রুবেল রেহান
প্রকাশ : ০৭ জুন ২০২৪ ২১:০৯ পিএম
আপডেট : ০৭ জুন ২০২৪ ২১:৪২ পিএম
পাকিস্তানের বিপক্ষে ঐতিহাসিক জয়ের নায়ক সৌরভ নেত্রবালগার। ছবি : ক্রিকইনফো
যুক্তরাষ্ট্রের ক্রিকেট জাগরণে দরকার ছিল বিশেষ কিছুর। কিছু ব্যক্তিগত দক্ষতা আর মাঠের বাইরের উন্মাতাল উদযাপন। চলমান বিশ্বকাপে বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্র যখন সাবেক চ্যাম্পিয়ন পাকিস্তানকে সুপার ওভারের রোমাঞ্চে হারাল, তখন যেন সেসব কিছুই বিশ্বকে উপহার দিয়েছে স্বয়ং ক্রিকেট। শতবর্ষ শীতনিদ্রার পর যেন ডালাসের আকাশ দেখা পেয়েছে রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়া।
জন বার্টন কিং। সংক্ষেপে অনেকেই তাকে বার্ট কিং নামে চেনে। জন্ম যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ার ফিলাডেলফিয়ায়। ক্রিকেটে আলাদা করে যার পরিচয় সুইং বোলার হিসেবে। ১৯০৪ ও ১৯০৮ সালে যুক্তরাজ্য সফরে গিয়েছিলেন বার্ট কিং। সেটি ছিল মর্যাদাপ্রাপ্ত প্রথম শ্রেণির একটি সিরিজ। ওই সফরে বার্ট কিংয়ের দল ল্যাঙ্কাশায়ার, কেন্ট ও সারেকে হারায়।

এরপর অস্ট্রেলিয়ান লেগস্পিনার আর্থার ম্যালের ব্যক্তিগত উদ্যোগে ১৯৩২ সালে অস্ট্রেলিয়া একাদশের একটি ক্রিকেটীয় সফর আয়োজন করা হয়। সে বছরই প্রেমিকা জেসি মেনজিসকে বিয়ে করেন স্যার ডন ব্র্যাডম্যান। স্ত্রীকে নিয়ে হানিমুনে যান উত্তর আমেরিকায়। সেখানেই হঠাৎ অস্ট্রেলিয়া একাদশের সঙ্গে যোগ দেন ব্র্যাডম্যান। তার অন্তর্ভুক্তির কারণে যে সফরটি স্মরণীয় হয়ে আছে। ইন্দ্রো বিক্রম সিংয়ের ‘ডনস সেঞ্চুরি’ বই থেকে এমনটাই জানা যায়। অস্ট্রেলিয়া একাদশের সেই সফরের বেশ কয়েকটি ম্যাচে ড্র করে উত্তর আমেরিকান দলটি। তার চেয়েও বেশি স্মরণীয় হয়ে আছে সেই সফরে একবার শূন্য রানে আউট হন ব্র্যাডম্যান।
এরপর টনি গ্রেগের নেতৃত্বে গ্যারি সোবার্স, অ্যালান নট, গ্রেগ চ্যাপেলদের নিয়ে গড়া বিশ্ব একাদশকে অত্যাশ্চর্যজনকভাবে হারিয়ে দিয়েছিল আমেরিকার দলটি। দলের অধিকাংশ খেলোয়াড়ই ছিলেন ক্যারিবিয়ান গ্রেট। সিয়া স্টেডিয়ামে আগত আট হাজার দর্শকের সামনে আমেরিকান দলটির কাছে হেরেছিলেন ক্রিকেটের গ্রেটরা। সেই ম্যাচের কথা বলেছেন ফিলাডেলফিয়ার নিকটবর্তী হ্যাভারফোর্ড কলেজের কিউরেটর জো লিন, ‘দেশের ক্রিকেটের জন্য এই ফলাফলটি ছিল সেরা সাফল্য।’ এরপর পাকিস্তানকে হারানো নিয়ে তিনি বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে এরচেয়ে ভালো শুরু হতে পারত না। কানাডার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ জেতা দারুণ ছিল। কিন্তু পাকিস্তানের মতো সাবেক একটি চ্যাম্পিয়ন দলকে হারানো অন্য জিনিস। অনেকেই বলে থাকেন বেসবলের হাতে দেশের ক্রিকেট মারা গেছে। কিন্তু এটি ভুল। আমি মনে করি, অন্য যেকোনো কিছুর চেয়ে এটি বিশেষ ছিল। শতবর্ষের পুনর্জাগরণ বলতে হবে।’

যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবারের মতো টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলে ২০১৯ সালে। আর এবারই তারা বিশ্বমঞ্চে নাম লেখায়। প্রথমবারের মতো দলটি মুখোমুখি হয় পাকিস্তানের। নিজেদের প্রথম আসর এবং পাকিস্তানকে প্রথম মোকাবিলাতেই হারিয়ে দেয় যুক্তরাষ্ট্র। শর্টার ফরম্যাটের র্যাঙ্কিংয়ে যাদের অবস্থান নেপাল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতেরও পেছনে, ১৮তম।
এই প্রতিযোগিতার সর্বশেষ আসরে ফাইনাল খেলে পাকিস্তান। এ ছাড়া টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দ্বিতীয় আসরেই চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে এশিয়ান জায়ান্টরা। তাদের হারিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অধিনায়ক বলেছেন, ‘এটা টিম আমেরিকার জন্য বিশেষ দিন। শুধু আমেরিকারই নয়, এটি দেশের ক্রিকেট কমিউনিটির জন্যই বিশেষ দিন। আমি মনে করি, বিশ্বক্রিকেটে আমাদের আরও দরজা খুলে যাবে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্রিকেট উন্নয়নে এই জয় সহায়ক হবে।’
টুর্নামেন্ট শুরুর পরই আলোচনায় স্লো পিচ, লো স্কোরিং ম্যাচ। সেই আলোচনা থামিয়ে এখন ‘টপ অব দ্য আর্থ’ যুক্তরাষ্ট্রের রূপকথা। এর আগে উদ্বোধনী ম্যাচে কানাডার বিপক্ষে ১০ ছক্কা হাঁকিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ওপেনার অ্যারন জোন্স। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জয়ের নায়কদের অন্যতম ডালাসের এই তারকা। এ ছাড়া দলটির দলীয় নৈপুণ্যকে আলাদা করার সুযোগ নেই। সাবেক চ্যাম্পিয়নদের হারানো যে মোটেও সহজ কাজ নয়, সেটিই বলেছেন নেদারল্যান্ডসের সাবেক অধিনায়ক রায়ান টেন ডেসকাট, ‘আমার মেরুদণ্ডে শিরশির করছে। একটা সহযোগী দেশ হয়ে সাবেক চ্যাম্পিয়নদের হারানো যে কতটা কঠিন, সেটি আমি কেবল অনুধাবন করতে পারি। তবে সেই কঠিন কাজটিই তারা করে দেখিয়েছে।’