শাখাওয়াত হোসাইন
প্রকাশ : ৩১ অক্টোবর ২০২২ ১১:৩২ এএম
আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০২২ ১৭:৫০ পিএম
শনিবার চাঁদপুরে ইলিশের সঙ্গে ধরা পড়া পাঙাশ মাছ। ছবি : সংগৃহীত
রুপালি রঙের সেই মাছ। তবে পিঠের দিকে খানিকটা কালচে, পার্শ্বরেখার ওপর একটু ধূসর। দেহে কোনো আঁশ নেই। কাঁটাও নেই বললেই চলে। বড় সুস্বাদু এই দেশি পাঙাশ। দেশজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয় এই মাছটি দক্ষিণবঙ্গের মানুষের কাছে পরিচিত ‘অভিজাত’ মাছ হিসেবে। আর ‘অভিজাত’ বলেই হয়তো এই দেশি পাঙাশ পরিবেশগত বিপর্যয়ের মুখে পড়ে ২০১০ সাল থেকে বলতে গেলে উধাও হয়ে যায় নদী, বিল ও হাওর থেকে। কিন্তু এ বছর দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন নদীতে ইলিশ ধরতে গিয়ে জেলেদের জালে উঠে আসছে কিনা লুপ্তপ্রায় সেই পাঙাশ! এ ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছেন জেলেরা।
দীর্ঘ ২২ দিন পর গত শনিবার শেষ হয়েছে মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা। বিরতির পর ইলিশ শিকারে বের হয়েই চমকে উঠতে হয়েছে দক্ষিণাঞ্চলের জেলেদের। তাদের জালে যত না ইলিশ, তারও বেশি ধরা পড়ছে দেশি পাঙাশ। এ ঘটনা ঘটছে মূলত চাঁদপুর, পটুয়াখালী এবং ভোলা—এ তিন জেলায়। তা ছাড়া বরিশাল, শরীয়তপুর এবং মাদারীপুর থেকেও একই খবর পাওয়া যাচ্ছে। জালে ধরা পড়া এসব দেশি পাঙ্গাসের গড় ওজন ৬-৭ কেজি। তবে ১৫-২০ কেজি ওজনের পাঙাশও ধরা পড়ছে কোনো কোনো জালে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কয়েক বছর ধরে পাঙাশ পোনা নিধন বন্ধের জোর তৎপরতার সুফল। প্রসঙ্গত, পাঙাশ ও ইলিশের বংশবিস্তারের সময় প্রায় একই। তাই পোনা নিধনের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারলে ভবিষ্যতে আরও বেশি দেশি পাঙাশ পাওয়া যাবে বলেও মনে করেন তারা।
চাঁদপুর সদরের পুরান বাজারের মৎস্যজীবী নেতা তসলিম উদ্দিন জানান, গত দুবছর ধরে নদীতে দেখা মিলছে পাঙাশের। তবে এ বছর ধরা পড়ছে অভাবনীয় হারে। চাঁদপুরের মোহনা ও সুরেশ্বর পয়েন্টে এ মাছ ধরার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘মাঝারি এবং বড় আকারের পাঙাশই বেশি ধরা পড়ছে।’
চাঁদপুরের মৎস্য কর্মকর্তা গোলাম মেহেদী হাসান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘চাঁদপুর সদরে মেঘনায় পাঙাশ মাছ বেশি ধরা পড়ছে। পাঙাশের ব্রিডিং সিজন শুরু হয় এপ্রিলে। এ সময় মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা থাকায় সুফল মিলছে।’
কাঁটা কম থাকায় পাঙাশ মাছ শিশুদের কাছেও খুব প্রিয়। একসময় পদ্মা, মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীতে দেশি জাতের পাঙাশ মিলত অহরহ। মার্চ থেকে জুন মাস পর্যন্ত দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন নদীসহ প্রধান নদীগুলোতে এর পোনা পাওয়া যায়। তবে চাঁই দিয়ে পাঙাশের পোনা নিধন এবং নদীর বাস্তুতন্ত্রে পরিবর্তনের কারণে মাছটি হারিয়ে যেতে থাকে। দেশি জাত দুর্লভ হয়ে ওঠার সুযোগে পুকুরে চাষের উপযোগী থাই জাতের পাঙাশ দেশের বাজার দখল করে ফেলে। এই থাই পাঙাশই বর্তমানে দেশে মাছের চাহিদা পূরণে বড় ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘ইলিশ আর পাঙাশের ডিম ছাড়ার মৌসুম প্রায় একই সময়ে। সরকার ইলিশের জাটকা রক্ষায় নদীতে মাছ শিকারে যে নিষেধাজ্ঞা দেয়, তাতে পাঙাশ মাছের বংশবিস্তারও সহজতর হয়। দেশি পাঙাশের বুক চওড়া হয় এবং ওজনে তা ৬০ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে।’
চাঁদপুর, ভোলা, পটুয়াখালীসহ দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে চাঁই দিয়ে পাঙাশ মাছের পোনা শিকার করা হতো একসময়। মৎস্য আইন অনুসারে ১২ ইঞ্চির নিচে পাঙাশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তা তেমন মানা হতো না। ২০১৮ সালের পর বেশ কয়েকটি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তৎপরতায় স্থানীয় পর্যায়ে এ ব্যাপারে সচেতনতা বাড়তে থাকে। পাশাপাশি কারেন্ট জাল এবং চাঁই জব্দ করে জরিমানা আদায়েও তৎপর হয়ে উঠেছে সরকারের মৎস্য বিভাগ। পোনা রক্ষার কর্মসূচির সুফল হিসেবে বর্তমানে বড় আকারের পাঙাশ নদীতে পাওয়া যাচ্ছে বলে মনে করেন মৎস্য কর্মকর্তারা।
ভোলার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোল্লা এমদাদুল্ল্যাহ বলেন, ‘চাঁদপুর, পটুয়াখালী, ভোলা এবং বরিশালে পাঙাশ বেশি ধরা পড়ছে। অথচ মাত্র তিন-চার বছর আগেও মাছটি বলতে গেলে হারিয়ে গিয়েছিল। দক্ষিণাঞ্চলের সব কয়টি জেলাতে একসময় বিশেষ ধরনের চাঁইয়ে পাঙাশের পোনা শিকার করা হতো। কিন্তু এ শিকার বন্ধে অভিযানের পর অভিযান চালানো হয়েছে। এখনও ভোলার মনপুরায় চাঁই রয়ে গেছে। ওই দ্বীপটিতে অভিযান আরও বাড়ানো হবে।’