নাজমুল হক তপন
প্রকাশ : ১৫ জুলাই ২০২৪ ১৭:০৪ পিএম
আপডেট : ১৫ জুলাই ২০২৪ ১৭:২৬ পিএম
কেঁদেছেন, বিদায় বেলায় ভক্তদের কাঁদিয়েছেনও ডি মারিয়া।
মানুষের চোখের পানির থেকে পবিত্র আর কী আছে এই বিশ্ব সংসারে? পবিত্রতার
সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত বোধকরি অশ্রু। বিশ্ব ফুটবলের বড় আসরের ফাইনালে গোল করার পর আর্জেন্টাইন
উইঙ্গার অ্যানহেল ডি মারিয়ার কান্নার সঙ্গে পরিচিত ফুটবলপ্রেমীরা। এবারের কান্না যে
ফুটবল থেকে চিরবিচ্ছেদের! কিন্তু তাই কি হয় কখনও? তিনি যে ডি মারিয়া! যতদিন ফুটবল থাকবে
ততদিন আবেগভরে উচ্চারিত হবে ডি মারিয়ার নাম। তার বিদায়ের ক্ষণে ভিজছে গোটা দুনিয়া।
ফাইনালের ম্যাজিক ম্যান খ্যাত ডি মারিয়া আগেই জানিয়ে দিয়েছেন, এবারের
কোপা ফাইনালই তার শেষ ম্যাচ। এর পর থেকেই এবারের কোপার সমার্থক হয়ে ওঠেন ডি মারিয়া।
লিওনেল মেসি তথা আর্জেন্টিনা ফুটবলকে পূর্ণতা এনে দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় নামটাই
যে ডি মারিয়া। দীর্ঘদিনের সতীর্থ ও প্রিয় বন্ধুর বিদায়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন মেসি। আসরের
মাঝপথেই জানিয়ে দেনÑ ডি মারিয়ার জন্য হলেও আমাদের কোপা শিরোপা জিততে হবে।
ফাইনালের এই ম্যাজিক ম্যানের বিদায়কে স্পর্শ করেছে গোটা ফুটবল দুনিয়াকে।
বাংলাদেশ ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে সফল অধিনায়ক মাশরাফি মর্তুজা এক আবেগঘন বার্তায় লিখেছেন,
‘আনহেল ডি মারিয়া আপনাকে কুর্নিশ, একজন অন্ধ আর্জেন্টাইন ফুটবলের সমর্থক হিসাবে। আপনি
অবশ্যই গুরু দিয়েগো ম্যারাডোনার যোগ্য উত্তরসূরি। আপনাকে ভোলা প্রায় অসম্ভব।’ মাশরাফি
তার বার্তায় আরও লেখেন, ২০১৪ বিশ্বকাপে ডি মারিয়ার ইনজুরির দিকে তাকালেই বোঝা যায়।
এমনকি মেসিও ফাইনালে কিছুই করতে পারেননি।’ ডি মারিয়া মাঠে না থাকার পার্থক্যটি খুবই
সূক্ষ্মভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন মাশরাফি।
একটি ট্রফির জন্য আর্জেন্টাইন সমর্থকদের হাহাকার আর দীর্ঘশ্বাসে ভারী
হয়ে উঠেছিল আকাশ-বাতাস। ডি মারিয়ার গোলেই ২৮ বছরের শিরোপা খরা কাটিয়েছে আর্জেন্টিনা।
বিশ্বকাপে তিন যুগের আক্ষেপ ঘুচানোর সঙ্গেও মিশে আছে ডি মারিয়ার গোল। ২০২১ সালে ফুটবলের
তীর্থস্থান মারাকানায় স্বাগতিক ব্রাজিলকে ১-০ গোলে হারিয়ে শিরোপা জেতে আর্জেন্টিনা।
২২ মিনিটে ম্যাচ জেতানো গোলটি করেন ডি মারিয়া। এরপর কাঁদেন আবেগে। ২০২২ সালের লা ফিনালিসিমায়
(ইউরোপ-সেরা আর দক্ষিণ আমেরিকার সেরা দলের দ্বৈরথ) ইতালির বিপক্ষে ৩-০ গোলে ম্যাচ জেতে
আর্জেন্টিনা। একটি গোল করেন ডি মারিয়া। চোখের জল ফেলেন এই উইঙ্গার। ফ্রান্সের বিপক্ষে
২০২২ বিশ্বকাপের ফাইনালে দলের স্কোরকে ২-০ করেন ডি মারিয়া। এবারেও তার কান্নাভেজা চোখ
ছুঁয়ে যায় ফুটবলপ্রেমীদের।
বিদায়ের আগে ইনস্টাগ্রামে প্রিয় সতীর্থ ও বন্ধু মেসির সঙ্গে একটি
ছবি দিয়ে ডি মারিয়া লিখেছেন, ‘আমি যা চাইতে পারতাম, জীবন আমাকে তার চেয়ে অনেক বেশি
দিয়েছে।’ আর্জেন্টিনার জার্সিতে ১৬ বছরের ক্যারিয়ারে সব অর্জনের সঙ্গেই স্থায়ী হয়ে
আছেন ডি মারিয়া। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়, আজি মোর মাঝে কোনো দৈন্য কোনো
শূন্য নাই সুলক্ষণে।’ আর্জেন্টিনার সর্বশেষ অর্জনগুলোর ঘনিষ্ঠ অনুষঙ্গ যে ডি মারিয়ার
অশ্রু। এই ছবি মেসিও দিয়েছেন তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
দেশের জন্য, সর্বোপরি ফুটবলের জন্য ডি মারিয়ার অবদান কৃতজ্ঞচিত্তে
স্মরণ করেছেন মেসি তথা আর্জেন্টাইন শিবির। অধিনায়ক মেসি তার হাতে তুলে দিয়েছেন ১১ নম্বর
জার্সি। যার পিছনে স্প্যানিশ ভাষায় লেখাটির বাংলা করলে দাঁড়ায়, ‘তোমাকে ধন্যবাদ ফিদেও।’
(ডি মারিয়ার ডাকনাম)
এবারের কোপা ফাইনালের আগ পর্যন্ত আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে ১৪৪টি
ম্যাচ খেলেছেন ডি মারিয়া। গোল করেছেন ৩১টি। তবে তাকে গোলের সংখ্যা দিয়ে বিচার করাটা
হবে চরম বোকামি। দলের চরম প্রয়োজনের সঙ্গে তিনি কীভাবে একাত্ম হয়ে উঠতেন তারই দৃষ্টান্ত
যেন ডি মারিয়া।
কথায় বলে, অসময়ের দশ ফোঁড় আর সময়ের এক ফোঁড়। আর্জেন্টাইন ফুটবলে
সেই সময়ের ফোঁড় তুলেছেন ডি মারিয়া। হয়ে উঠেছেন কালজয়ী। মাশরাফির কথাতেই বলতে হয়, ডি
মারিয়া আপনাকে ভোলা প্রায় অসম্ভব।