জয়ের জন্য লক্ষ্যটা নাগালের মধ্যেই রেখেছিলেন বোলাররা। ২০ ওভারের ম্যাচে বলে বলে রান নিলেই হয়। সে ম্যাচই কি না বাংলাদেশের ব্যাটাররা কঠিন করে তুললেন। তবে শেষ দিকে মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ নেমে উড়িয়ে দিলেন সব শঙ্কা। বাংলাদেশ পেল কাঙ্ক্ষিত জয়ের দেখা। নাটকীয় জয়ে ২০২৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ মিশন শুরু করল টাইগার বাহিনী।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গ্রুপ পর্বের এ ম্যাচটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল সাকিব আল হাসানদের জন্য। অনেকেই এ ম্যাচকে বাংলাদেশের ‘ফাইনাল’ বলে অভিহিত করেছেন। এ ম্যাচ জেতা মানে সুপার এইটের সম্ভাবনা প্রবল হওয়া। এমন ম্যাচের আগে অবশ্য স্বস্তিতে ছিলেন না টাইগাররা। মাঠের বাইরে সমালোচনায় বিদ্ধ দলটি সব উত্তর যেন মাঠেই দিল। সেই সঙ্গে বিশ্বকাপ অভিযানে প্রথমেই জয় পেল শান্তর দল।
শনিবার ডালাসে বিশ্বকাপের ১৫তম ম্যাচে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টস জেতেন টাইগার অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। আগে ব্যাটিংয়ে নেমে নির্ধারিত ২০ ওভারে স্কোরকার্ডে ১২৪ রান সংগ্রহ করে শ্রীলঙ্কা। জবাবে ১ ওভার ও ২ উইকেট হাতে রেখে লক্ষ্যে পৌঁছায় টাইগররা। কিন্তু সহজ লক্ষ্যটা সহজে পেরোতে পারেনি বাংলাদেশ। দলীয় ১ রানে প্রথমেই বিদায় নেন সৌম্য সরকার। খানিক বাদে ফেরেন অধিনায়ক শান্ত। তবে আজ সাবলীল ব্যাটিং করেছেন অফ-ফর্মে থাকা লিটন দাস। শুরুতে নড়বড়ে দেখালেও পরে এতটাই সাবলীল ছিলেন যে মনে হচ্ছিল ম্যাচ শেষ করেই আসতে পারবেন উইকেটরক্ষক এই ব্যাটার। ব্যক্তিগত ৩৬ রানে আউট হয়েছেন তিনি। জয় থেকে তখন ২৬ রান দূরে বাংলাদেশ।
তবে বাংলাদেশের জন্য কাজের কাজটা করে দিয়ে গেছেন মিডল অর্ডার ব্যাটার তাওহীদ হৃদয়। ২ উইকেট পতনের পর নেমে শ্রীলঙ্কাকে পেয়ে বসতে দেননি ডান হাতি এই ব্যাটার। এক প্রান্তে লিটনকে ধরে খেলতে দেখে আগ্রাসি ব্যাটিংয়ের প্রদর্শনী দেখালেন হৃদয়। ১১তম ওভারে শ্রীলঙ্কান অধিনায়ক হাসারাঙ্গাকে টানা ৩ ছক্কা হাঁকিয়ে ম্যাচ অতি নাগালের মধ্যে নিয়ে আসেন। ওই পরিস্থিতিতে খুব বেশি খারাপ না খেললে বাংলাদেশের আর পরাজয় সম্ভব ছিল না। ওই ওভারে সেই হাসারাঙ্গার বলেই আউট হয়েছেন হৃদয়, কিন্তু ততক্ষণে বাংলাদেশ পাচ্ছিল জয়ের ঘ্রাণ। ২০ বলে ৪টি ছক্কা ও ১টি বাউন্ডারির সাহায্যে ৪০ রান করেন তরুণ এই ব্যাটার।
হৃদয়ের আউটের পর দ্রুতই ফেরেন সাকিব ও রিশাদ হোসেন। ১৮তম ওভারে জোড়া উইকেট হারিয়ে তখন শঙ্কায় বাংলাদেশ। কাছে গিয়ে হারার উদাহরণ তো এই বাংলাদেশের কম নেই। অলক্ষ্যে সেই দুশ্চিন্তাও জেগেছিল। তবে অভিজ্ঞ মাহমুদুল্লাহ এখন জানেন কীভাবে ম্যাচ ফিনিশিং দিতে হয়। ১৯তম ওভারে দাসুন শানাকার করা প্রথম বলেই ডিপ স্কয়ার লেগের ওপর দিয়ে আছড়ে ফেললেন গ্যালারিতে। ছক্কা।
বাংলাদেশের জয় তখন স্রেফ সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু ওই ছক্কায় আরও একটি সুখস্মৃতি কি মনে করিয়ে দিল না দেশের ক্রিকেটের সমর্থকদের? নিদাহাস ট্রফির সেই উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচে এই শানাকাকেই তো উড়িয়ে মেরেছিলেন মাহমুদুল্লাহ। তারপর দলের বাকিদের দৌড়ে এসে রিয়াদকে জড়িয়ে ধরা, কাঁধে তুলে নেওয়া, সবই হয়েছে। ডালাসে আজও সেই ঘটনারই পুনরাবৃত্তি ঘটাল বাংলাদেশ। ম্যাচ শেষে মাঠে রিয়াদকে জড়িয়ে ধরলেন কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহে। দৃশ্যটা অতি মনোরমই বটে, তাই নয় কি?
দুর্দান্ত জয়ের আগে অবশ্য বাংলাদেশকে ভড়কেই দিয়েছিল শ্রীলঙ্কা। পাওয়ার প্লেতে ব্যাটিংতাণ্ডব চালান লঙ্কান ওপেনার পাথুম নিশাঙ্কা। ওই সময় মনে হচ্ছিল বড় সংগ্রহই পাবে তারা। তবে বাংলাদেশি বোলাররা এদিন ছিলেন অবিশ্বাস্যভাবে সফল। জ্বলে উঠেছেন কাটার মাস্টার মোস্তাফিজুর রহমান। বাঁ হাতি পেসার নিয়েছেন ৩ উইকেট। সমান ৩ উইকেট পেয়েছেন রিশাদ হোসেনও। তবে ৪ ওভারে ২২ রান দেওয়া রিশাদের চেয়েও এদিন বেশি কিপটে ছিলেন মোস্তাফিজ। তার ৪ ওভার থেকে লঙ্কানরা তুলতে পেরেছে মোটে ১৭ রান। নিজের কোঠা পূর্ণ করতে কেবল ২টি বাউন্ডারি হজম করেছেন এই পেসার। আইপিএলের দুর্দান্ত ফর্মটাই আজ টেনে এনেছিলেন শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচে। ১৪টি ডট বল তারই প্রমাণই দেয়।
বাংলাদেশের বোলিং ইনিংসে এক সাকিব আল হাসান ছাড়া সবাই দারুণ করেছেন। তাসকিন আহমেদ ৪ ওভারে ২৫ রান দিয়ে নিয়েছেন ২ উইকেট। বাকি ১টি উইকেট গেছে তানজিম হাসান সাকিবের পকেটে।
শ্রীলঙ্কার পক্ষে সর্বোচ্চ ২৮ বলে ৪৭ রান করেছেন পাথুম নিশাঙ্কা। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৬ বলে ২১ রান আসে ধনঞ্জয়া ডি সিলভার ব্যাট থেকে। এ ছাড়া কুশল মেন্ডিস ১০, চারিথ আশালাঙ্কা ১৯ ও অ্যাঞ্জোলো ম্যাথুস ১৬ রান করেন।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
শ্রীলঙ্কা : ২০ ওভারে ১২৪/৯ (পাথুম নিশাঙ্কা ৪৭, ধনঞ্জয়া ডি সিলভা ২১, চারিথ আসালাঙ্কা ১৯, অ্যাঞ্জেলো ম্যাথিউজ ১৭, কুশল মেন্ডিস ১০; মুস্তাফিজুর রহমান ৩/১৭, রিশাদ হোসেন ৩/২২, তাসকিন আহমেদ ২/২৫)।
বাংলাদেশ : ১৯ ওভারে ১২৫/৮ (তাওহিদ হৃদয় ৪০, লিটন দাস ৩৬, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ১৬; নুয়ান থুসারা ৪/১৮, ওয়ানিন্দু হাসারাঙ্গা ২/৩২, ধনঞ্জয়া ডি সিলভা ১/১১)।
ফল : বাংলাদেশ ২ উইকেটে জয়ী।
ম্যাচসেরা : রিশাহ হোসেন