়াড়ের সঙ্গে দেখা করেন, তাদের
জড়িয়ে ধরেন ও সান্ত্বনা দেন। রদ্রিগেজদের শোনান নিজেদের কষ্টের অতীত। কথার প্রসঙ্গে
হয়তো বলেছেন, ‘উঠে দাঁড়াতে একটা হাত লাগে। আর ঘুরে দাঁড়াতে একটি আঘাত!’ বলতেও পারেন,
পরাজয় বাড়ায় জয়ের ক্ষুধা। হয়তো মনে করিয়ে দিয়েছেন আর্জেন্টিনার ২০১৪ বিশ্বকাপে জামার্নের
দেওয়া ফোঁড়, কোপার আক্ষেপ কীভাবে তাদের অজেয় বানিয়েছে।
ডি মারিয়ার ‘সান্ত্বনা’ গল্পে অনেক কথাই থাকতে পারে। বুকে জ্বলা চিতা
নিভিয়ে তার বিদায় ঘটছে ৫৭৯০ দিন পর। সমাপ্তি ঘটছে মেসি-ডি মারিয়া যুগেরও। লিওনেল স্কালোনির
এই দুই শিষ্য টানা চারটি মেজর ট্রফি এনে দিয়েছেন আলবেসেলেস্তাদের। এই যাত্রা ছিল কণ্টকময়।
রোলার কোস্টারে চড়ে আসে প্রতিটি জয়। ম্যাচ অব দ্য ফাইনালের রাজা বলেছেন, ‘এটাকে অনেক
সহজ মনে হতে পারে, কিন্তু এটা খুব কঠিন।’ টানা এতগুলো শিরোপা জয়ের কৃতিত্ব ডি মারিয়া
তার এই প্রজন্মের সতীর্থদের দিয়েছেন এভাবে, ‘যারা নিজেদের সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েছে, আমাদের
এই প্রজন্মের কাছে চিরকৃতজ্ঞ। আমি যা খুব করে চেয়েছিলাম, তারা আমাকে সেটা অর্জন করতে
দিয়েছে।’
ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে এসে এত কিছু জয়ের পর সেই সময়কার সতীর্থদের
জন্য হয়তো প্রাণটা একটু কেঁদে উঠেছিল ডি মারিয়ার, ‘আমার মনে হয়, আমি যদি আগের প্রজন্মের
সঙ্গে কিছু জিততে পারতাম। তাদেরও এটা (শিরোপা জয়) প্রাপ্য ছিল।’ শিরোপা জিতে বিদায়—
এমন ভাগ্য কজন খেলোয়াড়েরই আর আছে। তাও আবার আগেই বিদায়ের ঘোষণা দিয়ে রেখেছিলেন তিনি।
এটাকে নিয়তি বলেই মনে করছেন ডি মারিয়া, ‘এটাই লেখা ছিল এবং এভাবেই লেখা ছিল। আমি এই
সবকিছুরই স্বপ্ন দেখেছি এবং আমি ছেলেদের এটা বলেছি। আমার মনে অনেক অনেক সুন্দর স্মৃতি।’
একসঙ্গে দেড় যুগ আর্জেন্টিনার জার্সিতে খেলেছেন ডি মারিয়া ও মেসি।
জন্ম সালটা এক বছর আগে পরে। জন্মস্থানটাও একই শহরে। কিন্তু আকাশি-নীল জার্সিতে নিজের
শেষ ম্যাচে পুরো সময় দীর্ঘদিনের বন্ধুকে মাঠে পেলেন না চিরচেনা এই ১১ নম্বর জার্সিধারী।
৬৬ মিনিটে অ্যাঙ্কলের ইনজুরি নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে মাঠ ছেড়েছিলেন মেসি। তার কান্না
যেন বাঁধ মানছিল না কিছুতেই। পরে সেই বন্ধু থেকে পাওয়া অধিনায়কের আর্মব্যান্ড পরেই
কলম্বিয়ার কাছ থেকে চ্যাম্পিয়ন মুকুট এনে দিয়েছেন ডি মারিয়া। তবে মেসির জন্য তার কিছুটা
আক্ষেপ শোনা গেল, ‘আমি খুশি নই, কারণ সে (মেসি) এভাবে মাঠ ছেড়েছে। ডান পায়ের অ্যাঙ্কলে
চোট পেয়েছে সে। তবে জয় পেয়েছি এবং এটাই মেসির জন্য আনন্দের। এটি সত্যিই দারুণ এক রাত।’
মেসি-ডি মারিয়া যুগলের শেষটা হয়েছে হাসি-কান্নায়। আর্জেন্টাইন ফুটবল
ভাগ্য বদলে দেওয়া এক নায়ক বিদায় নিয়েছেন, অপেক্ষায় আরেকজন। ঠিকই তারা না থেকেও রয়ে
যাবেন। আরও অনেক বছর পর ফুটবল মাঠে কেউ যখন আলো ছড়াবেন, আড়ালে বসে হাসবেন, উৎসাহ দিয়ে
যাবেন। সূর্য ডোবা শেষ হলেও সূর্যের যাত্রা যে বহুদূর, সেটি স্মরণ করাবেন।