রুবেল রেহান
প্রকাশ : ১২ জুলাই ২০২৪ ২১:১৫ পিএম
নেস্তর লরেঞ্জোর হাত ধরেই ২৩ বছর পর কোপার ফাইনালে উঠেছে কলম্বিয়া। সংগৃহীত ছবি
২০২১ সালের এমনই এক জুলাইয়ে ব্রাজিলের মারাকানায় দুঃখ ঘোচায় আর্জেন্টিনা। ২৮ বছরের অপেক্ষার পর জেতে কোপা আমেরিকার শিরোপা। পরের বছর চ্যাম্পিয়নের মুকুট জোটে ফাইনালিসিমায়। তখনকার ইউরো চ্যাম্পিয়ন ইতালিকে হারিয়ে শিরোপা জেতে কোপার চ্যাম্পিয়নরা। তারই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকে কাতার বিশ্বকাপেও। যেখানে ৩৬ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বিশ্বকাপের ট্রফি ঘরে তোলে আলবিসেলেস্তেরা। দুই বছর পর আরও একটি ট্রফির জয়ের সামনে লিওনেল মেসিরা। তবে তাদের পরীক্ষা দিতে হবে নিজেদের ‘ঘরের লোক’ নেস্তর লরেঞ্জোর বিপক্ষে। ফাইনালে মেসিদের প্রতিপক্ষ কলম্বিয়ার ডাগআউটে থাকবেন আর্জেন্টাইন এই কোচ। এখন মেসিদের হারাতেই যিনি ছক কষছেন কলম্বিয়ার হয়ে।
লরেঞ্জোর হাত ধরেই ২৩ বছর পর কোপার ফাইনালে উঠেছে কলম্বিয়া। সেমিফাইনালের মঞ্চে দলটি হারায় উরুগুয়েকে। যে দলটি ছুটছিল অনেকটা অপ্রতিরোধ্য গতিতে। আন্তর্জাতিক আঙিনায় যারা টানা ২৭ ম্যাচে ছিল অপরাজিত। সেই দুর্দান্ত উরুগুয়ের কারিগর বিশ্বখ্যাত কোচ মার্সেলো বিয়েলসা। তার ট্যাকটিকসের সামনে হার মেনেছে অনেক বড় বড় কোচই। তার জন্মও আর্জেন্টিনাতেই। বিয়েলসাকে পরাস্ত করে এবার আরেক আর্জেন্টাইন কোচ তথা মেসিদের বস লিওনেল স্কালোনির বিপক্ষে মাঠে নামছেন লরেঞ্জো। যদিও বিয়েলসাকে পরাস্ত করে খুব একটা উল্লাস করেননি লরেঞ্জো। বরং প্রশংসা করেছেন উরুগুয়ে কোচের, ‘তাকে হারানোর কথা আমি বলতেই পারব না। বিয়েলসাকে হারাতে হলে আপনাকে হাজার মাইল হাঁটতে হবে। আমি কেবল বলতে পারি একটা ম্যাচ জিতেছি আমরা।’ যদিও উরুগুইয়ান কোচ কলম্বিয়ার জয়ের সমস্ত কৃতিত্ব দিয়েছেন লরেঞ্জোকেই। তার মতে, ‘তুলনামূলক কম শক্তির দল হয়ে, এমনকি ১০ জনের দল নিয়ে যেভাবে তারা আমাদের বিপক্ষে জিতেছে সেটি সত্যি প্রশংসার দাবি রাখে।’ প্রতিপক্ষের প্রতি সমীহ যেমন দেখিয়েছেন বিয়েলসা, তেমন লরেঞ্জোও। কোচ হিসেবে যার মিলটা অনেকটা স্কালোনির সঙ্গে। তবে মাঠের বাইরে যতই সমীহ থাকুক, ম্যাচ জিততে নিঃসন্দেহে কঠিন ছকই আঁকবেন লরেঞ্জো।

কেননা দেশ ছাপিয়ে লরেঞ্জো এখন কলম্বিয়ার জাতীয় ফুটবল দলের কোচ। তার সামনে শিরোপা জয়ের সুযোগ। তবে এর জন্য তাকে হারাতে হবে নিজের দেশকে। কলম্বিয়াকে নিজের মধ্যে ধারণ করেন বলেই জানিয়েছেন আর্জেন্টাইন বংশোদ্ভূত ৫৮ বছর বয়সি এই কোচ, ‘আমি কলম্বিয়ার লোকদের অনুভূতি বুঝতে পারছি। এই দেশটিতে আমার অনেক বন্ধু হয়েছে। আমি কলম্বিয়ানদের মতো অনুভূতি ধারণ করি না হয়তো, তবে খেলার আগে তাদের জাতীয় সংগীত আমাকে আবেগপ্রবণ করে তোলে। তাই কলম্বিয়াকে আমি শিরোপা এনে দিতে চাই। আর কলম্বিয়ার লোকেরাও সেটি জানে।’
কাতার বিশ্বকাপ ব্যর্থতার পর কলম্বিয়ার দায়িত্ব নেন লরেঞ্জো। ২০২২ সালের জুনে রেইনালদো রুয়েদার স্থলাভিষিক্ত হন তিনি। এর আগে যার কোচিংয়ের অভিজ্ঞতা তেমন সমৃদ্ধ ছিল না। কাজ করেছেন আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের সঙ্গেও। তবে সেটি হোসে পেকারম্যানের সহকারী হিসেবে। সে সময় কলম্বিয়ায় তার দায়িত্ব নিয়ে সেখানকার মানুষেরা অনেক কথাই বলেছেন। তার ওপর আস্থা রাখা যাবে কি না তা নিয়েও ছিল সন্দেহ। সেই অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে লরেঞ্জো বলেছেন, ‘সবাই আমাকে কেবল পেকারম্যানের সহকারী হিসেবেই মনে রেখেছে। কিন্তু আমি হাসতাম, চুপ ছিলাম। আমি আমার কাজ নিয়ে থাকতাম। নিজের ওপর বিশ্বাস হারাতাম না।’ জানা যায়, তার এই শান্ত মনোভাবটাই তখন পছন্দ হয়েছিল কলম্বিয়া ফুটবল ফেডারেশন কর্তৃপক্ষের। দলটির চাকরি নিয়ে যিনি প্রথম অ্যাসাইনমেন্ট হিসেবে কাতারে দেখতে গিয়েছিলেন হামেস রদ্রিগেজকে। প্রথম দেখাতেই যাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন ক্লাব বদলাতে। টাকা কিংবা কোচের কথা রাখতে নয়, দেশের জন্য লড়াই করার সেদিন মন্ত্র দিয়েছিলেন রদ্রিগেজের কানে। কোচের কথা রেখেছিলেন সাবেক রিয়াল মাদ্রিদ তারকা। কাতারের লোভনীয় প্রস্তাব ফেলে অতিসত্বর যোগ দেন গ্রিসের ক্লাব অলিম্পিয়াকোস এফসিতে। যেখানে নতুন করে নিজেকে খুঁজে পান ২০২২ সালে ব্রাজিলের ক্লাব সাও পাওলোতে যোগ দেওয়া এই ফরোয়ার্ড। সেটির প্রভাব রাখছেন এবারের ইউরো আসরেও। টুর্নামেন্টে কোনো গোল না পেলেও সতীর্থকে দিয়ে ছয়টি গোল করিয়েছেন রদ্রিগেজ।

কোপার ইতিহাসে একবারই শিরোপা জয়ের রেকর্ড আছে কলম্বিয়ার। সেটি ২০০১ আসরে। মেক্সিকোকে ১-০ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল কলম্বিয়া। নিজেদের ঘরের মাঠের সেই আসরে কোনো গোল হজম না করেই প্রতিযোগিতার মুকুট পরে দলটি। কোপায় এটি কলম্বিয়ার তৃতীয় ফাইনাল। এর আগে ১৯৭৫ সালের আসরে ফাইনালে উঠে পেরুর বিপক্ষে স্বপ্নভঙ্গ হয় তাদের। এবার আর স্বপ্নভঙ্গ নয়, মার্কিন আসরে জিততে চান প্রতিযোগিতায় নিজেদের দ্বিতীয় শিরোপা।

এদিকে দুর্দান্ত খেলেই ফাইনালে উঠেছে আর্জেন্টিনা। এবার ফাইনাল জিততে আরেকটি ম্যাচে হারাতে হবে কলম্বিয়াকে। নিকট অতীতে যাদের সামনে পড়েনি লিওনেল স্কালোনির দল। কনমেবল অঞ্চলের বাছাইপর্বেও একে অপরের বিপক্ষে এখনও দেখা হয়নি এই দুই দলের। এটিই ভাবাচ্ছে আর্জেন্টিনা বসকে, ‘ফাইনাল জেতা মোটেও সহজ হবে না। কেননা লরেঞ্জোর এই কলম্বিয়ার বিপক্ষে আমরা কোনো ম্যাচ খেলিনি। নিঃসন্দেহে এটি খুব কঠিন ম্যাচ হতে চলেছে।’