দীপক দেব
প্রকাশ : ০৪ জুলাই ২০২৩ ১১:৫৩ এএম
প্রতীকী ছবি
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোটের শরিক গণতন্ত্রী পার্টির মধ্যে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ঢাকা-১৭ আসনের উপনির্বাচনে দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়াকে কেন্দ্র করে দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরোধ প্রকাশ্য রূপ নেয়। উপদলীয় চক্রান্তের অভিযোগ এনে দলটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক একে অপরকে পাল্টাপাল্টি বহিষ্কার করেছেন।
জানা গেছে, গত ২৬ জুন নিয়মবহির্ভূতভাবে পার্টির সঙ্গে সম্পৃক্ত নয় এমন অখ্যাত ব্যক্তিকে ঢাকা-১৭ আসনের উপনির্বাচনে দলীয় প্রার্থী করায় দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নসহ উপদলীয় চক্রান্তের অভিযোগে গণতন্ত্রী পার্টির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা ব্যারিস্টার আরশ আলীকে সভাপতির পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতিমণ্ডলীর দুই সদস্য অধ্যাপক ডা. শহিদুল্লাহ শিকদার ও অ্যাডভোকেট ভূপেন্দ্র ভৌমিক দোলনকে পার্টির প্রাথমিক সদস্য পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার কথা জানানো হয়।
এই সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে ১ জুলাই শনিবার পার্টির সভাপতি জরুরি বৈঠক ডেকে প্রায় একই অভিযোগে পার্টির সাধারণ সম্পাদক ডা. শাহাদাত হোসেন ও ভারপ্রাপ্ত সভাপতি প্রকৌশলী কামরুল আহসান খান পারভেজকে পাল্টা বহিষ্কার করেন।
দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি বহিষ্কারের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রী পার্টির ভেতরে ভাঙনের সুর বাজতে শুরু করেছে বলে মনে করেন রাজনীতিসচেতন মানুষজন। এদিকে অনেকেই মনে করছেন এই অবস্থার মধ্যে দিয়ে ক্ষমতাসীন ১৪-দলীয় জোটের আরও একটি দল ভাঙনের মুখে পড়তে যাচ্ছে। এর আগে ১৪-দলীয় জোটের শরিক দলের মধ্যে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ, সাম্যবাদী দল, ন্যাপ, বাসদ ও গণআজাদী লীগ ভাঙনের মধ্যে পড়ে। সে তালিকায় এবার নতুন করে যুক্ত হতে যাচ্ছে গণতন্ত্রী পার্টি।
দলটির কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সম্মেলন নিয়ে গণতন্ত্রী পার্টির মধ্যে একটা চাপা উত্তেজনা ছিল। গত বছর ডিসেম্বরে সম্মেলনের একটা উদ্যোগ প্রথম অধিবেশন পর্যন্ত গড়ানোর পর তা স্থগিত করতে হয়। এরপর থেকে সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে একটি পক্ষের দূরত্ব তৈরি হয় দ্রুত সম্মেলন করার প্রশ্নে। এই ধারাবাহিকতায় ঢাকা-১৭ আসনের উপনির্বাচন সামনে রেখে গণতন্ত্রী পার্টির প্রার্থিতা ঘোষণা করার মধ্য দিয়ে কোন্দলের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। দলটির দুইজন মনোনয়নপ্রত্যাশী নির্বাচন কমিশন (ইসি) থেকে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেন।
সভাপতি পক্ষের অভিযোগ, সভাপতি ও দলীয় মনোনয়ন বোর্ডের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা না করে সাধারণ সম্পাদক ডা. শাহাদাত হোসেন দলটির কিছু নেতাকে নিয়ে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অশোক ধরকে দলীয় মনোনয়ন দেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে সভাপতিসহ অনেকেই এর বিরোধিতা করে পৃথক প্রার্থী ঘোষণা করেন। সভাপতি স্বাক্ষরিত ও মনোনীত দলীয় প্রার্থী হিসেবে কামরুল ইসলাম গণতন্ত্রী পার্টির পক্ষ থেকে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেন।
এতে করে সাধারণ সম্পাদক মনোনীত প্রার্থী ও সভাপতি মনোনীত প্রার্থী দুজনেই নির্বাচন কমিশনের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেন। একটি দল থেকে দুইজন মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করায় নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে দুইজনের মনোনয়ন ফরম বাতিল করে দেওয়া হয়। কামরুলের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহের দলীয় কার্যালয়ের ভিন্ন ঠিকানা ও প্যাড ব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়। এ ছাড়া কামরুল ইসলামের সঙ্গে গণতন্ত্রী পার্টির কোনো সম্পর্ক নেই বলেও দাবি করেন সাধারণ সম্পাদক।
এ প্রসঙ্গে গণতন্ত্রী পার্টির সাধারণ সম্পাদক শাহাদাত হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, অভিযুক্তরা বহুদিন ধরেই সংগঠনবিরোধী কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত। তারা উপদলীয় চক্রান্ত করে এই রাজনৈতিক দলের সুনাম ও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে। গঠনতন্ত্র পরিপন্থি কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক থেকে অভিযুক্ত তিন নেতাকে পার্টির পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এই তিন নেতা পার্টির মধ্যে ভাঙন সৃষ্টি করার জন্য অনেক দিন ধরেই চক্রান্ত চালিয়ে আসছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
সংগঠনের সভাপতি ব্যারিস্টার আরশ আলী জানান, সংগঠনের কারও সঙ্গে আলোচনা না করে ঢাকা-১৭ আসনের উপনির্বাচনে অশোক ধরকে প্রার্থী করা হয়। অন্যদিকে তিনি সংগঠনের সবার সঙ্গে আলোচনা করে মোহাম্মদ কামরুল ইসলামকে প্রার্থী হিসেবে ওই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য মনোনয়ন দেন। একই সংগঠনের দুইজন প্রার্থী থাকায় তাদের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়। গঠনতন্ত্র ও সাংবিধানিকভাবে তিনিই প্রার্থী মনোনীত করতে পারেন। সাধারণ সম্পাদকের প্রার্থীর মনোনয়ন দেওয়ার এখতিয়ার নেই। এ জন্য ২৭ জুন সম্পূর্ণ অনৈতিক, অগণতান্ত্রিক ও অগঠনতান্ত্রিকভাবে তথাকথিত একটি মিটিং ডেকে সভাপতি, দুইজন সিনিয়র প্রেসিডিয়াম সদস্যকে বহিষ্কার করা হয়। বিষয়টি একাধিক গণমাধ্যমেও এসেছে।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত শনিবার বিকালে গণতন্ত্রী পার্টির বৈঠকে সবার সম্মতিক্রমে পার্টির সাধারণ সম্পাদক ডা. শাহাদাত হোসেন এবং কথিত ভারপ্রাপ্ত সভাপতি প্রকৌশলী কামরুল আহসান খান পারভেজকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। একই সঙ্গে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে অ্যাডভোকেট ভূপেন্দ্র ভৌমিক দোলনকে।
গণতন্ত্রী পার্টির একটি সূত্রে জানা গেছে, সম্মেলন না দিয়ে পদ কুক্ষিগত করে রাখার জন্য ডা. শাহাদাত হোসেন দলের মধ্যে নানাবিধ চক্রান্ত শুরু করেছেন এমন তথ্য আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ও ১৪-দলীয় জোটের সমন্বয়ক ও মুখপাত্র আমির হোসেন আমুকে অবহিত করা হয়েছে। সব পক্ষকে নিয়ে বসে সমস্যার সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে।
এর আগে অ্যাডভোকেট ভূপেন্দ্র ভৌমিক দোলন ঈদের পরেই সংগঠনের সভাপতি কেন্দ্রীয় কমিটির জরুরি বৈঠক দেখে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানিয়েছিলেন। তিনি দলের সভাপতি ও দলের দুইজন সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যকে কারণ দর্শানোর নোটিস না দিয়ে সরাসরি বহিষ্কার করার এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এজন্য সাধারণ সম্পাদকসহ জড়িতদের বিষয়ে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বৈঠক ডাকা হবে বলেও জানান তিনি।