মনিজা রহমান, নিউইয়র্ক থেকে
প্রকাশ : ০৩ জুন ২০২৪ ২১:৩৭ পিএম
ব্রায়ান চার্লস লারা। সংগৃহীত ছবি
আবদুল ওয়াদুদের আমেরিকান নাম হলো ব্রায়ান। আমেরিকায় বহু অভিবাসী আছেন, যারা ডাকার সুবিধার্থে একটা নতুন নাম নেন! ব্রায়ান আবদুল ওয়াদুদ তাদেরই মতো। আর ব্রায়ান চার্লস লারাকে নতুন করে কি পরিচয় করিয়ে দেব বলুন! তিনি হলেন রেকর্ডের বরপুত্র। টেস্ট আর প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড একসময় ছিল তার দখলে। হঠাৎ করে দুজনকে মেলালাম কীভাবে, সেই ঘটনা বলি!
বেশিরভাগ মানুষ জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা কী, বলতে পারে না। আমি কিন্তু বলতে পারব! ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটার ব্রায়ান চার্লস লারার সাক্ষাৎকার নিতে পারা ছিল আমার এই জীবনে সবচেয়ে মনে রাখার মতো ঘটনা। লারা তখন ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট দলের অধিনায়ক, টেস্ট ও প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সর্বোচ্চ রানের বিশ্বরেকর্ডধারী। সেই রেকর্ডের বরপুত্র কি না সাক্ষাৎকার দিয়ে দিলেন আমার মতো একজন অর্বাচীনকে! এভাবে বলার কারণ আমি তখন বয়সে একদম নবীন, পেশায় সবে এসেছি!
সাক্ষাৎকার নেওয়ার এমন বিবশ করা অনুভূতি হয়েছিল যে সারারাত আমার ঘুম হয়নি।

ওয়াহিদ ভাই ছিলেন তীক্ষ্ন স্মৃতিশক্তির মানুষ, পঞ্চাশ বছর আগের ঘটনা এমন নিখুঁতভাবে বর্ণনা করতেন, যেন আজকের সকালে ঘটেছে। তখন কণ্ঠশীলনের বসায় নানা বিষয় লিখে নিয়ে আনতাম সবাই। আমরা হয়তো আগের দিন রাতে পড়েছি, তবু অনেক নাম ভুলে যেতাম, ওয়াহিদ ভাই হয়তো বহুকাল আগে পড়েছেন, তবু নির্ভুলভাবে সবার নাম বলে দিতেন। উনি ভিভ রিচার্ডস আর ম্যালকম মার্শালের জাদুকরী ক্রিকেট নৈপুণ্যের কথা বলতেন। পুরোনো ক্রিকেট ভক্তদের মতো ওয়াহিদ ভাই ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান ক্রিকেট দলকে পছন্দ করতেন। ক্যারিবিয়ান দ্বীপরাষ্ট্রের স্বর্ণালি যুগের সর্বশেষ উত্তরসূরি ব্রায়ান চার্লস লারার সাক্ষাৎকার আমি নিয়েছি শুনে অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলেন।
ব্রায়ান আবদুল ওয়াদুদের বাবা হিউজ ছিলেন ক্রিকেটের দারুণ ভক্ত। ত্রিনিদাদে নিজের শহরতলিতে ব্যাট-বলের খেলাটির সঙ্গে দারুণ সখ্য ছিল তার। তারপর একসময় পাড়ি জমান আমেরিকায়। এখানে আসার পরে ছেলের বাবা হন তিনি। প্রিয় ক্রিকেটার ব্রায়ান চার্লস লারার নামে ছেলের নাম রাখেন ব্রায়ান। আবদুল ওয়াদুদ হলো ছেলের ইসলামিক নাম, কারণ ত্রিনিদিয়ান মুসলিম ওরা। ব্রায়ান চার্লস লারার সাক্ষাৎকার নিয়েছি শুনে ব্রায়ান আবদুল ওয়াদুদ সব খুলে বললেন। ওর সঙ্গে আমার পরিচয় কীভাবে হলো সেটা আগে বলি।
ছোট ছেলে সৃজন স্পেশাল নিডস হওয়ায় নিউইয়র্ক শহরে যাতায়াতের জন্য ও গাড়ি পায়। সৃজনকে নিয়ে গিয়েছিলাম উডহ্যাভেনে একটা কাজে, আসার সময়ে আমাদের গাড়ির ড্রাইভার ছিল এই ত্রিনিদিয়ান। কথায় কথায় আমি জানিয়েছিলাম, ক্রিকেট বরপুত্র লারার সাক্ষাৎকার নেওয়ার ঘটনা। তখন জানলাম, ওর বাবা লারার এতো ভক্ত ছিল যে ছেলের নাম রেখেছিল প্রিয় ক্রিকেটারের নামে। অথচ কি জানেন, ব্রায়ান নিজে ক্রিকেটের তেমন ভক্ত নন। ওর জন্মভূমি আমেরিকা আর বাপ-দাদার দেশ ওয়েস্ট ইন্ডিজে যে বিশ্বকাপ ক্রিকেট আয়োজন করছে যৌথভাবে এই নিয়ে ওর কোনো মাথা ব্যথা নেই!
ব্রায়ান আবদুল ওয়াদুদের প্রিয় খেলা বাস্কেটবল। বেশিরভাগ এই দেশে জন্ম নেওয়া কিংবা ছোটবেলা থেকে বড় হওয়া আমেরিকানের প্রিয় খেলা তিনটির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেÑ ফুটবল, বেসবল আর বাস্কেটবল। আর এই ফুটবল আবার আমাদের মতো নয়। রাগবীর মতো একটা খেলাকে ওরা ফুটবল, যার জনপ্রিয়তা তুঙ্গস্পর্শী। আমরা যেটাকে ফুটবল বলি, ওরা সেটাকে ডাকে সকার, সেই খেলার জনপ্রিয়তা ওভাবে নেই। অথচ সকার হলো পৃথিবীর সব খেলা মিলে জনপ্রিয়তার সমান। সারা পৃথিবী যেভাবে চলে, আমেরিকা আর কানাডা চলে তার উল্টোদিকে। সকার আর ক্রিকেট এখানে যেন অনেকটাই ব্রাত্য। বিশেষভাবে ক্রিকেট খেলা সম্পর্কে এই দেশে সাধারণ মানুষের জ্ঞান প্রায় শূন্যের কোঠায়। একটা যে বিশ্বকাপ হচ্ছে এই নিয়ে তাদের মধ্যে কোনো হেলদোল নেই।
আমেরিকায় আগত ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের অভিবাসীরা মূলত এই মুলুকে ক্রিকেটকে বাঁচিয়ে রেখেছে। বছর কয়েক আগে নিউইয়র্ক সিটির সিটি ফিল্ডে ভারত আর পাকিস্তান একটি ক্রিকেট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেবার সবাই উচ্চমূল্যে টিকিট কিনে খেলা দেখেছিল। ম্যাচের সব টিকিট বিক্রি হয়ে গিয়েছিল। ওই ঘটনার পরে আমেরিকার ক্রিকেট সংগঠকরা সিদ্ধান্ত নেয় বিশ্বকাপের স্বাগতিক হওয়ার। তারই সূত্রে এবারের বিশ্বকাপ ক্রিকেট।
এই দেশের বেসবলের সঙ্গে অবশ্য ক্রিকেটের অনেক সাদৃশ্য। সিটি ফিল্ডের যে মাঠে ক্রিকেট ম্যাচ হয়েছিল, সেটি হলো বেসবল মাঠ। আমার বড় ছেলের স্কুলের থেকে সেখানে দুবার গিয়েছিলাম প্যারেন্ট ভলান্টিয়ার হিসেবে। বেসবল আমার জন্য নতুন হলেও বুঝতে খুব বেশি সমস্যা হয়নি।
যাদের জন্ম বাংলাদেশে ও বড় হয়েছেন সেখানে, তাদের বেশিরভাগ এই দেশে ক্রিকেট চর্চা বজায় রেখেছেন। ছুটির দিনে বড় বড় পার্কে গিয়ে ক্রিকেট খেলেন তারা। তাদেরই একজন অমিত স্ত্রীসহ থাকেন লস অ্যাঞ্জেলসে। বাবা-মা আর ছোট ভাই থাকেন নিউইয়র্ক সিটিতে। বিশ্বকাপ উপলক্ষে এখানে আসছেন খেলা দেখতে। নিউইয়র্ক সিটির পাশে লং আইল্যান্ডের বিভিন্ন ভেন্যুতে বিশ্বকাপ ক্রিকেটের খেলা হচ্ছে এবার। অমিতের মা শেলী জামান খান জানালেন, প্রতিটি টিকিটের দাম দুশ ডলার। ছয় সদস্যের পরিবারের সবাই মিলে খরচ পড়বে বারোশ ডলার। এর বাইরে লস অ্যাঞ্জেলস থেকে নিউইয়র্কে আসার প্লেনের টিকিটের খরচ তো আছেই।
নিউইয়র্কের বাঙালি কমিউনিটির অনেকেই যাবেন খেলা দেখতে। বাংলাদেশ থেকে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন ক্রীড়া সাংবাদিক এসেছেন, যাদের অনেকেই বাংলাদেশে থাকার সময়ে আমার সঙ্গে কাজ করেছেন।
শুরু করেছিলাম ব্রায়ান নিয়ে, আবার তার কাছেই ফিরে যাই। ব্রায়ান চার্লস লারার ভক্ত বাবা ছেলের নাম রেখেছিলেন ব্রায়ান। বাবা আজ আর নেই, নেই ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট দলের জৌলুসও, তবু ব্রায়ান সেই নাম নিয়ে চলছে নিউইয়র্কের পথে পথে।