আরিফুর রাজু
প্রকাশ : ০৯ জুলাই ২০২৪ ১৩:৩৯ পিএম
আপডেট : ০৯ জুলাই ২০২৪ ১৭:৩৭ পিএম
কী বোর্ডের ব্যাকস্পেসে না বলতে চাওয়া অনেক কথাই মুছে ফেলা যায়। কিন্তু জীবন? কখনও শেষ বিকেলে নীড়ে ফেরা শুভ্র সাদা বকের দল। আজ শিশু, কাল যুবক, পরশু বয়োবৃদ্ধ। এরপর…, চির অচিনের সঙ্গে মিশে যাওয়া। যাপিত জীবনের নানা রঙ। ফুটবলেও তাই। এখানে কুঁড়ি থেকে ফুল হয়ে ফোটেন ফুটবলাররা, ঝরেও পড়েন কোনো এক শীতের ভোরে। নশ্বর পৃথিবীতে স্থায়ী নয় কোনোকিছুই। সাম্প্রতিক সময়ে ফুটবলে চলছে নক্ষত্র পতনের মিছিল। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, পেপে, টনি ক্রুস, লুকা মদরিচ, টমাস মুলার, ম্যানুয়েল নুয়ার ও অলিভিয়ের জিরুদের মতো দুনিয়া মাতানো ফুটবলশিল্পীদের বিদায় দেখতে হয়েছে ভক্তদের। জীবনের মতো ফুটবলও যে নানা রঙের, বেলা শেষে সেই গানই যেন হয়ে উঠেছে নির্মম অথচ চরম সত্যি।
ইউরো তার নিয়মেই চলবে, ঠিক চার বছর পরপর। ২০২৮ সালেও ইউরো খেলবে পর্তুগাল। ইউরোপের সেরা প্রতিযোগিতায় পর্তুগিজদের ফ্রন্টলাইনার যোদ্ধা হবেন নতুন একটি প্রজন্ম। রাফায়েল লিও, নুনো মেন্ডিসদের গায়ে থাকবে মেরুন জার্সি। চিরচেনা সবুজ গালিচায় থাকবেন না রোনালদো-পেপে। না থেকেও শেষ পর্যন্ত তারা রয়ে যাবেন। আরও অনেক বছর পর ফুটবল মাঠে কেউ যখন আলো ছড়াবেন তখনই উঠে আসবে রোনালদোদের নাম।
‘সিআর সেভেন’ আগেই ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছিলেন, ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপে এটাই তার শেষ মিশন। কুড়ি বছর ধরে ইউরোর সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের ‘ঘা’ তাই একটু গভীরই ছিল। শেষ না রাঙাতে পারার আফসোস, পেনাল্টি মিস বেশ পুড়িয়েছে তাকে। হাউমাউ করে কেঁদেছেন স্লোভেনিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে। সেই ১৭ নম্বর জার্সি থেকে ৭ নম্বরে পরিচিত হওয়া। ইউরোর অসংখ্য রেকর্ড। ইউরোয় সর্বাধিক ১৪টা গোল, ৮টা অ্যাসিস্ট। ইউরো ইতিহাসে অর্জনে তার ধারেকাছে কেউ নেই। ৪০ ছুঁইছুঁই বয়সেও ফুটবলের প্রতি তার প্যাশন কমেনি এতটুকুও। এনার্জিটিক। এতসবের পরও দেশের জার্সিতে রোনালদোর শেষটা হয়েছে বেদনাবিধুর। একই কষ্টের সঙ্গী রোনালদোর প্রিয় বন্ধু ও সতীর্থ পেপেরও। ডিফেন্স লাইনে দুর্গ গড়ে তোলা পেপে ফ্রান্সের বিপক্ষে হেরে কোয়ার্টার ফাইনালে বিদায় নেওয়ার পর কেদেঁছেন শিশুদের মতো।
ইউরো জিততে না পারার আক্ষেপ নিয়েই মিশন শেষ করলেন জার্মানদের বহু যুদ্ধের সেনাপতি টনি ক্রুস। স্নাইপার খ্যাত ক্রুসের অব্যর্থ নিশানায় বহু ম্যাচের ফল গেছে জার্মানদের পক্ষে। তাকে নিয়ে জিনেদিন জিদানের একটি বক্তব্যই যথেষ্ট, ‘বার্সেলোনা ৪০ পাসে যা করতে পারে, ক্রুস এক পাসেই তা করতে পারে।’ এবারের আসরে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকেই বিদায়ঘণ্টা বাজল ক্রুস তথা জার্মানদের। তবে শেষ আসরেও তার পাসিং অ্যাকুরেসি ৯৫ শতাংশ।
শেষটা সুন্দর হয়নি লুকা মদরিচেরও। ৩৮ বছর বয়সি মদরিচকে আর দেখা যাবে না ক্রোয়েশিয়ার জার্সিতে। তবে জাতীয় দলের হয়ে শেষ ম্যাচ পর্যন্ত লড়াই করেছেন। যেমনটা বলেছেন ইতালির বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচের দিন, ‘আপনি যখন এভাবে হেরে যাবেন তখন আপনার অনুভূতি বর্ণনা করার জন্য শব্দ খুঁজে পাওয়া কঠিন।’
আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় বলছেন ফ্রান্সের অলিভিয়ার জিরুও। ফরাসিদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা তো বটে, চলতি শতকে একমাত্র যে বিশ্বকাপ জিতেছে দলটাÑ তাতে বড় অবদান তার। ফরাসি সংবাদমাধ্যম লে’কিপের সঙ্গে আলাপে অবসরের ঘোষণাটা দেন জিরু, ‘ল্য ব্লুর সঙ্গে এই ইউরোই আমার শেষ টুর্নামেন্ট। ফ্রান্সের জার্সিতে খেলাটাকে অনেক মিস করব।’ ফ্রান্সের হয়ে সর্বোচ্চ গোল তার। ১৩১ ম্যাচ খেলে ৫৭ গোল করেছেন জিরু। গেল বিশ্বকাপে থিয়েরি অঁরির ৫১ গোলের রেকর্ডকে দুইয়ে ঠেলে এই রেকর্ড গড়েন তিনি।
ক্রুসের মতো ম্যানুয়েল নয়্যার ও থমাস মুলারও আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায় নিচ্ছেন। আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু না বললেও জার্মান স্কাই স্পোর্টসকে মুলার বলেন, ‘খুব সম্ভবত এটাই আমার শেষ ইউরো।’ জার্মানের তিন অভিজ্ঞ খেলোয়াড় যাদের প্রত্যেকেরই জার্মানির জার্সিতে একশ’র বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন। শুরু দেখে শেষ পর্যন্ত তারা লড়াই করে গেছেন দেশের জন্য। কিন্তু বয়সের ফাঁদে তাদেরও ছাড়তে হলো আন্তর্জাতিক ফুটবল।