রুবেল রেহান
প্রকাশ : ২১ জুন ২০২৪ ১৪:৪৬ পিএম
খেলাটির প্রতিষ্ঠিত রাজ্যে নতুন এক আবহ এবং নতুন এক ক্রিকেটীয় ভূমি পেয়েছে ক্রিকেট
বাল্টিমোর শহরতলির কুয়াশাচ্ছন্ন শেষ বিকাল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যবাহী ওয়াল্টিমায়ার্সের একটি বড় পরিবার জড়ো হয় ঐতিহ্যগত বার্বিকিউ পার্টিতে। খানিক পরই সেখানকার বাতাসে ভেসে বেড়ায় কাঁকড়া কেকের গন্ধ। পাশের বাড়ির খুঁটিতে উড়ছিল মার্কিনিদের পতাকা। একটি ঐতিহবহুল মার্কিন বিকালই বটে!
পরিবারটির আনন্দঘন আড্ডা আর আলোচনায় ছিল রাজনীতি, বাড়িগুলোর দাম, ওয়াশিংটন ডিসি শহরের জ্যাম এবং তাদের নিত্য জীবনের নানা বিষয়। ছিল ইউএস ওপেন ও গার্ডেন বেসবলের আলোচনাও। এই আলোচনায় হঠাৎই এক বয়স্ক বৃদ্ধ বলে উঠলেনÑ ‘তোমরা শুনেছো, বিশ্বকাপ ক্রিকেটে পাকিস্তানকে হারিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।’ আড্ডায় প্রশ্নটি যেন পাত্তাই পেল না। যদিও মার্কিন অনেক পরিবারের মতো ওয়াল্টিমায়াররাও খেলাধুলায় আচ্ছন্ন। তবে এই ক্রিকেট-বিষয়ক আলোচনা মোটেও পাত্তা পেল না তাদের কাছে। দ্রুতই তারা চলে গেলেন মেজর লিগ বেসবল ও ইউএস ওপেনের আলোচনায়!

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রের সুপার এইটে ওঠা। কিংবা বিশ্বকাপ-পরবর্তী যুক্তরাষ্ট্রের ইংল্যান্ড সফর নিয়ে এই মার্কিনিদের মধ্যে নেই কোনো আগ্রহ, উন্মাদনা। ঠিক এখানেই চ্যালেঞ্জ মার্কিন ক্রিকেটের জন্য।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে সহ-আয়োজক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে সফলই বলা যায়। অন্তত নিরাপত্তা এবং সাংগঠনিক দৃষ্টিকোণ থেকে সেটি স্বীকার করতেই হবে। টুর্নামেন্টের বাকি অংশ অনুষ্ঠিত হবে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে। যুক্তরাষ্ট্রের আয়োজক কমিটির প্রধান নির্বাহী ব্রেট জোনস বিবিসি স্পোর্টকে বলেছেন, ‘আমি মনে করি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সুপার এইটে যাওয়ার চেয়ে ভালো ফলাফল হতে পারত না। আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ ছিল। তবে অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্র ক্রিকেটে উন্নতি করেছে। সামনে হয়তো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ক্রিকেটের প্রচুর ভক্ত-সমর্থক হবে।’
সম্ভবত এবারের আসরের একটি সত্যিকারের দিক হচ্ছে, এই খেলাটির প্রতিষ্ঠিত রাজ্যে নতুন এক আবহ এবং নতুন এক ক্রিকেটীয় ভূমি পেয়েছে ক্রিকেট। কিন্তু এখানে আগে কেন ক্রিকেট প্রতিষ্ঠা পায়নি। এই প্রশ্নটি জাগতেই পারে। জানা যায় সেটির কারণ ছিল উনিশ ও বিশের শতকে এই খেলার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা এক অদ্ভুত আমেরিকান দাম্ভিকতায় মগ্ন ছিলেন। ১৮৪৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে প্রথম আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ আয়োজন করে সেন্ট জর্জ সিটি ক্রিকেট ক্লাব। সেই ক্লাবটিই পরে খেলোয়াড়দের যোগ দিতে বাধা দেয়।
বর্তমান যুক্তরাষ্ট্র ক্রিকেট দলটি ভিন্ন। স্কোয়াডের চারজন খেলোয়াড় কেবল মার্কিন মাটিতে জন্মগ্রহণ করা। বাকিরা আমেরিকান বংশোদ্ভূত নয়। বিভিন্ন দেশ থেকে আশা খেলোয়াড়দের নিয়ে গড়া দল এই যুক্তরাষ্ট্র। যারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পেয়েছেন। ভারতীয় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার সৌরভ নেত্রাভালকার তাদের মধ্যে অন্যতম। আছে নিউজিল্যান্ডের সাবেক অলরাউন্ডার কোরি অ্যান্ডারসনের মতো ক্রিকেটার।

যুক্তরাষ্ট্র ক্রিকেট অনেকটাই অভিবাসীদের দ্বারা গঠিত, এটি স্বয়ং স্বীকৃত। সামনে এটি বাড়তে পারে বলে মত বিশেষজ্ঞদের। কেননা সবচেয়ে বেশি অভিবাসীর দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ক্রিকেট খেলুড়ে এশিয়ার অনেক দেশের লোক এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। বিশেষ করে দক্ষিণ এশীয় প্রবাসীদের ক্রিকেট খেলা, অংশগ্রহণ এবং দেখার আবেগ তা অবিলম্বে এই দেশের ক্রিকেটকে এগিয়ে নেবে। আফ্রিকার অভিবাসীও এখানে কম নয়। এখানকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়লে অচিরেই ক্রিকেট কাঠামো গড়ে উঠবে যুক্তরাষ্ট্রে, এমনই ধারণা ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের।
আবার ক্রিকেটে আমেরিকানদের অনাগ্রহের একটি কারণ হতে পারে এটিই। গেল বছর থেকে চালু হওয়া টি-টোয়েন্টি ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্ট মেজর লিগের অন্যতম বিনিয়োগকারী ছিলেন সোমা সোমাসেগার। তার মতে, ‘যদি এটি এমন একটি খেলা হয়ে যায়, যা শুধুমাত্র প্রবাসীদের জন্য, তাহলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ক্রিকেটের বিকাশ ঘটবে না। খেলাটির প্রসারে আপনার এমন লোকদের প্রয়োজন যারা স্থানীয় মিডিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে আগ্রহ জন্মানোর জন্য আপনার নিজেদের লোক প্রয়োজন। যে খেলোয়াড়রা আগামী দিনের অনুপ্রেরণা হবেন।’
এদিকে আইসিসির এক হিসাব মতে, বিশ্বকাপে খেলা দেখার দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ডিজিটাল ব্যবহারকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। যারা অনলাইনে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে খেলা দেখে থাকেন। সেটির সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ২১ থেকে ৬১ শতাংশ পর্যন্ত। মেজর লিগ বেসবলের নির্বাহী ড্যানিয়েল কির্সনার বলেছেন, ‘ক্রিকেটের জন্য বিশ্ববাজারে সেরা চারটি মিডিয়া বাজারের মধ্যে একটি যুক্তরাষ্ট্র। আশা করি এটি বৃদ্ধি পাবে।’