রুবেল রেহান
প্রকাশ : ২৬ জুন ২০২৪ ২১:০০ পিএম
আপডেট : ২৬ জুন ২০২৪ ২১:০২ পিএম
সল্ট-ইংল্যান্ড যুগলে অভিশাপ ঘোচাবে চ্যাম্পিয়নরা
ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন,
এটাই চ্যাম্পিয়নদের বড় অভিশাপ!
আগের আট আসরে ছয়টি ভিন্ন চ্যাম্পিয়ন দল জিতেছে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। কোনো দলই শিরোপা ধরে রাখতে পারেনি। ইংল্যান্ডেরও এটা জানা। মার্কিনী আসরে জস বাটলারের দল মাঠে নেমেছে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নের তকমা মেখেই।
২০১৯ ওয়ানডে বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নের তকমা জড়িয়েই ভারত বিশ্বকাপে পা রাখে ইংলিশরা। কিন্তু জস বাটলারের দল একের পর এক ব্যর্থতা উপহার দেয় সমর্থকদের। ২০২৩ বিশ্বকাপ তারা শেষ করে সপ্তম স্থানে থেকে। এরপর এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে শুরুটা ছিল ভয় জাগানীয়। যখন প্রতিবেশি স্কটল্যান্ড তাদের বিপক্ষে কোনো উইকেট না হারিয়ে স্কোরকার্ডে যোগ করে ৯০ রান। অবশ্য এটা যতটা না নার্ভি ছিল, তার চেয়ে বেশি বিবেচিত ছিল সেরাদের বিপক্ষে স্কটিশদের সেরা লড়াই। ওই ম্যাচ শেষ পর্যন্ত পন্ড হয় বৃষ্টিতে।
এরপর নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে হেরে যায় ইংল্যান্ড। বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের রাঙিনীই শুনতে পাচ্ছিলেন বাটলার, মঈন আলীরা। এমন অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে প্রথমত ইংল্যান্ডের দরকার ছিল একটি জয়। কেবল এক জয়-ই বদলে দিতে পারত অনেক কিছু। এমন অবস্থাতেই ওমানকে উড়িয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প শুরু। পরের ম্যাচে হ্যারি ব্রুক, লিয়াম লিভিংস্টোনদের সামনে পাত্তা পায়নি পুচকে নামিবিয়াও। সুপার এইটে জায়গা পায় ইংল্যান্ড।

পরের রাউন্ডে উঠে ইংল্যান্ড এমনভাবে খেলা শুরু করল যেন তাদের আর হারানোর কিছু নেই। দলটির পুনরুত্থানের পেছনে বোধকরি এটিই প্রধান চালিকাশক্তি। সেখানটায় বড় অবদান রাখতে শুরু করেন ওপেনার ফিল সল্ট। শেষ আটে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে হারলেও যুক্তরাষ্ট্র ও আয়োজক ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারায় ইংল্যান্ড। জয় পাওয়া দুটি ম্যাচের অন্যতম নায়ক সল্ট। আন্দ্রে রাসেল, রোভমান পাওয়েলদের বিপক্ষে খেলেন ৪৭ বলে অপরাজিত ৮৭ রানের ইনিংস। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রকে ১০ উইকেটে উড়িয়ে দেওয়ার ম্যাচেও ছিলেন ২১ বলে ৩৫ রান করে অপরাজিত। থ্রি লায়ন্সদের শিরোপা ধরে রাখার জন্য বড় শক্তি হিসাবে ধরা হচ্ছে এই সল্টকেই। গ্লোবাল ইভেন্টের আগে একটি সংবাদমাধ্যমকে সল্ট বলেছিলেন, ‘এখানে (ওয়েস্ট ইন্ডিজ) আসতে পারা এবং ইংল্যান্ডের হয়ে বিশ্বকাপ খেলতে পারা আমার জন্য বিশেষ কিছু। এমনটা হবে আমি কখনই আশা করিনি। সত্যি এটা আমার জন্য খুবই স্পেশাল।’

আক্রমণাত্মক মনোভাবই সল্টের শক্তি। যে কারণে বিশ্বকাপের আগে তাকে অন্যতম সেরা পাওয়ার প্লে ব্যাটার হিসেবে বিবেচনা করা হতো। পরিসংখ্যানও তার পক্ষে। বিশ্বকাপের আগে তার স্ট্রাইকরেট ছিল ১৬৯ দশমকি ৯। গড়ে প্রতি ৩.৬ বলের মধ্যে একটি বাউন্ডারি হাঁকানোর রেকর্ড তার পক্ষে। বিশ্বের তৃতীয় সেরা ওপেনারদের একজন ছিলেন তিনি। সবশেষ আইপিএলে সল্ট প্রমাণ করেছেন তিনি কেবল পাওয়ার প্লে ব্যাটারই নন, ব্যাটিংটাও দীর্ঘমিয়াদী করতে জানেন। ওই আসরে প্রথম ১-১০ বলের মধ্যে সল্টের স্ট্রাইকরেট ছিল ১৯৭ দশমিক ৯৮। ১০-২০ বলের মধ্যে যেটা নেমে গেছে ১৩৯ দশমিক ৬৮-তে। পরের ২১-৩০ বলে সেটি আবার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯২ দশমিক ৫, এবং ৩০ বলের পর তিনি ব্যাটিং স্ট্রাইকরেটটাকে নিয়ে গেছেন ২০০ এর উপরে।
সেরা ওপেনার হিসেবে ২০২৪ আইপিল মৌসুম শেষ করেন সল্ট। ইংলিশ ব্যাটার ৪৩৫ করেন রান। যেখানে অপরাজিত ৮৯ রানের ইনিংস ছিল লখনৌ সুপার জায়ান্টসের বিপক্ষে। যে ইনিংসে তার স্ট্রাইকরেট ছিল দুশোর কাছাকাছি। এই আগ্রাসন তিনি পুরো টুর্নামেন্টে টেনে নিয়েছেন। তবে ব্যাটিংয়ে তার আগ্রাসনকে নিজের নামের সঙ্গে সিলগালা করতে কোনো আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে ভালো করতে হতো। আর সেটি করতে এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপকেই বেছে নিয়েছেন ডানহাতি এই ওপেনার। ব্যাট করতে নামা প্রথম ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তেমন শুরুর ইঙ্গিত দেন। যদিও মোকাবিলা করা প্রথম বলটি হাঁকিয়ে বাউন্ডারি পাননি।

সল্ট কেবল বাউন্ডারি হাঁকাতেই পারদর্শী নন, স্ট্রাইকরোটেট করেও খেলেন। প্রথম ছয় ওভারে তার ডট বলের সংখ্যাও কমিয়ে এনেছেন ৪১ শতাংশে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচেই যেমনটা দেখা গেছে। ওই ম্যাচে ১৯ বলে ২৯ রান করেন সল্ট। তবে পাওয়ার প্লে-তে করেন ১৭ বলে ২১ রান। অপর পক্ষে থাকা অধিনায়ক বাটলারের জন্য তাতে ব্যাট করা সহজ হয়ে গিয়েছিল। পরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ম্যাচেও প্রথম ছয় ওভারে ২০ বলে ৩৫ রান করেন সল্ট। যেখানে বাটলার করেন ১৬ বলে ২১ রান। পরে অধিনায়কের বিদায়ের পর সল্ট অপরাজিত থাকেন ৪৭ বলে ৮৭ রান করে।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ভিন্নভাবেই নিজেকে চেনান সল্ট। ওই ম্যাচের প্রথম ১৯ বলে ২৯ রান করা সল্ট পরের ১৮ বলে করেন মোটে ২০ রান। যখন আকিল হোসেন আর গুদাকেশ মোতির বোলিংয়ে ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করছিল স্বাগতিক দলটি। সেই সময় উইকেট আগলে রেখে ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে ইনিংস এগিয়ে নেন সল্ট। তার ওই ব্যাটিংয়ে ইংল্যান্ডের আর কোনো উইকেট পতন হতে দেন না সল্ট। ম্যাচ শেষের সংবাদ সম্মেলনে সল্ট জানান কতটা পরিকল্পনা করেন মাঠে তারা দলকে জেতার পথে রেখেছেন। ওই ম্যাচে জনি বেয়ারস্টোকে সঙ্গে নিয়ে দলকে জিতিয়ে মাঠ ছাড়েন সল্ট, ‘আমরা দুজনে অনেক কথা বলছিলাম। আমরা চেয়েছি বাতাসের সুবিধা কাজে লাগাতে। এক প্রান্ত থেকে আট এবং অন্য প্রান্ত থেকে ১২ এভাবেই আমরা দুশোর কাছাকাছি লক্ষ্য তাড়া করতে চেয়েছি। জানতাম আমি ব্যাটিংয়ের গতি কমিয়ে দিয়েছি। তবে অপেক্ষায় ছিলাম পেস বোলারদের জন্য। আমি বাতাসের সঙ্গে ওদের গতি কাজাতে চেয়েছি। আর তাতেই সফলতা পেয়েছি।’

ইংল্যান্ডের হয়ে বিশ্বকাপ খেলা ওপেনারদের ইতোমধ্যেই ছাড়িয়ে গেছেন ২৭ বছর বয়সী সল্ট। এটি অবশ্য স্ট্রাইকরেট বিবেচনায়। শর্টার ফরম্যাটের বিশ্বকাপে অন্তত চার ম্যাচ খেলা ইংলিশ ওপেনারদের মধ্যেও তিনি সেরা। তার স্ট্রাইকরেট ১৬৬ দশমিক ৪। তবে ইংল্যান্ডের জার্সিতে সল্টের যাত্রা কেবল শুরু, অনেকেই এই যুগলে অনেক আগাম সফলতা দেখতে পাচ্ছেন। নিয়তি তাদের জন্য সেরাটা সঞ্চয় করে রেখেছে কিনা সেটিই দেখার অপেক্ষা। নয়তো ২০২২ বিশ্বকাপের অন্যতম সদস্য হতেন সল্ট। ইংলিশদের প্রাথমিক দলেও ছিলেন তারকা এই ব্যাটার। পরে অ্যালেক্স হেলস ফেরায় মূল দলে জায়গা হয়নি। সেই দুঃখ ভুলে তিনি আরেকটি বিশ্বমঞ্চে। দলও ফাইনাল থেকে এক পা দূরত্বে। সল্টও সেরা ছন্দে। তিন বছরে পর সুযোগ পেয়ে ২০২২ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের নায়ক বনে যান হেলস। একটি ব্শ্বিকাপে থাকার আশা সেবার নিমিষেই অন্ধকারে মিলিয়ে গিয়েছিল সল্টের। এবার সেই সল্টই বাটলারদের সহযোদ্ধা। অনেক হিসাব মিলেও যেতে পারে। আবার নাও পারে।
এই গল্পের বাকি অংশটুকু এখন কেবলই ক্রিকেট বিধাতার কোর্টে।