রুবেল রেহান
প্রকাশ : ২৯ জুন ২০২৪ ১১:৫৫ এএম
আপডেট : ২৯ জুন ২০২৪ ১২:০৪ পিএম
ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ততম ভার্সন টি-টোয়েন্টির উত্তেজনাকে বর্ণনা করার জন্য রুদ্ধশ্বাস, ক্লাইমেক্স, স্নায়ুক্ষয়ী এই শব্দগুলোও যথেষ্ট নয়। আর ম্যাচ যদি হয় বিশ্বকাপের ফাইনাল তাহলে এই উত্তেজনা কোন মাত্রা নেয় সেটা অনুধাবন করার জন্য প্রয়োজন পড়ে না বিশেষজ্ঞ হওয়ার। উত্থান-পতন আর নাটক ছাড়িয়ে নাটকীয় ফাইনালকে যারা আপন রঙে রাঙিয়েছেন, তুলির শেষ আঁচড়ে ভক্তদের উচ্ছ্বাসে ভাসিয়েছেন তাদের কীর্তিগাথায় একবার চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক।
ফাইনাল (২০০৭) : পাকিস্তানের বাড়া ভাতে যোগিন্দর শর্মার ছাই
ক্রিকেটের গৌরবময় অনিশ্চয়তার একটা বিজ্ঞাপন যেন জোহানেসবার্গের প্রথম বিশ্বকাপ ফাইনাল ম্যাচটি। ক্ষণে ক্ষণে রঙ বদলানো এই ম্যাচে শেষ ওভারে পাকিস্তানের জয়ের জন্য প্রয়োজন হয় ১৩ রান। এর আগে ভারতের গড়া ১৫৭ রান টপকানোর চ্যালেঞ্জে খেলতে নেমে ১৯ ওভার শেষে পাকিস্তানের সংগ্রহ দাঁড়ায় ৯ উইকেটে ১৪৫। শেষ ওভারে পেসার যোগিন্দর শর্মার হাতে বল তুলে দিলেন ভারত অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি। স্ট্রাইকে ইনফর্ম ব্যাটার মিসবাহ-উল-হক। প্রথম বল ওয়াইড। পরের বল উড়িয়ে ছক্কা হাঁকালেন মিসবাহ। শিরোপা জেতার জন্য ৪ বলে দরকার মাত্র ৬ রান। এমন সমীকরণও মেলাতে পারলেন না পাকিস্তান অধিনায়ক। স্কুপ খেলতে গিয়ে শর্ট ফাইন লেগে শ্রীশান্থের হাতে ধরা পড়লেন পাকিস্তান অধিনায়ক। যোগিন্দর ম্যাজিকে ইতিহাস গড়ল ভারত।

ফাইনাল (২০০৯) : আফ্রিদি সলো শো
শহীদ আফ্রিদির অলরাউন্ড নৈপুণ্যে প্রথম আসরের দুঃখ মোচন করল পাকিস্তান। লর্ডসের ওই ফাইনালে কোনো প্রতিরোধই গড়তে পারেনি শ্রীলঙ্কা। টস জিতে আগে ব্যাট করতে নেমে আব্দুল রাজ্জাক ও আফ্রিদির বোলিংয়ে ১৩৮/৬ নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয় লঙ্কানদের। ৩ ওভারে ২০ রান খরচায় রাজ্জাক নেন ৩ উইকেট। আফ্রিদি একটি উইকেট পেলেও ৪ ওভার থেকে দেন মাত্র ২০ রান। ব্যাট হাতে আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠেন আফ্রিদি। ওয়ান ডাউনে খেলতে নেমে শিরোপা জিতেই মাঠ ছাড়েন বুমবুম খ্যাত এই অলরাউন্ডার। মাত্র ৪০ বলের ইনিংসে ৫৪ রানে অপরাজিত থাকেন আফ্রিদি। ইনিংসটিতে মারেন দুটি করে চার ও ছক্কা। একতরফা ফাইনাল ম্যাচটি পাকিস্তান জেতে ৮ উইকেটে।

তৃতীয় আসরের ফাইনালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী অস্ট্রেলিয়ার সৌধ গুঁড়িয়ে দিয়ে শিরোপা জেতে ইংল্যান্ড। ওয়েস্ট ইন্ডিজের কেনসিংটন ওভালের ফাইনালে আগে ব্যাট করে স্কোরবোর্ডে ১৪৭ রান যোগ করে অস্ট্রেলিয়া। জবাবে শুরুতেই ধাক্কা খায় ইংল্যান্ড। ব্যক্তিগত ২ রানে বিদায় নেন ওপেনার মাইকেল লাম্ব। কিন্তু অজিদের সুখস্মৃতি বেশিক্ষণ স্থায়ী হতে দেননি ক্রেইগ কিসওয়েটার ও কেভিন পিটারসেন। দ্বিতীয় উইকেটে মাত্র ৬৮ বলের জুটিতে ১১১ রান তুলে নেন এ দুজনে। যতক্ষণে আউট হলেন ততক্ষণে ম্যাচটা পরিণত হয়েছে আনুষ্ঠানিকতায়। ৪৯ বলের ইনিংসে ৬৩ রান করেন ক্লেসুয়েটার। আর পিটারসেনের ৪৭ রান আসে মাত্র ৩১ বলের কনকর্ডে চড়ে। অস্ট্রেলিয়াকে ৭ উইকেটে হারিয়ে ক্রিকেটের বৈশ্বিক আসরে প্রথমবারের মতো শিরোপা উৎসব করে ইংলিশরা।

ফাইনাল (২০১২) : গোখরো উইকেটে স্যামুয়েলস বিস্ফোরণ
কলম্বোর রানাসিংহে প্রেমাদাসা উইকেটে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের চতুর্থ আসরের ফাইনালটি ব্যাটসম্যানদের জন্য হয়ে ওঠে মৃত্যুফাঁদ। রান নেওয়া তো দূরে থাক উইকেটে টিকে থাকাটাই ব্যাটসম্যানদের জন্য হয়ে ওঠে প্রাণের দায়। এমন গোখরো উইকেটে স্বাগতিক লঙ্কানদের বিপক্ষে ক্রিকেটের তিন ধরনের ব্যাটিংই প্রদর্শন করলেন ক্যারিবীয় টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান মারলন স্যামুয়েলস। উইকেট আগলে রেখে প্রথমে টেস্ট ব্যাটিং, এরপর ওয়ানডে এবং শেষদিকে ব্যাট করলেন টি-২০ মেজাজে। ওয়ান ডাউনে খেলতে নামা স্যামুয়েলস শুরুটা করলেন কচ্ছপের গতিতে। ১২ ওভার শেষে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সংগ্রহ দাঁড়াল মোটে ৪৮/২। ৩৭ বলে স্যামুয়েলস অপরাজিত ২৬। এরপর খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসা শুরু করলেন স্যামুয়েলস। তবে খুব বেশি আগ্রাসী হননি। হাফসেঞ্চুরি পূর্ণ করলেন ৪৬ বলে। এরপর স্যামুয়েলস সুনামি বইয়ে দিলেন কলম্বোয়। মাত্র ৫৫ বলে খেললেন ৭৮ রানের রাজসিক ইনিংস। শেষদিকে উইন্ডিজ অধিনায়ক ড্যারেন স্যামির ঝড়ো ইনিংসের (১৫ বলে ২৬*) কল্যাণে ২০ ওভার শেষে ৬ উইকেট হারিয়ে ১৩৭ রান তোলে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। জবাবে এই মৃত্যুফাঁদে আটকে গেল লঙ্কানরা। ১০১ রান তুলতেই দম ফুরিয়ে গেল স্বাগতিকদের। ৩৭ রানে জিতে ৩৩ বছর পর কোনো বৈশ্বিক ক্রিকেট টুর্নামেন্টে শিরোপা জয়ের গৌরবের অধিকারী হলো ওয়েস্ট ইন্ডিজ। তারা শেষবার ওয়ানডে বিশ্বকাপ জিতেছিল ১৯৭৯ সালে।
ঢাকায় সর্বশেষ আসরের ফাইনালটি নিজের রঙে রাঙিয়ে রাখলেন লঙ্কান ব্যাটিং কিংবদন্তি কুমার সাঙ্গাকারা। আগে ব্যাট করতে নেমে শট খেলার জন্য দুরূহ ৪ উইকেটে ১৩০ রানে থামে ভারত। জবাবে চটজলদি দুই ওপেনার কুশল পেরেরা (৫) ও তিলকারত্নে দিলশানকে (১৮) হারিয়ে বিপাকে পড়ে শ্রীলঙ্কা। মাত্র ৪১ রানে ২ উইকেট হারায় দলটি। ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই ব্যক্তিগত ২৬ রানে বিদায় নেন মাহেলা জয়াবর্ধনে। এ অবস্থায় পরিস্থিতি শক্ত হাতে সামাল দেন সাঙ্গাকারা। এক প্রান্ত থেকে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে গুঁড়িয়ে দেন ভারতের স্বপ্ন। মাত্র ৩৫ বলে ৫২ রানে অপরাজিত থেকে শিরোপা জিতিয়ে মাঠ ছাড়েন সাঙ্গাকারা। আর এর মধ্য দিয়ে কোনো বৈশ্বিক আসরে প্রথমবারের মতো শিরোপা জয়ের স্বাদ পেলেন সাঙ্গাকারা ও মাহেলা। মিরপুর হয়ে থাকল মাহেলা-সাঙ্গাকারার বিদায়ি উপহারের মঞ্চ।

জিততে হলে শেষ ওভারে করতে হবে ১৯ রান। স্ট্রাইকে অখ্যাত কার্লোস ব্রাফেট। কে জানত এখান থেকে জিতবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ! তবে অবিশ্বাস্য কাণ্ড ঘটালেন ব্রাফেট। বেন স্টোকসের করা শেষ ওভারে টানা চারটি বিশাল ছক্কা হাঁকিয়ে দলকে পৌঁছে দেন জয়ের বন্দরে। চ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ক্রিকেটকে বলা হয় গৌরবময় অনিশ্চয়তার খেলা। ভারতের ইডেন গার্ডেনসে ২০১৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ওই রুদ্ধশ্বাস ফাইনালে ইংল্যান্ডকে ৪ উইকেটে হারিয়ে শিরোপা জেতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ইতিহাসের প্রথমবারের মতো কোনো দল দ্বিতীয়বারের মতো শর্টার ফরম্যাটের বিশ্বকাপের দুটি শিরোপা জেতার গৌরব অর্জন করে।
রেকর্ড সর্বোচ্চসংখ্যক ওয়ানডে চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু শর্টার ফরম্যাটের ট্রফিটাই ছুঁয়ে দেখা হয়নি। সেই আক্ষেপ মেটে ২০২১ বিশ্বকাপে। দুবাইয়ের ফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার মুখোমুখি হয় নিউজিল্যান্ড। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জেতার স্বপ্ন ছিল কিউইদেরও। সে লক্ষ্যে আগে ব্যাট করে অজিদের বড় লক্ষ্যই ছুড়ে দেন কেন উইলিয়ামসনরা। ৪৮ বলে ৮৫ রান করে দলকে ১৭২ রানের সংগ্রহ এনে দেন অধিনায়ক। এরপর অজিদের আটকে রাখার লড়াইয়ে শুরুতেই অ্যারন ফিঞ্চকে ফেরান ট্রেন্ট বোল্ট। কিন্তু শুরুর এই আনন্দ আর টেকেনি কিউদের। ডেভিড ওয়ার্নারের সঙ্গে জুটি বেঁধে তাণ্ডব চালান মিচেল মার্শ। ৫০ বলে ৭৭ রানের ইনিংস খেলে দলকে জিতিয়েই মাঠ ছাড়েন মার্শদের ছোট ভাই। একটা নতুন শুরুর গল্পে মার্শ নামটা দেখে অনেকেই ইতোমধ্যে একটা মিল খুঁজে পেয়েছেন। অজিদের হয়ে প্রথম ওয়ানডে বিশ্বকাপজয়ী দলে ছিলেন আরেক মার্শ! মিচেল মার্শের বাবা জিওফ মার্শ।

আনপ্রেডিক্টেবল নামটা পাকিস্তানের সঙ্গে তো এমনি এমনি জুড়ে যায়নি। মূলপর্বে ধুঁকতে থাকা পাকিস্তান ২০২২ বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠবে এমনটা অনেকেই ভাবেননি। তাও সেমিফাইনালে শক্তিশালী নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনালে ইংল্যান্ডের সঙ্গী হয় বাবর আজমের দল। ২০০৯ বিশ্বকাপের পর আরেকটি টি-টোয়েন্টি শিরোপা জেতার স্বপ্ন দেখা পাকিস্তানকে বড় ধাক্কা দেন ইংল্যান্ডের স্যাম কারান। মেলবোর্নের ফাইনালে টস জিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে ফিল্ডিং নেয় ইংল্যান্ড। ব্যাটিংয়ে নেমে ইংলিশ বোলারদের বিপক্ষে রান তুলতেই হিমশিম খাচ্ছিলেন বাবর-রিজওয়ানরা। শুরুতে দেখে-শুনে খেলা পাকিস্তান শিবিরে প্রথম আঘাত হানেন কারান। দলীয় ২৯ রানের মাথায় উপড়ে ফেলেন রিজওয়ানের উইকেট। মিডিয়াম এই পেসার ৪ ওভার বল করে দেন মাত্র ১২ রান! বিনিময়ে নিয়েছেন ৩ উইকেট। পাকিস্তানের ১৩৭ রানে আটকে রাখার ইনিংসে মূলভাব এখানেই নিহিত। স্যাম কারানের ২৪ বলের মধ্যে ১৫ বলই ছিল রানশূন্য। সে হিসেবে প্রায় ৬২ শতাংশ বল ডট করেছেন এই বাঁহাতি মিডিয়াম ফাস্ট বোলার। দেননি কোনো চার বা ছক্কা মারার সুযোগ। ফাইনাল কার্যত ওখানেই হেরে বসে পাকিস্তান।