হেলাল নিরব
প্রকাশ : ১৫ জুলাই ২০২৪ ০৮:০৭ এএম
আপডেট : ১৫ জুলাই ২০২৪ ০৯:০৫ এএম
মাসব্যাপী ফুটবল যজ্ঞের পর্দা নামে স্পেনের শিরোপা জেতার মাধ্যমে— সংগৃহীত ছবি
ইউরোর ডঙ্কা তখনও বেজে ওঠেনি জার্মানিতে, তবে বিতর্ক উঠেছিল তুঙ্গে। ফ্রান্সের অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপের কথায় শুরু হয় এই বিতর্ক। দুইভাগ হয়ে যাওয়া ফুটবল বিশ্বের সেই বিতর্ক থামলেও, মাসব্যাপী একযোগে চলছে দুই মহাদেশের সেরা খোঁজার লড়াই। যখন এই প্রতিবেদন ছাপা অক্ষরে পড়ছেন, তখন ইউরোপের সেরার মুকুট কে পেয়েছে, তা জেনেও গেছেন। তার আগে জেনে নেওয়া যাক এক মাসের ইউরো মহাযজ্ঞের সব খুঁটিনাটি। এমবাপে যে আসরটিকে বিশ্বকাপের ওপরে রাখছেন, ফাইনাল অবধি সেটি কতটা রঙ ছড়িয়েছে।
ইতালির বিদায় : রঙ-বেরঙয়ের ইউরো কম রঙ ছড়ায়নি এবার। স্বাগতিক জার্মানির বিদায়, টনি ক্রুসের স্বপ্নভঙ্গ কিংবা বার্লিনের ফাইনালে ইংল্যান্ডের থাকাÑএসব বাদেও সবার ওপরে থাকবে আগের আসরের চ্যাম্পিয়ন ইতালির বিদায়। বিশ্বকাপ খেলতে না পারা ব্যর্থ আজ্জুরিরা এবার অবশ্য জেদ দেখাতে পারেনি। বরং নীলের দুঃখে ডুবেছেন শুরুর দিকেই। ১৯৯৩ সালের পর সুইজারল্যান্ড কখনও ইতালিকে হারাতে পারেনি। ২০০৪ সালের পর ইতালি কখনও ইউরোর কোয়ার্টার ফাইনালের আগে থামেনি। জার্মানির বার্লিনে দুটিই লেখা হয়েছে নতুন করে। বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা সুইজদের কাছে ২-০ গোলে পরাস্ত হয়ে থামে শেষ ষোলোতেই। ওই ম্যাচটিতে ইতালি পুরো নব্বই মিনিটে শট লক্ষ্যে রাখতে পারে মাত্র একটিতে। অমন ইতালিকে হয়তো কেউই দেখতে চায়নি ইউরোতে!

সিআর সেভেনের কান্না : মহানায়কদেরও বুঝি এভাবে বিদায় হয়! শেষ ষোলোতে স্লোভেনিয়ার গোলরক্ষক যখন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পেনাল্টি ঠেকিয়ে দিয়েছিলেন, তখন হয়তো খোদ সিআরসেভেন অমন ভেবেছিলেন। হাঁটু মুড়ে দুই হাতে মুখ ঢেকে মাঠে বসে পড়েন। ফ্রাঙ্কফুর্টের ডয়চে ব্যাংক পার্কে কাঁদছিলেন শিশুর মতো। কে তখন তাকে দিতে পারে সান্ত্বনা। শেষ ষোলোর সেই বাধা যদিও পর্তুগাল পার করেছিল। কিন্তু ইউরোকে শেষ বলে দেওয়া রোনালদো পারেননি। পরের ম্যাচেও কেঁদেছিলেন সিআর সেভেন। পরপর দুম্যাচে দুটি জিনিস হারানোর দুঃখে চোখের জল ঝরেছিল মহানায়কেরÑ প্রথমে নিজের প্রিয় মঞ্চ ইউরো থেকে প্রস্থান, অপরটি প্রিয় দলের বিদায়।
স্লোভেনিয়াকে হারিয়ে দেওয়ার পর আক্ষেপ করে রোনালদো বলেছিলেন, ‘মানসিকভাবে সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষেরও খারাপ দিন আসে। দল যখন আমার কাছ থেকে কিছু চাচ্ছে, তখন আমি পতনের তলানিতে।’ অথচ ইউরোতে এখনও তার গোল অন্য সবার চেয়ে বেশি। রেকর্ডও আছে ভূরিভূরি। ফ্রান্সের বিপক্ষে হেরে থামার আগেই রোনালদো বোধ হয় বুঝতে পেরেছিলেন, তার মতো একজন কিংবদন্তির ক্যারিয়ারটাও দেশের জার্সিতে শেষ হতে চলেছে নিষ্ঠুরতম উপায়ে।
-66948446934a5.jpeg)
ইয়ামালের বিস্ময়কর উত্থান : ১৭ বছরও হয়নি যে ছেলেটির, তাকে নিশ্চয় এতদিনে চিনে গেছেন? ফ্রান্স কিংবা এমবাপের দুঃস্বপ্ন হওয়া লামিনে ইয়ামালকে না চিনে উপায় আছে! স্পেনের তারকা ফরোয়ার্ড অবশ্য তেমন কিছুই করেছেন। গতি, দক্ষতা ও মানসিকতাÑ আঠারোর আগেই লামিনে চিনিয়েছেন জাত। ছাপিয়ে গেছেন কিংবদন্তি পেলের রেকর্ডও। সবকিছু বাইরে রেখে, লুইস দে লা ফুয়েন্তের দলে হয়ে উঠেছেন প্রাণভোমরা। বিশ্বফুটবলকে জানান দিচ্ছেনÑ ‘আমি আসছি।’ তাইতো স্পেন কোচ বিশাল জরিমানার মুখে পড়েও চান লামিনেকে মাঠে দেখতে।

বিতর্ক ও বিদায় : জাতিগত বিদ্বেষ থেকে রেফারিংকাণ্ড হয়ে জার্মান আইন— ইউরোতে সব ছাপিয়ে গেছে বেলা শেষের গানে। কুঁড়ি হয়ে ফোটা ফুটবলাররা, ঝরেও পড়েন। নশ্বর পৃথিবীতে স্থায়ী নয় কোনো কিছুই। ইউরোতেও হয়েছে বহু নক্ষত্রের পতন। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, পেপে, টনি ক্রুস, লুকা মদরিচ, টমাস মুলার, ম্যানুয়েল নুয়ার ও অলিভিয়ের জিরুদের মতো দুনিয়া মাতানো ফুটবলশিল্পীদের বিদায় দেখতে হয়েছে ভক্তদের। জীবনের মতো ফুটবলও যে নানা রঙের, বেলা শেষে সেই গানই যেন হয়ে উঠেছে নির্মম অথচ চরম সত্য।
ইউরোতে পেনাল্টি নিয়েও বিতর্ক হয়েছিল। সেমিফাইনালের হ্যারি কেইনের শট ঠেকাতে গিয়ে তাকে ফাউল করে বসেন নেদারল্যান্ডসের ডেনজিল ডামফ্রিস। ভিএআরে যাচাই করে পেনাল্টির সিদ্ধান্ত দেন রেফারি। সেই বিতর্ক বিশ্লেষকদের মধ্যে এখনও চলছে। শাস্তি বা বিতর্কের কথা বলতে হলে, সার্বিয়া ও আলবেনিয়ার কথা থাকবে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলার সময় দুটি নিয়ম ভাঙে সার্বিয়া। দেশটিকে মোটা অঙ্কের জরিমানাও গুনতে হয়। জাতিগত বিদ্বেষের কারণে ক্রোয়েশিয়ারও শাস্তি চেয়ে ইউরো কাপে আর না খেলার হুমকিও ছুড়েছিল সার্বিয়া। হাসি-কান্নার মিশেলে রঙ ছড়ানো ইউরো রঙ অবশ্য চড়ায়নি।