× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

শিক্ষা আইন

আলোচনা পর্যালোচনা আর কাটাছেঁড়াতেই ১৩ বছর

সেলিম আহমেদ

প্রকাশ : ০৮ অক্টোবর ২০২৩ ১৩:৪১ পিএম

আলোচনা পর্যালোচনা আর কাটাছেঁড়াতেই ১৩ বছর

প্রস্তাবিত শিক্ষা আইন নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা আর কাটাছেঁড়া গত ১৩ বছরেও শেষ হয়নি। তাই নীতিগত অনুমোদনের জন্য আইনের খসড়া মন্ত্রিপরিষদে ওঠানোর পরও নানা অসংগতি থাকায় তা ফেরত পাঠানো হচ্ছে। সর্বশেষ গত সেপ্টেম্বরে তৃতীয়বারের মতো খসড়াটি তোলা হয় মন্ত্রিসভায়। সেবারও ‘নানা অসংগতি’ থাকার কারণ দেখিয়ে ফাইলটি ফেরত পাঠিয়ে ‘অধিকতর পরীক্ষানিরীক্ষা’ করতে বলা হয়। এভাবে মোট তিনবার আইনের খসড়া ফেরত এসেছে মন্ত্রিপরিষদ থেকে, কেটে গেছে দীর্ঘ তেরো বছর। কিন্তু প্রণীত ও কার্যকর হয়নি কাঙ্ক্ষিত আইন। বিষয়টিকে সরকারের একটি ‘বড় ব্যর্থতা’ হিসেবে দেখছেন শিক্ষাবিদরা।

শিক্ষাবিদরা বলছেন, আমলারা এ আইন প্রণয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছেন না। কোচিং, নোট-গাইড ব্যবসায়ী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগ বাণিজ্য ও ভর্তি বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িতদের অদৃশ্য চাপেও আইন প্রণয়ন বারবার গতি হারাচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, ‘২০১০ সালে প্রণীত শিক্ষানীতির আলোকে এ শিক্ষা আইনের খসড়া তৈরি করা হয়। কিন্তু শিক্ষানীতির সৃজনশীল ধারা থেকে চলতি বছর নীতিনির্ধারকরা সরে এসেছেন এবং এতে নতুন কারিকুলাম যুক্ত হয়েছে। তাই শিক্ষা আইনকে যুগোপযোগী করে তুলতে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো যুক্ত করা হচ্ছে। 

২০১০ সালে প্রণীত জাতীয় শিক্ষানীতিতে দেশের শিক্ষা কার্যক্রমে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনাসহ নানা উদ্দেশ্যে সমন্বিত শিক্ষা আইন প্রণয়নের কথা বলা হয়েছিল। জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়নের পর ২০১১ সালের জানুয়ারিতে শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে ২৪টি উপকমিটি গঠন করেছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। যার একটির উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষা আইনের খসড়া প্রণয়ন। এরপর আইনের খসড়া তৈরি করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পর পর দুই বার পাঠানো হয়। কিন্তু এতে ‘ছায়া শিক্ষার’ নামে কোচিং, প্রাইভেট টিউশনের বৈধতা এবং নোট-গাইডের নামে অনুশীলন বা সহায়ক বইয়ের উল্লেখ থাকায় এবং নানা ‘অসংগতি’ ও ‘দুর্বলতা’ লক্ষ করে মন্ত্রিপরিষদ তা ফেরত পাঠায়। 

সর্বশেষ শিক্ষা আইনের খসড়ায় যা আছে 

সর্বশেষ শিক্ষা আইনের খসড়ায় চার স্তরের শিক্ষাব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক, দশম শ্রেণি পর্যন্ত মাধ্যমিক এবং একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত উচ্চ মাধ্যমিক স্তর। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু হবে উচ্চশিক্ষা স্তর। তবে শিক্ষা আইনের এই প্রস্তাবের সঙ্গে শিক্ষানীতির অমিল রয়েছে। অবশ্য শিক্ষা আইনে প্রাক-প্রাথমিক স্তরের কথা বলা হয়েছে, যেখানে সংখ্যালঘু জাতিসত্তাগুলোর জন্য সরকার পর্যায়ক্রমে মাতৃভাষায় শিক্ষার ব্যবস্থা করবে। আইনে উচ্চ শিক্ষা স্তরের প্রতিষ্ঠান বা বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে শুধু সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কথাই বলা হয়েছে, স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়েরও কোনো স্পষ্ট উল্লেখ নেই। 

এ আইনে দেশের সকল শিশুর জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক এবং শিশুর মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে। এ ছাড়াও এতে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষাদানের উপযুক্ত ব্যবস্থা, কারও প্রতি কোনো বৈষম্য না করা, অনগ্রসর এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং নিরাপদ ও শিশুবান্ধব শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। 

মাধ্যমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে এ আইনে বলা হয়, মাধ্যমিক শিক্ষার ধারা হবে তিনটিÑ সাধারণ শিক্ষা, মাদ্রাসা এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা। আইনে ইংরেজি মাধ্যমের বা বিদেশি পাঠ্যক্রমের শিক্ষা সম্পর্কে বলা হয়, সাধারণ ধারার সমপর্যায়ের বাংলা, বাংলাদেশের অভ্যুদয়, বাংলাদেশ স্টাডিজ এবং সরকার কর্তৃক নির্ধারিত বিষয়গুলো সেখানে বাধ্যতামূলকভাবে পড়াতে হবে। এর ব্যত্যয় ঘটলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন বাতিল করা হবে।

বিদেশি পাঠক্রমে পরিচালিত স্কুল, কিন্ডারগার্টেন ও মাদ্রাসা অথবা বিদেশি কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে শাখা স্থাপন বা পরিচালনার জন্য নিবন্ধন করতে হবে। বাংলা মাধ্যম ও ইংরেজি ভার্সনের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের বেতন, টিউশন ও অন্য ফি অযৌক্তিকভাবে উচ্চহারে আদায় করা হয়েছেÑ এমন প্রতীয়মান হলে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবে। এতে কওমি মাদ্রাসাগুলোকে সরকারের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার কথাও বলা হয়েছে। 

আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আইন হচ্ছে না

শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির সদস্য সচিব ও জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমির (নায়েম) সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক শেখ ইকরামুল কবির প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘শিক্ষা আইনের খসড়া বারবার করা হচ্ছে। আবার সংশোধনও করা হচ্ছে। এভাবেই তেরো বছর চলে গেছে। এই আইন আর হবে বলে মনে হয় না। কারণ আমলারা এ বিষয়ে আগ্রহী নন।’ 

তিনি বলেন, ‘শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটিতে শিক্ষাবিদরাই বেশি ছিলেন। তারা যা প্রস্তাব করেছেন, আমলারা সেটা করতে চাইছেন না। শিক্ষা আইন করলে তাদের দৌরাত্ম্যও অনেক কমে আসবে। এজন্য তারা আইন নিয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছেন ।’ 

তিনি আফসোস করে বলেন, ‘শিক্ষাব্যবস্থাকে কার্যকর করতে শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির প্রথম প্রস্তাব ছিল শিক্ষা আইন। আর ৫ম প্রস্তাব ছিল মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা। এই প্রথম প্রস্তাব বাস্তবায়ন না করেই পঞ্চম প্রস্তাবটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। কারণ সেখানে আমলাদের স্বার্থ জড়িত আছে।’ আমলাতন্ত্রের বাইরে আলাদা কমিটির মাধ্যমে এ আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিলে, এটি হয়তো আলোর মুখ দেখবে বলে মনে করেন তিনি। 

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সাবেক চেয়ারম্যান ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক আব্দুল মান্নান বলেন, ‘আমাদের দেশে শিক্ষা নিয়ে যারা কাজ করছেন, তারা মূলত আমলা। কিন্তু শিক্ষা আইনের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি আইন তারা বোধ করি করতে চাইছেন না। শিক্ষাকে শিক্ষকদের হাতে ছেড়ে না দিলে শিক্ষার কোনো উন্নতি হবে না। ’ 

সংশ্লিষ্টরা যা বলছেন

এ প্রসঙ্গে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের যুগ্ম সচিব (নিরীক্ষা ও আইন) মূকেশ চন্দ্র বিশ্বাস প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, শিক্ষা আইনের খসড়াটি মন্ত্রিপরিষদ থেকে কিছু অবজারভেশন (পর্যবেক্ষণ) দিয়ে ফেরত পাঠানো হয়েছে। যেহেতু শিক্ষানীতির ওপর ভিত্তি করে আইন প্রণয়ন করা হবে, তাই শিক্ষানীতিকে আপডেট করতে বলা হয়েছে। আপডেটের কাজ চলছে। 

শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির আরেক সদস্য অধ্যাপক কাজী ফারুক আহমেদ বলেন, ‘শিক্ষা আইন না হওয়ার জন্য শুধু প্রশাসনকে দোষ দিলেই হবে না। আমি মনে করি, এখানে দুই মন্ত্রণালয়ের দূরত্ব ও রাজনৈতিক কমিটমেন্ট না থাকার কারণে আইনটি হয়নি। শিক্ষার স্বার্থেই আইনটি করা দরকার। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচিত প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বসে এই আইন না হওয়ার পেছনের বাধাগুলো চিহ্নিত করা। একই সঙ্গে একটি বিশেষ কমিটি করে নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়ে আইনটির কাজ শেষ করা। 

আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে শিক্ষা আইন প্রণয়ন বারবার পিছিয়ে যাচ্ছে কি না, জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বিষয়টি সঠিক নয়। আমরা আইনটি তৈরির বিষয়ে আগ্রহী। ইতোমধ্যে একাধিকবার খসড়া তৈরি করে মন্ত্রিপরিষদে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে আবারও কিছু সংশোধন করতে বলা হয়েছিল। সেগুলো সংশোধন করে পাঠানোর পর আবারও কিছু সংশোধনী দেওয়া হয়েছে। যেগুলোর কাজ চলছে। শিগগির তা শেষ করে মন্ত্রিপরিষদে পাঠানো হবে।

এ প্রসঙ্গে শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী বলেন, ‘আইন প্রস্তুত আছে। কেবিনেটের অনুমতি সাপেক্ষে তা উত্থাপন করা হবে।’

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা