সাম্প্রদায়িক হামলা
প্রকাশ : ২০ জুলাই ২০২২ ১৩:২৭ পিএম
আপডেট : ২০ জুলাই ২০২২ ১৩:৫৭ পিএম
নড়াইলে সাম্প্রদায়িক হামলা
ফেইসবুকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে নড়াইলের লোহাগড়ায় বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলা-অগ্নিসংযোগের পর আতঙ্ক ও ভয়ে বাড়ি ছেড়ে যাওয়া সাহাপাড়ার হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষজন নিজেদের ভিটায় ফিরতে শুরু করেছে।
১৫ জুলাই রাতে হামলার মুখে নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় নিয়ে সাহাপাড়ায় শতাধিক বাসিন্দা তাদের পরিবারের সদস্যদের অন্যত্র পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও জনপ্রতিনিধিদের আশ্বাসে বাড়িঘরে ফিরে আসা এসব মানুষের প্রত্যাশা, পরিস্থিতি আবার স্বাভাবিক হবে।
মঙ্গলবার দিঘলিয়া বাজারে গিয়ে দেখা গেছে, রাস্তায় র্যাব-পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা টহল দিচ্ছেন। গত কয়েকদিনের তুলনায় রাস্তাঘাটে লোকজনের আনাগোনায় বেড়েছে। সাহাপাড়ায় যেসব বাড়িঘর হামলা ও অগ্নিসংযোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেসব মেরামতের কাজও শুরু হয়েছে। মন্দিরেও পুরোহিতদের তত্ত্বাবধানে সংস্কার কাজ চলছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যরা জানান, প্রতিদিনই পরিস্থিতি দেখতে রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন পর্যায়ের লোকজন আসছেন। তারা সাহস দিচ্ছেন। এতে করে মানুষের মনোবল বাড়ছে। মঙ্গলবারও এলাকা পরিদর্শন করেছে আওয়ামী লীগ ও বাম জোটের নেতারা। তারা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন।
সাহাপাড়ার বাসিন্দা তরুণ সাহা বলেন, ‘হামলার ঘটনার পর থেকে সবাই খোঁজ-খবর নেচ্ছে, তাতে সাহস লাগতিছে। সেদিনও যদি সবাই এভাবে একটু আগোয়ে আসতো, তাহলি মনে হয় এতো বড় ক্ষতি হতো না।’
ফেইসবুককেন্দ্রিক আরেক পোস্টকে কেন্দ্র করে গত মাসে নড়াইলের সদর উপজেলায় মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষের গলায় জুতার মালা পরানোর খবরে বেশ কিছু দিন থেকে আলোচনায় রয়েছে নড়াইল। এর মধ্যেই সাহাপাড়ায় এই হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
দিঘলিয়া গ্রামটি বেশ বড়। গ্রামে প্রায় তিন শতাধিক পরিবার বাস করে। এর মধ্যে বাজারের পাশেই সাহাপাড়ায় শতাধিক হিন্দু পরিবার যুগের পর যুগ ধরে বসবাস করে এলেও কোনোদিন তারা এ ধরনের ঘটনার মুখোমুখি হননি; বরং হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সহাবস্থানের কথাই বলেছেন। কিন্তু ১৫ জুলাইয়ের হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা তাদের মধ্যে ভীতি ও আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা, বাজারের ব্যবসায়ী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাহাপাড়ার বাসিন্দা ২০ বছরের আকাশ সাহার একটি ফেইসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে। এতে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে সমালোচনা চলতে থাকে। জুম্মার নামাজের পর থেকেই উত্তেজনা ছড়াতে থাকে। আকাশের গ্রেপ্তার ও বিচার দাবিতে তাদের বাড়ির সামনে বিক্ষোভ শুরু করেন একদল।
বিকালে উত্তেজনা আরও বাড়ে এবং সন্ধ্যায় তারা সাহাপাড়ার কয়েকটি বাড়িঘর ভাঙচুর করে। এরই ধারাবাহিকতায় রাতে বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এ সময় সামনে যাকে পেয়েছে তাকেই মারধর করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন সাহাপাড়ার বাসিন্দারা।
সেদিন গোবিন্দ সাহার ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। ভাঙচুর করা হয় তরুণ সাহা, দিলীপ সাহা, পরান সাহাসহ কয়েকটি বাড়ি ও অশোক সাহার দোকান। এ ছাড়া দিঘলিয়া আখড়াবাড়ি সার্বজনীন দুর্গাপুর মন্দির এবং দুটি পারিবারিক মন্দিরে হামলা ও ভাঙচুর করা হয়েছে।
স্থানীয় সংসদ সদস্য মাশরাফি বিন মুর্তজার ধারণা, ‘সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিপদে ফেলার’, পাশাপাশি তাকেও ‘বিপদে ঠেলে দেওয়ার খেলা’য় মেতেছে একটি পক্ষ।
দিঘলিয়ার সাহাপাড়ার ঘটনা যারা ঘটিয়েছে, তারা আগেও সক্রিয় ছিল এবং ‘পেছন থেকে আঘাত করছে’ বলে জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক এই অধিনায়কের ভাষ্য।