ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ৩০ আগস্ট ২০২৩ ১২:১৮ পিএম
আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০২৩ ১৩:৫৩ পিএম
পোশাক শ্রমিক। ফাইল ফটো
জাতীয় নির্বাচনের আগে পোশাক কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টির আশঙ্কা করা হচ্ছে। ওই সময় বকেয়া বেতন-ভাতার বিষয়টি নিয়ে একটা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে। এমন আশঙ্কা থেকে সময় থাকতেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএকে নির্দেশনা দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।
এ ছাড়া পোশাকশ্রমিকরা বিক্ষুব্ধ হয়ে সড়ক অবরোধসহ কোনো রকম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে সেজন্য ব্যবস্থা নিতে সব বিভাগীয় কমিশনার ও ডিসিদের চিঠি দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সূত্র বলছে, সম্প্রতি বিভাগীয় কমিশনারদের কাছ থেকে পাওয়া জুলাই ২০২৩-এর দ্বিতীয় পক্ষের গোপনীয় প্রতিবেদনে পোশাক কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কার কথা উল্লেখ করা হয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রস্তাবটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়- রাজধানী ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী ও মুন্সীগঞ্জ জেলায় বিপুলসংখ্যক গার্মেন্টস কারখানায় অসংখ্য শ্রমিক কাজ করেন। এসব কারখানার অনেক মালিক সময়মতো বেতন পরিশোধ না করায় শ্রমিকরা বিক্ষুব্ধ হন এবং মাঝে মাঝে সড়ক অবরোধ করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেন। বকেয়া বেতনের কারণেই নির্বাচনপূর্ব সময়ে নতুন করে এ অসন্তোষ দানা বাঁধার আশঙ্কা রয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে বিভাগীয় কমিশনারদের পাঠানো গোপনীয় প্রতিবেদনটির বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে সেটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে উপস্থাপন করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে জানা গেছে।
সম্প্রতি ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশের এক প্রতিবেদন পুলিশ সদর দপ্তর থেকেও এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগে পাঠিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। শ্রমিক অসন্তোষ নিরসন ও সময়মতো বেতন-ভাতা পরিশোধে সাতটি সুপারিশ করেছে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সুপারিশ করে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, কিছু কিছু গার্মেন্টস মালিক রপ্তানি হ্রাস, ক্রয়াদেশ বাতিল, কাজের অর্ডার কম বা না পাওয়া, মূলধনের অভাব, ঋণ ও প্রণোদনা না পাওয়াসহ বিভিন্ন অজুহাতে প্রতিমাসে সময়মতো শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করেন না। অনেক ক্ষেত্রে মালিকপক্ষ পূর্ব নোটিস ছাড়াই আকস্মিকভাবে ফ্যাক্টরি বন্ধ করে দেয়। এ ছাড়া সুনির্দিষ্ট নিয়ম না মেনে বিভিন্ন সময়ে কারণে-অকারণে শ্রমিক ছাঁটাই করা, ওভারটাইম ভাতা ও বার্ষিক ছুটির টাকা না দেওয়া, কোনো কোনো ফ্যাক্টরিতে পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী না থাকা, হঠাৎ করে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি অন্যত্র সরিয়ে ফেলা, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার অভাবসহ বিভিন্ন ইস্যুতে প্রায়ই পোশাকশিল্পে শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দেয়।
জানা গেছে, শ্রমিক অসন্তোষ নিরসন ও সময়মতো বেতন-ভাতা পরিশোধে সাতটি সুপারিশ করেছে পুলিশ। সেগুলো হচ্ছেÑ গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন-ভাতাদি যাতে প্রতিমাসের ১০ তারিখের মধ্যে নিয়মিত পরিশোধ করা হয়, সেটি নিশ্চিত করা। বিদেশি অর্ডার পাওয়ার ক্ষেত্রে অসুস্থ প্রতিযোগিতা পরিহারে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও শ্রম মন্ত্রণালয় মিলে নীতিমালা প্রণয়ণ করা। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ইউরোপে গার্মেন্টস পণ্য রপ্তানি স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ। শ্রমিক ছাঁটাই ও কারখানা বন্ধ রোধে রুগ্ণ, মাঝারি ও ক্ষুদ্র কারখানাগুলোকে চিহ্নিত করে তাদের আর্থিক ও কারিগরি প্রণোদনাসহ সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
বাজার গবেষণার মাধ্যমে নতুন নতুন প্রযুক্তির প্রয়োগ ও পণ্যের বহুমুখীকরণসহ নতুন বাজার সৃষ্টিতে উদ্যোগী হওয়া। হঠাৎ করে শ্রমিক ছাঁটাই ও কারখানা বন্ধ না করে শ্রম আইন অনুযায়ী কারখানা লে-অফ ও শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ব্যবস্থা রাখা। শ্রমিক অসন্তোষসহ কোনোরূপ অপ্রীতিকর ঘটনার আগাম তথ্য পাওয়া গেলে তা প্রশাসন, মালিক ও শ্রমিক নেতাদের সমন্বয়ে দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া।
এ বিষয়ে তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সহ-সভাপতি শহিদউল্লাহ আজিম বলেছেন, যেকোনো সময়ের চেয়ে দেশের পোশাক কারখানা ভালোভাবে চলছে। কোনো ধরনের অসন্তোষের আশঙ্কা থাকার কথা নয়। তবে কিছু লোক আছে, যারা সামান্য অর্থ কামানোর জন্য বাইরে থেকে উস্কানি দেয়। যাতে কোনো ধরনের অসন্তোষ সৃষ্টি না হয় সে বিষয়ে নিয়মিত তদারকি করা হবে।
এর আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের রাজনৈতিক শাখা থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে বলা হয়েছিল, যেসব গার্মেন্টস কারখানায় ক্রয়াদেশ না আসায় সংকট সৃষ্টি হচ্ছে, সেদিকে নজরদারি বাড়িয়ে তা নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে বাজার গবেষণার মাধ্যমে নতুন প্রযুক্তির প্রয়োগ ও পণ্যের বহুমুখীকরণসহ নতুন বাজার সৃষ্টিতে উদ্যোগী হতে হবে।