চিকিৎসাসেবকদের লোভের বলি রোগী-২
শরীফুল রুকন, অতিথি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৪ জুলাই ২০২৩ ০৮:৫১ এএম
আপডেট : ২৪ জুলাই ২০২৩ ১১:৪৫ এএম
এই সিরিজ অনুসন্ধানের প্রথম পর্বে গতকাল ছাপা হওয়া প্রতিবেদনে আমরা তথ্য-প্রমাণসহ দেখিয়েছি, ওষুধ কোম্পানিগুলো রোগীর প্রেসক্রিপশনে তাদের তৈরি ওষুধের নাম লেখানোর জন্য ডাক্তারদের কীভাবে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে চেক, নগদ টাকা, মাসোয়ারা, ফ্রিজ, টিভি, এসি, বাড়ি, গাড়ি পর্যন্ত ‘উপহার’ দিয়ে চলেছে।
এভাবে উভয়পক্ষই যে শুধু নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দিচ্ছে তা-ই না; আরেক ঘৃণ্য, অমানবিক কাজেও শামিল হচ্ছে। ডাক্তারদেরকে দেওয়া ওষুধ কোম্পানিগুলোর ওই উপহারের খরচাটা ওষুধের দামের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে রোগীর ‘গলা কেটে’ উসুল করা হচ্ছে। কিন্তু জাতীয় ওষুধ নীতি ২০১৬-এর ৪.৯ (ক) ধারায় উল্লেখ আছে, ‘ঔষধ উৎপাদনকারী ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর কর্তৃক অনুমোদিত ‘‘কোড অব ফার্মাসিউটিক্যালস মার্কেটিং প্র্যাকটিসেস’’ অনুযায়ী তাদের বিপণন কার্যক্রম পরিচালনা করবে।’
এবার দেখা যাক, ওষুধপণ্য বিপণনের ওই বিধিমালায় কী বলা আছে। বিধিমালার ১৯.১ ধারায় স্পষ্ট বলা আছে, ‘কোনো পণ্যের বিক্রি প্রসারের উদ্দেশ্যে চিকিৎসাপেশার সঙ্গে জড়িত কাউকে কোনো ধরনের উপহার বা আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া বা তার প্রস্তাবও দেওয়া যাবে না।’
বিধিমালার ১৯.২ ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোনো ঔষধপণ্যের বিক্রি প্রসারের উদ্দেশ্যে চিকিৎসাসেবায় জড়িতদের চিকিৎসার কাজে সহায়তা করে- এমন কিছু উপহার দেওয়া যাবে, তবে সেটা অযৌক্তিক রকমের দামি হতে পারবে না।’
অথচ ওষুধ কোম্পানি ও চিকিৎসকরা দামি উপহার দেওয়া-নেওয়ার মাধ্যমে সরকারি বিধিমালা লঙ্ঘনের মতো গুরুতর অপরাধও অবলীলায় করে চলেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ বুলেটিন ২০২০ অনুসারে, দেশে নিবন্ধিত চিকিৎসকের সংখ্যা ১ লাখ ৮ হাজার। আর বিএমএর কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ডা. শেখ শফিউল আজমের মতে, দেশে এখন বিএমডিসির নিবন্ধিত চিকিৎসকের সংখ্যা হবে ১ লাখ ২০ হাজার।
অন্যদিকে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২১-২২ অনুযায়ী, দেশে ওষুধ প্রস্তুতকারী কোম্পানির সংখ্যা ২৯৫টি; এর মধ্যে চালু আছে ২২০টি। কাজেই এদের মধ্যে প্রতিদিনে, প্রতিমাসে বা প্রতিবছরে কী পরিমাণ ঘুষ লেনদেন হচ্ছে, তা বের করা যেমন অসম্ভব; তেমনি ওষুধের দামের সঙ্গে সেটা যুক্ত হয়ে ঠিক কতটা দাম বেড়ে যাচ্ছে, সেটা বের করাও প্রায় দুঃসাধ্য কাজ। তবু এই অনুসন্ধানে ওষুধের দাম বাড়িয়ে উপহারের টাকা উসুলের তথ্য-প্রমাণের পাশাপাশি কিছু হিসাব-নিকাশও বের করে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। কোম্পানি ‘উপহার’ বললেও অন্যরা অবশ্য এটিকে ঘুষ হিসেবেই মনে করেন।
কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে ওষুধের দামের ১০ শতাংশ ডাক্তারদের দেওয়া এই ঘুষের অংশ বলে দাবি করা হচ্ছে। আর সব খরচ বাদ দিয়ে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কোম্পানির নিট মুনাফা থাকে বলা হচ্ছে। অর্থাৎ তাদের দাবি মতেই, ওষুধের দামের অর্ধেক চলে যাচ্ছে ডাক্তার আর কোম্পানি মালিকের পকেটে; আর বাকি অর্ধেক নানা খাতের খরচে। কিন্তু আমাদের অনুসন্ধান বলছে, বাস্তবে ডাক্তারের ঘুষের অংশ আরও বেশি এবং ওষুধের উৎপাদন খরচের অংশ আরও কম। এভাবে আমাদের অনুসন্ধানের হিসাব আরও বলছে, ডাক্তারদের লোভ আর কোম্পানি মালিকদের অতিমুনাফার লিপ্সা- এই দুটি না থাকলে অসহায় রোগীরা ওষুধ কিনতে পারতেন প্রায় অর্ধেক দামে।
ঘুষের টাকা যুক্ত হয় ওষুধের দামে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক আ ব ম ফারুক বলেন, আমাদের দেশে ওষুধের দাম বেশি হওয়ার পেছনে অনেক কারণ আছে। এর মধ্যে বড় কারণ ওষুধ কোম্পানিগুলোর অনৈতিক বিপণন নীতি। দেশে এটা প্রথম শুরু করেছিল মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলো। তারা ডাক্তারদের উপহার দিত। তাদের দেখাদেখি দেশি কোম্পানিগুলোও উপহার দেওয়া শুরু করে। পরে তারা এমনভাবে শুরু করেছে যে, বিদেশিগুলো এখন পেছনে পড়ে গেছে। চিকিৎসকদের এভাবে ঘুষ দেওয়া বন্ধ করতে পারলে দেশে ওষুধ মিলত অনেক সস্তায়।’
বিএমএ সভাপতি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনও অকপটে বলেন, ‘ডাক্তারদেরকে দেওয়া ওষুধ কোম্পানির গিফটের কারণেই ওষুধের দাম বাড়ছে।’
১৪২২ বাংলা সনের বাংলাদেশ উন্নয়ন সমীক্ষার বার্ষিক সংখ্যায় প্রকাশিত জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ‘দেশের একটি পরিবারকে গড়ে মাসিক আয়ের ৯ শতাংশ ব্যয় করতে হয় চিকিৎসার পেছনে। আর দরিদ্রদের ক্ষেত্রে এই ব্যয় ৩৫ শতাংশ। এর ৬৬ শতাংশই আবার চলে যায় ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষায়।’
২০২১ সালের ২১ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের মহাপরিচালক ড. মো. শাহাদৎ হোসেন মাহমুদ উপস্থাপিত চিকিৎসা ব্যয়বিষয়ক গবেষণা প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়, ওষুধ কেনায় মাত্রাতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে দেশে চিকিৎসাসেবা-বঞ্চিত থাকছেন ১৬ শতাংশ রোগী।
গত ৪ জানুয়ারি রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ন্যাশনাল হেলথ অ্যাকাউন্টসের ষষ্ঠ রাউন্ডের চূড়ান্ত ফলাফল অবহিতকরণ কর্মশালায় সরকারের ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, ‘মহামারি ও যুদ্ধের ফলে ডলার সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন কোম্পানি থেকে চিকিৎসকদের নেওয়া উপহার কমিয়ে দিতে হবে। অ্যাগ্রেসিভ মার্কেটিং থেকে সরে এসে ওষুধ কোম্পানিগুলো যদি খরচ কমিয়ে দেয়, তাহলে ওষুধের দাম কমে যাবে বলে মনে করি।’
২০২১ সালের জুনে সরকারি প্রকাশনা ‘বাংলাদেশ উন্নয়ন সমীক্ষা’য় এক গবেষণা নিবন্ধে বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির ২৫ জন বিক্রয় প্রতিনিধির সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে পাওয়া তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, ‘চিকিৎসকরা যাতে চিকিৎসাপত্রে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির ওষুধ লিখে দেন, সেজন্য তাদের পেছনে বিশেষ প্রণোদনা ব্যয়ও বিপণন ব্যয়ে অন্তর্ভুক্ত থাকে। এভাবে মার্কেটিং বা বিপণন বাবদ খরচ বেড়ে যায়, যা শেষতক ওষুধ ব্যবহারকারীদের ঘাড়েই চাপে।’
কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চেয়ারম্যান গোলাম রহমান বলেন, ‘ওষুধ প্রশাসনের হাতে একসময় ২১৯ থেকে ২২০টি জরুরি ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা থাকলেও এখন আছে মাত্র ১১৭টির। এর মাধ্যমে ইচ্ছামতো দাম বাড়ানোর সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে ওষুধ কোম্পানিগুলোকে। কিছু চিকিৎসকের মাধ্যমে তাদের ওষুধ রোগীদের প্রেসক্রিপশনে লেখানো; বিনিময়ে ওই চিকিৎসকদের অনৈতিক সুবিধা দিয়ে থাকে তারা। এতে যে টাকা খরচ হয়, তা ভোক্তাদের কাছ থেকেই তোলা হয়, যা সম্পূর্ণ অনৈতিক।’
২০২২ সালের ২৩ নভেম্বর ক্যাব আয়োজিত এক অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির কোষাধ্যক্ষ মনজুর ই খোদা তরফদার বলেন, ‘সরেজমিন ফার্মেসিগুলোতে গিয়ে খুচরা ওষুধের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত ছয় মাসের ব্যবধানে প্যারাসিটামল সিরাপের দাম বেড়েছে ৭৫ শতাংশ। এ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক, গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন রোগের ওষুধের দাম বেড়েছে ১৩ থেকে ৩৩ শতাংশ।’
স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের মার্কেটিং বিভাগের সিনিয়র ম্যানেজার আসাদ উল্লাহও স্বীকার করেন, ‘ডাক্তারদের গিফট দেওয়ার ক্ষেত্রে যে খরচগুলো হয়, সেগুলো প্রমোশনাল কস্ট থেকে আসে। ওষুধের দামের সাথে সেগুলোও অন্তর্ভুক্ত থাকে। ’
৩৫ পয়সার ওমিপ্রাজল ৬ টাকা!
অন্যসব পণ্যের মতো ওষুধের মূল্যও ঠিক করা হয় কাঁচামালের দাম, উৎপাদন খরচ, প্যাকেটিং খরচ, বিপণন খরচ ও কোম্পানির লাভÑ এই কয়টি বিষয় বিবেচনায় নিয়ে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ওষুধের কাঁচামাল শতভাগ আমদানিনির্ভর; দামেও সস্তা এবং এই খাতে সরকারের ভ্যাট-ট্যাক্সসহ বিভিন্ন রকমের ছাড় আছে। ওষুধের উৎপাদন খরচও কম, কারণ এদেশে জনবলের খরচ অন্য দেশের তুলনায় বেশ কম। একইভাবে প্যাকেটিং খরচও কম। আর পেটেন্ট খরচ তো শূন্য।
অধ্যাপক আ ব ম ফারুক বলেন, ‘বাংলাদেশের নিজস্ব কোনো ওষুধ আবিষ্কার নাই, তাই পেটেন্টও নাই। পেটেন্ট কিনে ওষুধ বানানোর মতো সামর্থ্যও আমাদের নাই। সচরাচর যা ঘটে, সেটা হলো- পেটেন্টের মালিক যারা, তাদের কাছ থেকে কাঁচামাল কেনার শর্তেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ওষুধ তৈরির অনুমতি পায় এদেশের কোম্পানিগুলো। এখানেও বড় একটা ছাড় পাচ্ছে তারা।’
একটি ওষুধের উৎপাদন ব্যয়ের হিসাব কষা যাক। গ্যাস্ট্রিক-আলসারের একটি বহুল প্রচলিত ওষুধের জেনেরিক নাম ওমিপ্রাজল। এর একটি কাঁচামালের নাম ওমিপ্রাজল ৮.৫% পেলেট। এটি দিয়ে বেক্সিমকো ‘প্রোসেপটিন’, স্কয়ার ‘সেকলো’, অ্যারিস্টো ফার্মা ‘ওমেপ’, ইবনে সিনা ‘প্রলোক’, ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল ‘কোসেক’, ইনসেপ্টা ‘ওমেনিক্স’, নাভানা ‘ওমেটাক’, এসকেএফ ‘লোসেকটিল’ ২০ মিলিগ্রাম ক্যাপসুল তৈরি করে।
২০১৯ সালের ২২ জুলাই ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর অনুমোদিত একটি ‘ব্লক লিস্ট’ থেকে জানা যায়, ওমিপ্রাজল ৮.৫% পেলেটের দাম প্রতি কেজি ১২ ডলার (তৎকালীন প্রায় ১ হাজার টাকা)। তাহলে সরল হিসাব দাঁড়াচ্ছে, ১ কেজি কাঁচামাল দিয়ে ২০ মিলিগ্রাম ওমিপ্রাজল ক্যাপসুল তৈরি করা যাচ্ছে ৫০ হাজার পিস। আর খরচের হিসাব দাঁড়াচ্ছে ১ হাজার টাকার কাঁচামাল দিয়ে ৫০ হাজার পিস ওষুধ তৈরি হলে একটি ওষুধে কাঁচামালের (সক্রিয় উপাদান) খরচ পড়েছিল ২ পয়সা।
২০২১ সালের জুনে প্রকাশিত বাংলাদেশ উন্নয়ন সমীক্ষার একটি গবেষণা নিবন্ধে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের বরাত দিয়ে বলা হয়, ‘দেশে ওষুধ তৈরির কাঁচামালের মধ্যে ৬৭.৫ শতাংশ আমদানি করা হয় ভারত থেকে। ওষুধের কাঁচামাল বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত অনলাইনে প্রকাশ্যে দাম বলে না। আলোচনার ভিত্তিতে দাম নির্ধারণ হয়।’ তবে ভারতের ই-কমার্স কোম্পানি ‘ইন্ডিয়ামার্ট’-এর ওয়েবসাইটে গত ৯ জুন সার্চ করে জানা যায়, গ্যাস্ট্রিক-আলসারের ওষুধ তৈরির মূল কাঁচামাল ‘ওমিপ্রাজল ৮.৫% পেলেট’-এর দাম কেজিপ্রতি ১ হাজার রুপি (১ হাজার ৩১১ টাকা); বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান গুজরাটের ফার্ম্যাক্স লাইফসায়েন্সেস। প্রকৃতপক্ষে এর চেয়েও কম দামে দেশের ওষুধ কোম্পানিগুলো কাঁচামালটি আমদানি করে। তবুও সেই দামটি ধরে নিচ্ছি আমরা।
১ কেজিতে হয় ১০ লাখ মিলিগ্রাম। তাহলে সরল হিসাব দাঁড়াচ্ছে, ১ কেজি কাঁচামাল দিয়ে ২০ মিলিগ্রাম ওমিপ্রাজল ক্যাপসুল তৈরি করা যাচ্ছে ৫০ হাজার পিস। আর খরচের হিসাব দাঁড়াচ্ছেÑ ১ হাজার ৩১১ টাকার কাঁচামাল দিয়ে ৫০ হাজার পিস ওষুধ তৈরি হলে একটি ওষুধে কাঁচামালের (সক্রিয় উপাদান) খরচ আড়াই পয়সার একটু বেশি।
হিসাবটি তুলে ধরে মন্তব্য জানতে চাইলে একটি ওষুধ কোম্পানির কাঁচামাল আমদানির সঙ্গে যুক্ত একজন কর্মকর্তা নাম গোপন রাখার অনুরোধ করে বললেন, হিসাব ঠিক আছে। তবে একটি ওষুধে দুই ধরনের কাঁচামাল থাকেÑ একটি সক্রিয় উপাদান, আরেকটি নিষ্ক্রিয়। সক্রিয় উপাদান হচ্ছে ওমিপ্রাজল ৮.৫% পেলেট, ওষুধ বলতে এটাই বোঝায়; এটাই আসলে রোগ সারায়। আর নিষ্ক্রিয় উপাদান হলো আটা-ময়দার মতো, যা দিয়ে ওষুধের আকার-আকৃতি দেওয়া হয়। আর ক্যাপসুলের ক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয় উপাদান লাগে জিলেটিন, রেড আয়রন অক্সাইড, ইয়েলো আয়রন অক্সাইড ইত্যাদি নামের কিছু খাদ্যোপযোগী রাসায়নিক।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি ও ফার্মাকোলজি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. মুনীরউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘ওষুধের নিষ্ক্রিয় উপাদানের মধ্যে রয়েছে স্টার্চ, ল্যাকটোজ, সুক্রোজ, চালের গুঁড়া, আটা-ময়দা টাইপের জিনিস। নিষ্ক্রিয় উপাদানের দাম পড়বে সক্রিয় উপাদানের এক হাজার ভাগের এক ভাগ। এটা ধর্তব্যের মধ্যেই না। তিনি বলেন, ‘ওষুধ কোম্পানিগুলো যদি ১০ হাজার শতাংশ লাভ নেয়, আপনি কী করবেন? এটা বন্ধ করার উপায় কী?’
স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস তাদের ওমিপ্রাজল গ্রুপের সেকলো ২০ এমজি ক্যাপসুলের দাম প্রতি পিস ৬ টাকায় বিক্রি করে আসছে ২০১৯ সাল থেকে। অন্য কিছু কোম্পানির ওমিপ্রাজল গ্রুপের ওষুধের দাম আগের মতোই প্রতি পিস ৫ টাকা আছে।
৩ পয়সার ওমিপ্রাজল গ্রুপের সেই ওষুধের উৎপাদন খরচ, প্যাকেটিং, মার্কেটিং ও কোম্পানির লাভ ন্যায্যভাবে যোগ করলে দাম কত হতে পারেÑ ধারণা পেতে চাইলে একটি ওষুধ কোম্পানির একজন পরিচালক জানান, ওমিপ্রাজল গ্রুপের ২০ মিলিগ্রামের একটি ক্যাপসুল বানাতে খালি ক্যাপসুল সেল লাগবে, যেটার দাম প্রতি পিস কমপক্ষে ১০ পয়সা। সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় কাঁচামালের দাম প্রতি পিসে কমপক্ষে ৫ পয়সা। অর্থাৎ ১০টি ক্যাপসুল বানাতে খরচ হবে দেড় টাকা। এরপর প্যাকেজিং উপকরণ হিসেবে ব্লিস্টার লাগবে, যেটার দাম প্রতিটি কমপক্ষে ২ টাকা। এর বাইরে কাগজের প্যাকেটের মূল্য যুক্ত হবে এভাবে কম-বেশি সাড়ে ৩ টাকার মধ্যে এক পাতা ওষুধ তৈরি করা সম্ভব; যা বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ৬০ টাকায়।
তবে তিনি এটাও জানান, ক্যাপসুলগুলো কোন মেশিনে প্রস্তুত করা হবে, কর্মীরা কতটা দক্ষ, কারখানার বাতাস ও পরিবেশ কতটা ভালোÑ এসব বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হবে। ৫ শতাংশ কাঁচামাল নষ্ট বা উধাও হয়। এ ছাড়া কোন কোম্পানি ডাক্তারকে কীভাবে, কত খরচে ম্যানেজ করছে, এসব ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে খরচের ভিন্নতা রয়েছে। যার কারণে বড় কোম্পানি ও ছোট কোম্পানির হিসাব এক রকম হবে না। মূল্য নির্ধারণের অনেক পদ্ধতি বা কৌশল আছে। একেক ওষুধের ক্ষেত্রে একেক কৌশল ঠিক করা হয়। (ওষুধের মূল্য নির্ধারণের সরকারি পদ্ধতির বিষয়টি পড়ুন পার্শ্ব প্রতিবেদনে)।
একটি চুক্তিনামা
২০১৪ সালের ২ নভেম্বর নোটারি পাবলিক করা একটি চুক্তিনামা বিশ্লেষণ করলেও ওষুধের উৎপাদন খরচ যে কত কম, তার প্রমাণ মিলবে। চুক্তিটি হয়েছে ওষুধ কোম্পানি এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজ লি. এবং ওষুধ বিপণন, বাজারজাতকরণ ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ইনোভেটিভ ফার্মার মধ্যে। চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেন এলবিয়নের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ রাইসুল উদ্দিন এবং ইনোভেটিভ ফার্মার মালিক কাজী মোহাম্মদ শহিদুল হাসান।
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত এলবিয়নের ওষুধ বাজারজাত করবে ইনোভেটিভ ফার্মা। এ কাজের যাবতীয় ব্যয় এবং কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ করবে ইনোভেটিভ।
চুক্তির সপ্তম দফায় উল্লেখ আছে, ‘এলবিয়নের ওষুধ বিক্রি করে পাওয়া নির্ধারিত মূল্যের ৪০ শতাংশ (টিপি মূল্য) পাবে এলবিয়ন, বাকি ৬০ শতাংশ পাবে ইনোভেটিভ ফার্মা।’
এর মানে দাঁড়াচ্ছে, এলবিয়ন যদি একটি ওষুধ উৎপাদন করে বিক্রেতার কাছ থেকে দাম রাখে ১০০ টাকা; সেখান থেকে ৬০ টাকাই দিয়ে দিচ্ছে বিপণন সংস্থাকে। নিজেদের ৪০ টাকার একটা বড় অংশ দিতে হচ্ছে ডাক্তারদের; চেক-গিফট ইত্যাদি দিয়ে খুশি করতে, যাতে তারা রোগীর প্রেসক্রিপশনে ওই ওষুধের নামটা লেখেন। বাকি যা থাকবে, সেটা থেকে উৎপাদন খরচটুকু বাদ দিয়ে নিজেদের লাভটা বুঝে রাখতে হবে। তাহলে ওষুধটার উৎপাদন খরচ আসলে কত? খুবই সামান্য না হলে এ রকম একটি চুক্তি মেনে ওষুধ কোম্পানিটি চলছে কীভাবে?
কোন খাতে কত ব্যয়
দেশে ব্যবসা করে আসা শীর্ষস্থানীয় একটি বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১২ জুন পর্যন্ত তাদের আড়াইশ কোটি টাকার ওষুধ বিক্রি হয়েছে। টিপি মূল্যে আড়াইশ কোটি টাকার ওষুধ বিক্রির বিপরীতে ডাক্তারদের পেছনে তারা খরচ করেছে ১৯ কোটি ১৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা (৭.৬৭ শতাংশ)। এর বাইরে সিএসআর (করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা) ফান্ডসহ আরও নানা ফান্ড থেকে ডাক্তারদের পেছনে খরচ করা হয়। সব মিলিয়ে তাদের ১০ শতাংশ বাজেট থাকে ডাক্তারদের পেছনে।
গতকাল ছাপা হওয়া এই সিরিজের প্রথম পর্বের পার্শ্ব প্রতিবেদনে সান ফার্মার একজন কর্মকর্তা দাবি করেন, ‘এখন আর ডাক্তারদের চেক দেওয়ার চর্চা তারা করছেন না। তবে রেগুলার প্রমোশন যা আছে, তা করছেন।’ এই রেগুলার প্রমোশন করতে গিয়ে ডাক্তারদের পেছনে তারা মোট বিক্রির ৭.৬৭ শতাংশ এবং সিএসআর ফান্ডসহ অন্যান্য ফান্ডের টাকাও খরচ করছে।
চট্টগ্রামভিত্তিক একটি ওষুধ কোম্পানির একজন পরিচালক বলেন, ‘বছরের শুরুতে আমরা বাজেট করি। সিওজিএস (কস্ট অব গুডস সোল্ড) বা ফ্যাক্টরি বাজেট রাখা হয় ৩০ শতাংশ; অর্থাৎ টিপি মূল্যের ৩০ শতাংশের মধ্যে পণ্য উৎপাদনের সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। উৎপাদন শেষ হওয়ার পর এটা বিক্রির দায়িত্ব পড়বে মার্কেটিং বিভাগের ওপর। এজন্য মার্কেটিং খাতের জন্যও ৩০ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়; এর মধ্যে ডাক্তার ফ্রন্টের জন্য কমপক্ষে ১০ শতাংশ বরাদ্দ থাকে। টিপি মূল্যের বাকি ৪০ শতাংশ কোম্পানির লাভ। এটা স্ট্যান্ডার্ড মান। বড় কোম্পানিগুলো এই হিসাবে চলে। তবে কোম্পানিভেদে ডাক্তার ফ্রন্টের ব্যয় সামান্য ভিন্ন হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘ডাক্তারদের খুশি করতে শুধু মার্কেটিং বিভাগের টাকা নয়, সিএসআর ফান্ড, প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও উন্নয়নসহ আরও অন্যান্য খাত থেকেও খরচ হয়। মার্কেটিং খাতে খরচ কম দেখাতে এই কৌশলটি নেওয়া হয়। কোম্পানির সিএসআর ফান্ডের পুরো টাকাই ডাক্তারদের পেছনে খরচ হতে পারে।’
টাকাগুলো কীভাবে বণ্টন করা হয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ধরুন, মাসে সারা দেশে একটা কোম্পানির ৫০ কোটি টাকা বিক্রি হলো। এর মধ্যে ১০ শতাংশ হিসাব ধরে ৫ কোটি টাকা কোম্পানি ডাক্তারদের জন্য রেখে দেবে। এই টাকা ক্যাশ দিচ্ছে, চেকেও দিচ্ছে। আবার এই টাকা দিয়ে ডাক্তারদের ফ্ল্যাট, গাড়িও দিচ্ছে।’
ওই কোম্পানি পরিচালক আরও বলেন, ‘কোম্পানিগুলো বছরের শুরুতে ঠিক করে, এ বছর তারা কতজন চিকিৎসককে বিদেশ ভ্রমণে পাঠাবে। ধরুন, ১০ জন চিকিৎসককে বিদেশ পাঠাতে জনপ্রতি লাখ টাকা ধরে বছরে ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ রেখেছে। এই ১০ লাখের মুলা ঝুলিয়ে কোম্পানি কয়েক কোটি টাকার ব্যবসা করে ফেলছে। চিকিৎসকদের জন্য বিমান টিকিট, হোটেল বুকিংÑ সব কোম্পানি থেকে করছে। এই ব্যয় কোম্পানি মার্কেটিং খাত থেকে দেখাতে পারে, আবার অন্য খাত থেকেও দিতে পারে। এটা করার কারণ মার্কেটিং খাতে খরচের টাকার অঙ্ক যাতে বড় না দেখায়।’
লাভের ওপর লাভ
ওষুধ কোম্পানিগুলো অতিরিক্ত বা অস্বাভাবিক লাভ করছে কি না জানতে চাইলে ওই কোম্পানি পরিচালক বলেন, অতিরিক্ত মানে! পুরোটাই লাভের ওপর লাভ। ডাক্তারকে সামান্য লোভে ফেলে মূল ব্যবসা হচ্ছে কোম্পানির। ২০২২ সালের তৃতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত বাংলাদেশে ওষুধের বাজারের আকার ছিল ৩ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলার। চিকিৎসক ও কোম্পানির অনৈতিকতার কারণে বাজার এতটা বেড়ে গেছে। এত বড় মার্কেট তো আমাদের হওয়ার কথা নয়। প্রয়োজন না থাকলেও গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। ক্যালসিয়াম ও ভিটামিনের ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজন ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হচ্ছে।
বড় কোম্পানি ও ছোট কোম্পানির ‘লাভের’ চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘শীর্ষ দুই-তিনটি প্রতিষ্ঠানের প্যারাসিটামল বাজারে বেশি চলে। প্যারাসিটামল ৫০০ মিলিগ্রামের একটি ওষুধের এমআরপি (সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য) ১ টাকা ২০ পয়সা। কিন্তু এটার উৎপাদন খরচ ৩০ পয়সার বেশি কোনোভাবেই হবে না। বড় কোম্পানিগুলো একসাথে ১ লাখ, ৫ লাখ প্যারাসিটামল বের করতে পারছে। তাদের মার্কেট বড়। কিন্তু ২৫-৩০ নম্বরে থাকা কোম্পানিগুলোর প্যারাসিটামলের বাজার ছোট।
অথচ তাদের মেশিন ও জনবল বড় কোম্পানিগুলোর সমান। ফলে ছোট কোম্পানিগুলোর উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। দেখা যাবে, বড় কোম্পানিগুলো যেটা ৩০ পয়সায় বের করতে পারছে, ছোট কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে সেটা ৫০ পয়সা লাগছে। এ অবস্থায় ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো ওষুধের সক্রিয় উপাদানের পরিমাণ কমিয়ে দিয়ে উৎপাদন খরচ ৩০ পয়সায় নিয়ে আসে। অর্থাৎ ৫০০ মিলিগ্রামের জায়গায় ৩০০ মিলিগ্রাম সক্রিয় উপাদান দিচ্ছে। যার কারণে ওষুধের মান কমে যাচ্ছে; ওষুধ কাজ করছে না।’
সরকার যে ওষুধগুলোর দাম নির্ধারণ করে দেয়, সেগুলোর ক্ষেত্রে কোম্পানির লাভ কম হয় কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘দাম নির্ধারণ করে দেওয়া ওষুধগুলো বেশি চলে। এগুলো ওটিসি (ওভার দ্য কাউন্টার ড্রাগ) হয়ে গেছে। মানে নাপা তো আপনার মাথায় ঢুকে গেছে। কোনো ডাক্তারকে তো লিখে দিতে হচ্ছে না। এটা ফার্মেসিতে যাওয়া মাত্রই কিনতে পারছেন। কিন্তু আমি যদি আপনাকে ব্লাডপ্রেশারের ওষুধ কিনতে বলি, আপনি ইচ্ছেমতো কিনতে পারবেন না। এগুলো প্রেসক্রিপশন ওষুধ। ওটিসি ওষুধগুলোর মার্কেটিং খরচ নেই বললেই চলে। এগুলো এমনিই চলে। যার কারণে এগুলোর দাম কম। তার মানে এই নয় যে, সেখান থেকে কোম্পানি লাভ করছে না। ৩০-৪০ শতাংশ লাভ সেখান থেকেও করে। সরকার যে ওষুধগুলোর দাম নির্ধারণ করে, সেগুলোও তো কোম্পানির সাথে বসেই ঠিক করে। ‘‘ডলারের দাম বেড়ে গেছে, কাঁচামাল আনতে পারছি না’’- এসব ধুয়া তুলে দাম বাড়ানো হয়। ডলার আগে ৯০ টাকা ছিল, এখন ১১০ টাকা হয়েছে। ২০ টাকা বেড়েছে। কিন্তু ওষুধের দাম তো ৫০ শতাংশ পর্যন্তও বাড়ানো হয়েছে।’
১০০ টাকা দামের ওষুধের মধ্যে কত টাকা ডাক্তারদের গিফটের পেছনে ব্যয় হয়, জানতে চাইলে স্কয়ার ফার্মার মার্কেটিং বিভাগের সিনিয়র ম্যানেজার আসাদ উল্লাহ বলেন, ‘এটা এক শতাংশেরও কম। অন্য কারা কী করে, জানি না। আমরা বলে দিই, এটা পারা যাবে, এটা পারা যাবে না।’
‘চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. ইলিয়াছ চৌধুরী জানিয়েছেন, তিনি ফটিকছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত থাকাকালে স্কয়ার ফার্মা হাসপাতালটির জন্য দুটি অ্যাম্বুলেন্স দিয়েছিল। ওই খরচটি মার্কেটিং খাত থেকে দেওয়া হয়েছিল কি না’Ñ জানতে চাইলে আসাদ উল্লাহ বলেন, ‘এ ধরনের কাজ সিএসআর ফান্ড থেকে করা হয়। সেখানে আলাদা বাজেট থাকে। আমরা যেহেতু বড় কোম্পানি, সমাজের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা আছে। সে কারণে লাভের একটা অংশ থেকে আমাদেরকে এ কাজগুলো করতে হয়।’
‘ওষুধ কোম্পানিগুলো ডাক্তারদের চেকের মাধ্যমে টাকা দিয়ে থাকে। স্কয়ারও এভাবে দেয় বলে অভিযোগ আছে’Ñ এমন প্রসঙ্গ তোলা হলে আসাদ উল্লাহ বলেন, ‘এভাবে যারা দেয়, তারাই বলতে পারবে। আমরা ডাক্তারদের বিভিন্ন প্রোগ্রামে ডোনেট করি। যখন সায়েন্টিফিক বিষয় থাকে, কিছু নলেজ শেয়ারিংয়ের ব্যাপার থাকে। তখন সেখানে আমরা সায়েন্টিফিক পার্টনার হই। কোনো কোম্পানি এককভাবে এসব করতে পারে না। তাই এসবে আমরা কন্ট্রিবিউট করি। এসব প্রোগ্রাম আয়োজনে সম্পৃক্ত থাকা ডাক্তারের নামে চেক যেতেই পারে।’
তিনি বলেন, ‘ওষুধের দাম কমাতে হলে আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম কমাতে হবে। আপনি পারলে ওটা নিয়ে কাজ করতে পারেন। তাহলে আমাদের ওষুধের দাম কমবে।’ কিন্তু কাঁচামালের দাম যে খুবই নগণ্য, সেই হিসাব তুলে ধরলে তিনি বলেন, ‘ওষুধ কারখানার বাতাস বিশুদ্ধ রাখতে হয়, বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করতে হয়। অন্যান্য কারখানার সঙ্গে ওষুধ কারখানার বেশ তফাত রয়েছে। আমরা যদি মানসম্মত ওষুধ উৎপাদন করতে যাই, তাহলে আমাদের উৎপাদন খরচ অনেক বেশি পড়ে। তাছাড়া সব কোম্পানির কাঁচামাল তো ভারত থেকে আসে না। আমাদের প্রচুর পরিমাণ আমেরিকান, ইউরোপিয়ান কাঁচামাল ব্যবহার করতে হয়। কারণ আমাদেরকে মান বজায় রাখতে হয়।’
ওষুধের দাম নির্ধারণের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সরকার যে ওষুধগুলোর দাম নির্ধারণ করে দেয়, সেগুলোর ক্ষেত্রে আমাদের কোনো মার্জিন থাকে না। যে ওষুধগুলোর দাম আমরা নির্ধারণ করতে পারি, সেগুলোর ক্ষেত্রে ওষুধ প্রশাসন পুরো খরচ বিশ্লেষণ করে। তারা যদি মনে করে এটি যৌক্তিক, তখন সেটি অনুমোদন দেয়। এমন নয় যে, আমরা যা ইচ্ছা তা দাম নির্ধারণ করতে পারব। কিছু কিছু জায়গায় ওষুধ শিল্প সমিতি সমঝোতা করে।
দাবি জানায়, এ রকম না হলে আমরা ব্যবসা করতে পারব না। আবার এমনও আছে, একটি ওষুধের দাম আমরা ১০ টাকা চাইলাম। ওষুধ প্রশাসন বলেছে, এটা ৮ টাকায় দিতে হবে। আমরা যাচাই-বাছাই করে দেখলাম ৮ টাকায় হলে আমাদের লস হয়। তখন কিন্তু সেটি তারা অনুমোদন দিল না। তখন আমাদেরকে বলা হলো, আপনারা রিভ্যালুয়েশন করুন। আবার ঔষধ প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমাদের বলা হয়, এগুলো আপনারা উৎপাদন করে দিন। কাজেই কিছু কিছু জায়গায় আমাদের সাথে সমঝোতা হয়, এটা ইন্ডাস্ট্রির স্বার্থে। আমাদেরকে অনেক যুদ্ধ করে এই দাম অনুমোদন নিতে হয়।’
গত ২৯ মার্চ রাজধানীর একটি হোটেলে পঞ্চম স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর কর্মসূচির (এইচপিএনএসপি) খসড়া স্ট্র্যাটেজিক ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান শীর্ষক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, ‘ওষুধের দাম বেশি কেন রাখা হয়, তা খুঁজে বের করতে হবে। অনেকে অভিযোগ করেন, প্রেসক্রিপশনে প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত ওষুধ লেখা হয়। এ বিষয়টি চিকিৎসকদের খেয়াল রাখতে হবে। প্রেসক্রিপশন লেখার সময় যেন ব্যবসায়িক চিন্তা কাজ না করে।’