আজমীর নাছের জাফরী
প্রকাশ : ৩০ জুন ২০২৪ ১৯:২৯ পিএম
আপডেট : ৩০ জুন ২০২৪ ১৯:৩০ পিএম
অঘটন আর রেকর্ডে অনন্য এক টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ উপহার দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ
সর্বোচ্চ দল নিয়ে এবারের বিশ্বকাপ নতুন উপহারের দিক থেকেও টেক্কা দিয়েছে অতীতকে। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে এই প্রথমবারের মতো অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন (ভারত) দেখার স্বাদ পেলেন ক্রিকেটপ্রেমীরা। সর্বাধিক ২০ দল নিয়ে শুরু হওয়া এবারের আসরে প্রথমবারের মতো অংশ নেয় স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও উগান্ডা। রান খরা, মন্থর উইকেট, আফগানদের বীরত্বগাথা, যুক্তরাষ্ট্রের চমক- এমন নানান ঘটনা প্রবাহ এবারের আসরটিকে দিয়েছে নতুন মাত্রা।
প্রথমবারের মতো অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন : ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ত সংস্করণে আগের আট আসরে যেটা কখনোই ঘটেনি সেই বিরল ঘটনাটির সাক্ষী হলো ক্রিকেটবিশ্ব। প্রথমবারের মতো অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন পেল টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। এবারের আসরে ফাইনালে ওঠার পথে একটি ম্যাচও হারেনি ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকা। শেষে কাপ্তান রোহিত শর্মার দল অজেয় থেকে শিরোপা ছিনিয়ে নিয়ে রেকর্ডটা নিজেদের করে নিল।
রান খরার আসর : টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে এবারের মতো রান খরা দেখা যায়নি আগের আসরগুলোতে। অথচ বিশ্বকাপের আগে ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগগুলোতে দেখা যাচ্ছিল বোলারদের নিয়ে রীতিমতো ছেলেখেলা করেছেন ব্যাটাররা। এবারের বিশ্বকাপে তিনশ রান হয়ে যেতে পারে- এমন ধারণাও করেছিলেন অনেকেই। কিন্তু বাস্তবে ঘটল তার উল্টোটাই। নবম আসরে ফাইনালের আগ পর্যন্ত ৫৩ ম্যাচের ২৫টির নিষ্পত্তি হয়েছে ১৪০ রানের কম স্কোরে। শতরানের নিচে প্রতিপক্ষ শিবির অলআউট হয়েছে- এমন ঘটনা ঘটেছে ১১ বার; যা আগের যেকোনো বিশ্বকাপকে ছাপিয়ে গিয়েছে।
বিতর্কিত উইকেট : এবারের বিশ্বকাপ উইকেট যেন এক বিতর্কের নাম। বিশেষত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের ম্যাচগুলোতে ব্যাটারদের ওপর রীতিমতো ছড়ি ঘুরেয়েছে প্রতিপক্ষ বোলাররা। লো-স্কোরিং ম্যাচে রান তাড়া করতে নেমে হার মানতে হয়েছে অস্ট্রেলিয়া, পাকিস্তানের মতো সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। হারতে হারতে শেষ বলে বাংলাদেশ ও নেপালের সাথে জয় পেয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা। যুক্তরাষ্ট্রের ড্রপ ইন উইকেট নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছেন ক্রিকেট বিশেষজ্ঞগণ।
যুক্তরাষ্ট্রের চমক : এই আসরে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র জন্ম দেয় বড় চমকের। টি-২০ বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচ খেলতে নেমেই সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন এবং গত আসরের রানার্সআপ পাকিস্তানকে সুপার ওভারে হারায় ৫ রানে। এই জয়ের সুবাদে নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপে খেলতে নেমেই সুপার এইটে জায়গা করে নেয় যুক্তরাষ্ট্র।
আফগান বীরত্ব : এবারের আসরে আফগানিস্তানের পারফরম্যান্স যেন জানান দিয়েছে তাদের সকল সংগ্রাম, ত্যাগ, তিতিক্ষার বিনিময়ে উত্থানের গল্পগুলোকে। ক্রিকেটের ক্ষুদ্র সংস্করণে আফগানরা বরাবরই ডার্ক হর্স। রশিদ, নবী, ফারুকীরা। গ্রুপ পর্বে তাদের কাছে ধরাশায়ী হয় নিউজিল্যান্ড। সুপার এইটে আফগানরা হারায় বিশ্ব আসরের সবচেয়ে সফলতম দল অস্ট্রেলিয়াকে। সুপার এইটে নিজেদের শেষ ম্যাচে বাংলাদেশকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো জায়গা করে নেয় সেমিফাইনালে। ফাইনালের আগ পর্যন্ত ২৮১ রান নিয়ে শীর্ষ রান সংগ্রাহক আফগান ব্যাটার রহমতুল্লাহ গুলবাজ। ফাইনালের আগ পর্যন্ত ১৭ উইকেট নিয়ে আসরের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি আফগান পেসার ফজল হক ফারুকী।
সেঞ্চুরিবিহীন বিশ্বকাপ : টি-২০ বিশ্বকাপে মোট সেঞ্চুরির সংখ্যা ১১টি। বিশ্বকাপের দ্বিতীয় আসর ছাড়া প্রতিটি আসরেই সেঞ্চুরি দেখা পেয়েছেন ব্যাটাররা। ২০০৯-এর বিশ্ব আসরের পর আরও একটি বিশ্বকাপে সেঞ্চুরির দেখা মেলেনি।
তিন হ্যাটট্রিকের বিশ্বকাপ : এবারের আসরের অন্যতম আকর্ষণ হ্যাটট্রিক। এখন পর্যন্ত টি-২০ বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক হয়েছে সর্বমোট ৯টি। এর মধ্যে এবারের আসরেই হয়েছে ৩টি; যা পেছনে ফেলেছে অন্য আসরগুলোকে। অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক প্যাট কামিন্স টানা দুই ম্যাচে হ্যাটট্রিক করে গড়েন অন্যন্য নজির।
ঠাসা সূচি ও রিজার্ভ ডে বিতর্ক : এবারের আসরে বিশেষ করে সুপার এইটে ঠাসা সূচিতে খেলতে হয়েছে দলগুলোকে। বাংলাদেশ ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে খেলছে অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের বিপক্ষে। আবার ভারতকে তিন ম্যাচ খেলতে হয়েছে পাঁচ দিনের ব্যবধানে। দক্ষিণ আফ্রিকার তিন ম্যাচ খেলতে হয়েছে চারদিনের ব্যবধানে; যা প্লেয়ারদের ওপর বাড়তি চাপের সৃষ্টি করেছে। যার প্রভাব পড়েছে মাঠের ক্রিকেটেও। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সে মতে মুখোমুখি হওয়ার আগে ঘুমানোরও সুযোগ পাননি আফগান ক্রিকেটাররা- উঠেছে এমন অভিযোগও।
এ ছাড়াও সেমিফাইনালের রিজার্ভ ডে নিয়েও ছিল বিতর্ক। যেখানে প্রথম সেমিফাইনালে রিজার্ভ ডে থাকলেও, দ্বিতীয় সেমিফাইনালে ছিল না কোনো রিজার্ভ ডে। এর ব্যাখ্যায় আইসিসি জানায়, প্রথম সেমিফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে স্থানীয় সময় রাত ৮:৩০ মি। দ্বিতীয় সেমিফাইনাল হবে স্থানীয় সময় সকাল ১০:৩০-এ। দ্বিতীয় সেমিফাইনাল যদি রিজার্ভ ডে তে গড়ায় তাহলে জয়ী দলকে এক দিনের ব্যবধানে ফাইনাল খেলতে হবে। তাই দ্বিতীয় সেমিফাইনালে কোনো রিজার্ভ ডে রাখা হয়নি।
নতুন নিয়মের বিভ্রাট : এবারের টি-২০ বিশ্বকাপ শুরুর আগে ৮টি দলকে নিয়ে প্রতিটি গ্রুপে অবস্থান চূড়ান্ত করা হয়। তাদের বদলে যে দলগুলো সুপার এইটে উঠেছে তাদের পাশে বসে গিয়েছে সেই নম্বর। কেননা, প্রি-টুর্নামেন্ট বাছাইয়ে শ্রীলঙ্কা, নিউজিল্যান্ড, পাকিস্তান ছিটকে পড়ে। প্রি টুর্নামেন্ট বাছাইয়ে এ-১ হিসেবে নেওয়া হয়েছিল ভারতকে আর পাকিস্তানকে এ-২। বি-১ বেছে নেওয়া হয়েছিল ইংল্যান্ডকে, বি-২ অস্ট্রেলিয়াকে। সি-১ বেছে নেওয়া হয় নিউজিল্যান্ডকে, সি-২ ওয়েস্ট ইন্ডিজকে। ডি-১ ছিল দক্ষিণ আফ্রিকা, ডি-২ শ্রীলঙ্কা।
ইংল্যান্ড শেষ ম্যাচে নিশ্চিত করেছে সুপার এইট। তবে ওই গ্রুপের পয়েন্ট তালিকার শীর্ষে ছিল অস্ট্রেলিয়া, দুইয়ে ইংল্যান্ড। কিন্তু সুপার এইটে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রি-সিডিং অনুয়ায়ী বি গ্রুপের ১ নম্বর দল বিবেচিত হয়েছে ইংল্যান্ড, দুইয়ে অস্ট্রেলিয়া। ফলে প্রি-সিডিং না থাকলে যেখানে ভারতের বিরুদ্ধে ইংল্যান্ডকে খেলতে হতো। প্রি-সিডিংয়ের নিয়মের কারণে সুপার এইটে ভারতসহ গ্রুপ পর্বের শেষে শীর্ষে থাকা তিনটি দলকে খেলতে হয়েছে একই গ্রুপে।
সর্বকনিষ্ঠ ও বয়োজ্যেষ্ঠ ক্রিকেটার : এবারের বিশ্বকাপে সর্বকনিষ্ঠ ক্রিকেটার হিসেবে নাম লিখিয়েছেন নেপালের ১৮ বছর বয়সি পেস অলরাউন্ডার গুলশান ঝাও। ২০০৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন গুলশান।
উগান্ডার অলরাউন্ডার ফ্রাঙ্ক এনসুবুগা প্রথমবারের মতো অংশ নেন টি-২০ বিশ্ব আসরে। ৪৩ বছর বয়সি এনসুবুগার এবারের আসরের সবচেয়ে বয়স্ক ক্রিকেটার। শুধু তাই নয়, এই বিশ্বকাপে খেলতে আসা ক্রিকেটারদের মধ্যে নামিবিয়ায় জন্মগ্রহণ করা এই অলরাউন্ডারের ক্যারিয়ারই সবচেয়ে দীর্ঘ। তার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয় ১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফিতে। মাত্র ১৬ বছর বয়সে পূর্ব ও মধ্য আফ্রিকার হয়ে অংশ নেন। অভিষেক ঘটার প্রায় তিন দশক পরে বিশ্বকাপের মঞ্চে খেলার স্বপ্ন পূরণ করেন ৪৩ বছর বয়সি এই ক্রিকেটার।