বিজয়ের মাস
যতীন সরকার
প্রকাশ : ০১ ডিসেম্বর ২০২৩ ০৯:১৮ এএম
যতীন সরকার। ছবি: সংগৃহীত
একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধপর্ব আমাদের জাতীয় ইতিহাসে বাঁক পরিবর্তনের স্বর্ণময় অধ্যায়। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের শুধু একটি স্বতন্ত্র আভাসভূমি ও পতাকাই দেয়নি, এর মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশ আজ নতুন উচ্চতায় পৌঁছে গেছে বিশ্বে। মুক্তিযুদ্ধের যে প্রত্যয় ও অঙ্গীকার ছিল এর পূর্ণতা এখনও সর্বাংশে পায়নি বটে কিন্তু রক্তস্নাত বাংলাদেশকে ঘিরে প্রত্যাশা এখনও গগনমুখী। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ, বৈষম্যহীন বাংলাদেশ, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ- এ সবই প্রত্যাশার দিগন্তজুড়ে।
বিজয়ের মাস নিয়ে লিখতে গেলে কলমের ডগায় অসংখ্য স্মৃতি এসে জড়ো হতে শুরু করে। স্মৃতিপটে ভাসতে থাকে একের পর এক ঘটনা। অভিজ্ঞতার ঝুলি তো আর কম ভারী নয়। নিজ চোখে ব্রিটিশ শাসনামল দেখেছি। দেখেছি পাকিস্তান শাসনামলের অপশাসন। পাকিস্তানের জন্ম যেমন দেখেছি, তেমনি দেখেছি তার মৃত্যুও। দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে প্রবল বিক্রমে ছিনিয়ে আনা স্বাধীনতার গতিবিধি দেখেছি। স্বাধীন দেশে বুক পেতে নিঃশ্বাস নিয়েছি। যাত্রা শুরু তো আরও আগে থেকেই।
স্বাধীনতার পর জাতি হিসেবে আমরা ক্রমোন্নতির দিকেই এগিয়ে গিয়েছি। স্বাধীনতা আমাদের অনেক কিছু দিয়েছে। কিন্তু তাই বলে তৃপ্ত হয়ে বসে থাকার সুযোগ তো নেই। স্বাধীনতার পর দীর্ঘদিনে কী পেলাম আর কী পেলাম না, তার হিসাব করা জরুরি। স্বাধীনতা নিজেই একটি বড় প্রাপ্তি। এই প্রাপ্তি ঘটেছে একাত্তরের ডিসেম্বরে। বাঙালির কাছে এ মাসের তাই রয়েছে আলাদা তাৎপর্য। বিজয়ের মাসে প্রাপ্তির হিসাব যেমন আমাদের করা জরুরি, তেমনি প্রয়োজন অপ্রাপ্তি আর ঘাটতির হিসাব করাও। স্বাধীনতার পর আমাদের অবকাঠামোগত ও অর্থনৈতিক নানা উন্নয়ন ঘটেছে। তবে উন্নয়নের সড়কটা বড্ড একরৈখিকভাবে এগিয়েছে। নদীর মতো এঁকেবেঁকে সর্পিল গতিতে প্রাণসঞ্চার করতে পারেনি পুরোপুরি। মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছেÑ এ কথা সত্য বটে। কিন্তু এ-ও সত্য, বৈষম্যের পারদ হচ্ছে ঊর্ধ্বমুখী। মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার অসহনীয় চাপে পিষ্ট হচ্ছে মানুষ। বৈষম্যের চিত্র দেখে স্বস্তিতে থাকা সচেতন যে কারও পক্ষেই কঠিন বটে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় প্রত্যেকের সমানাধিকারের স্বপ্ন দেখেছি আমরা। স্বাধীন দেশে দাঁড়িয়ে ভেবেছি, এবার তবে গরিবও দুমুঠো ভাত খেয়ে টিকে থাকতে পারবে। তা হয়েছে বটে কিন্তু সাম্যের মাঠ তো এখনও অসমতলই রয়ে গেছে।
আমাদের সংবিধানে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাÑ এই চারটি রাষ্ট্রীয় মূলনীতিকে রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। যদি আমরা বৈষম্য নিরসন করতে চাই তাহলে এই চারটি মূলমন্ত্রের ভিত্তিতে রাষ্ট্রকে পরিচালিত করতে হবে। রাষ্ট্রধর্ম প্রতিষ্ঠা করা হলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা উপেক্ষা করে। এমনটি সংবিধানের মূলমন্ত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সংবিধানের মূলমন্ত্রের বিষয়ে আমাদের এই দ্বিধাগ্রস্ত মন নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। আদর্শিক গোঁজামিল যেন সবখানে। এর নিরসন জরুরি।
স্বাধীন দেশে তরুণ প্রজন্ম নেতৃত্বের দায়িত্ব নেবে এমনটিই প্রত্যাশা। আর এই প্রত্যাশা পূরণের জন্যই দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেছি। অনেক শিক্ষার্থীকে শিখিয়েছি দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হতে। দেশ, জাতি, আদর্শ ও বিজয়ের মূল্যবোধ তাদের মধ্যে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করেছি সব সময়। সাক্ষরতার হার বেড়েছে। বেড়েছে শিক্ষিত তরুণ-তরুণী। কিন্তু বিজয়ের মূল্যবোধ দ্বারা চালিত তরুণ প্রজন্মের অভাব ভীষণভাবে বোধ করি। আজও প্রচণ্ড আগ্রহ নিয়ে তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করি। দেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য যেমন শিক্ষার্থী ও শিক্ষিত তরুণ প্রয়োজন ছিল, তেমন কাউকে দেখি না, এটা কষ্টের বিষয় বৈকি। প্রজন্ম বৈষম্যের সাগরে হাবুডুবু খেয়ে চলেছে। অপূর্ণতার স্বপ্ন তাদের চোখ রাঙায় না। তবুও স্বপ্ন দেখি। বিজয়ের সব ঘাটতি একদিন পূরণ হবে। অর্জিত হবে কাঙ্ক্ষিত সেই লক্ষ্য, যা আমাদের একত্রিত করেছিল একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের মঞ্চে।
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, লেখক