প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০৬ জুলাই ২০২৪ ০০:০৫ এএম
আপডেট : ০৬ জুলাই ২০২৪ ১০:৫১ এএম
গোল সেভের পর মার্টিনেজের উদযাপন। সংগৃহীত ছবি
এমিলিয়ানো মার্টিনেজ না থাকলে কাতার বিশ্বকাপে যে কী হতোÑ চায়ের আড্ডায় এখনও জমে ওঠে এসব আলোচনা। গতকাল শুক্রবার কোপা আমেরিকায়ও আর্জেন্টিনার ত্রাতা সেই মার্টিনেজ। ইকুয়েডরের বিপক্ষে টাইব্রেকারে জেতালেন দলকে। যেমন মহানায়ক বনে গিয়েছিলেন আগের কোপায়, বিশ্বকাপে এবং চলতি আসরেও। ২০২১ সালে ল্যাতিন আমেরিকার শ্রেষ্ঠত্বের আসরে কলম্বিয়ার বিপক্ষে মার্টিনেজ ঠেকিয়েছিলেন তিন পেনাল্টি। এরপর বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডস আর ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে জয়, সে তো এমির বিশ্বস্ত গ্লাভসের সৌজন্যেই।
মার্টিনেজের বীরত্ব, দেশপ্রেম আর মেসিপ্রীতি অল্প কথায় লেখা হলেও এর বিস্তৃতি বহুদূর। আকাশি-নীল দলের হয়ে এখন পর্যন্ত চারবার টাইব্রেকার শুটআউটে দাঁড়িয়েছেন এমি। জিতেছেন চারটিতেই। এর মধ্যে মোট ১৮টি শট হয়েছে তার বিরুদ্ধে, ৯টিতেই প্রতিপক্ষ গোল করতে পারেনি। একটি ছিল পোস্টের বাইরে, বাকি আটটি রুখে দিয়েছেন তিনি। মূলত মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ে বারবারই প্রতিপক্ষকে দুর্বল করে দেন এমি। গতকাল যেমনটা অধিনায়কের ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে সেমিফাইনালে তুলে এনেছেন দলকে । যেন সর্বশেষ বিশ্বকাপে সেই সেমি আর ফাইনালের পুনরাবৃত্তি।
ইকুয়েডরের বিপক্ষে মহাগুরুত্বপূর্ণ কোয়ার্টারে মূল ম্যাচ ১-১ গোলে ড্র থাকার পর লড়াই গড়ায় টাইব্রেকারে। আর্জেন্টিনার হয়ে টাইব্রেকারে প্রথম শট নিতে এসে গড়বড় করে বসেন মেসি। পোস্টের মাঝামাঝি ‘পানেনকা’ শট নেন। তা বারে লেগে ফেরত আসে। সেই অবস্থা থেকে আর্জেন্টিনা জয় পায় ৪-২ ব্যবধানে। আর এটা সম্ভব হয়েছে মার্টিনেজের কল্যাণে। পরপর দুটি শট ফিরিয়ে দেন তিনি। তাতে মেসিকে যেমন দুয়ো থেকে রক্ষা করেছেন, তেমনি উচ্ছ্বাসে ভাসিয়েছেন দলকেও। মার্টিনেজ প্রথমে অ্যাঞ্জেল মেনার শট এবং পরে দুর্দান্ত ক্ষিপ্রতায় অ্যালেন মিন্ডার শট রুখে দেন। তাতেই ম্যাচের লাগাম নেয় আকাশি-নীল জার্সিধারীরা।
টাইব্রেকারে ব্যাকফুটে যাওয়ার পরও মার্টিনেজের প্রতি আস্থা ছিল মেসির। ফুটবলের বরপুত্রের সম্মান বাঁচানোর জন্য যে জীবন বাজি রাখতে পারেন এটা বারবার বলেছেন মার্টিনেজ। ৩১ বছর বয়সি সতীর্থ গোলকিপারের প্রশংসায় উচ্চকণ্ঠ ইন্টার মিয়ামি তারকা মেসি বলেছেন, ‘আমি জানতাম, এ ধরনের সময়ে দিবু (মার্টিনেজ) দাঁড়িয়ে যাবে। এ ধরনের মুহূর্তই ওর পছন্দ, যেটা তাকে বড় করে তুলেছে। ও গোলবারের নিচে থাকলে অন্য রকম হয়ে ওঠে।’ ম্যাচ শেষে প্রত্যয়ী মার্টিনেজ বলেন, ‘ওদের (সতীর্থদের) বলেছি, আমি বাড়ি যেতে প্রস্তুত নই। আমরা সমর্থকদের অনুভব করি। আমার পরিবারও কাছেই আছে। এগুলো জীবনের বিশেষ মুহূর্ত। এই দল আরও সামনে এগিয়ে যাওয়ার মতো। সব মিলিয়েই ব্যাপারটি রোমাঞ্চকর।’
আর্জেন্টিনার রূপকথার নায়কের এমন পারফরম্যান্সের পেছনের আছে হাড়ভাঙা পরিশ্রম। টাইব্রেকারে নিজের সাফল্য সম্পর্কে জানিয়েছেন, প্রতিদিনই কমপক্ষে ৫০০টি পেনাল্টি শটের অনুশীলন করি। দেশের প্রতি তার দায়বদ্ধতা এমনই যে, সব সময়ই সেরাটা দিতে মুখিয়ে থাকেন এই আর্জেন্টাইন গোলরক্ষক।
গোলবারের নিচে শিষ্যর এমন কীর্তিতে ভীষণভাবে আপ্লুত আর্জেন্টাইন কোচ লিওনেল স্কালোনি। তার ভাষায়, ‘পেনাল্টি শুটআউটে দলের সবাই অন্ধভাবে গোলরক্ষকের ওপর বিশ্বাস করেছিল আর এটাই স্বাভাবিক। যদিও লিও (মেসি) মিস করেছিল, তারপরও পুরো দল জানত, ভালো কিছু হতে যাচ্ছে।’ তার মতে এমি সবার চেয়ে আলাদা, ‘আমি গোলকিপিং কোচ নই। কিন্তু যখন তারা গোল সেভ করে বিপক্ষ দলের ওপর আধিপত্য দেখায়, খেলা থেকে ছিটকে দেয়। আর সে (এমি মার্টিনেজ) গোল বাঁচায়। এমনভাবে গোল ঠেকায়, যেন সে মাঠকেই আওয়াজ করতে বাধ্য করে। এটা খুবই ভালো দিক যে, সে আর্জেন্টাইন।’
দলকে সেমিফাইনালে তোলা পারফরম্যান্স মেলে ধরার পর স্বাভাবিকভাবেই সতীর্থদের প্রশংসায় ভাসছেন মার্টিজেন। দীর্ঘ দিন ধরে একসঙ্গে খেলা মিডফিল্ডার রদ্রিগো দে পলের কাছে তিনি যেন অতিমানব। অভিনন্দন বার্তায় বলেছেন, আমাদের গোলবারের সামনে একটা দৈত্য আছে। সে যা করে চলেছে, স্রেফ পাগলাটে। তার এটি প্রাপ্য। এই জার্সি সে ভালোবাসে। এটি আমাদের অনেক নির্ভরতা ও প্রশান্তি দেয়।’
সার্জিও গয়কোচিয়া অধ্যায়ের পর একজন বিশ্ব মাতানো গোলরক্ষক পেয়েছে আর্জেন্টিনা। একের পর এক পেনাল্টি রুখে দিয়ে অর্জনে কিংবদন্তির গোলরক্ষক গায়কোচিয়াকেও পেছনে ফেলেছেন মার্টিনেজ। শিরোপার খরা কাটানোর লড়াইয়ে বারবার তার দল ব্যর্থ হওয়ার পর ২০০৭ সালে সামাজিক মাধ্যমে হতাশা ব্যক্ত করে মার্টিনেজ বলেছিলেন ‘আমারও দিন আসবে।’ প্রতিনিয়তই সেই সোনালি দিন উপহার দিয়ে চলেছেন এই আর্জেন্টাইন গোলরক্ষক।