শহিদুল ইসলাম রাজী
প্রকাশ : ০৩ জুলাই ২০২৩ ১০:০৬ এএম
প্রতীকী ছবি
ক্রমেই ভয়ংকর হয়ে উঠছে ভোরের ঢাকা। মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত ঢাকার রাস্তায় বেপরোয়া হয়ে উঠছে ছিনতাইকারী চক্র। তাদের হাতে প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ। রেহাই পাচ্ছেন না পুলিশ সদস্যরাও। নানা কারণে যারা এই সময়ে চলাচল করেন, বিশেষ করে যারা ঢাকায় ফেরেন বা ঢাকার বাইরে যাওয়ার উদ্দেশে রাস্তায় বের হন তারা জীবনের ঝুঁকিতে থাকেন সবচেয়ে বেশি। তাদের টার্গেট করে ছিনতাইকারীরা।
এ ছাড়া নির্জন গলিতে ধারালো অস্ত্র বা আগ্নেয়াস্ত্র ঠেকিয়ে পথচারীদের টাকা, মোবাইল ফোন, স্বর্ণালংকার ও দামি বস্তু ছিনিয়ে নিচ্ছে এসব চক্র। আবার প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেলে করে এসে পথরোধ করে করছে ছিনতাই। কেউ প্রতিবাদ করারও সাহস পায় না। কেউ সাহস দেখালে তাদের ওপরেও চালানো হয় হামলা। ফলে ঘটছে প্রাণহানি। দিন দিন রাজধানীর সড়ক ও গলিপথগুলো হয়ে উঠেছে ছিনতাইকারীদের অভয়ারণ্য। মাদকসেবী আর ছিনতাইকারীদের দখলে চলে যায় ভোরের ঢাকা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা নানা পদক্ষেপ নিলেও কার্যত সুফল মিলছে না।
র্যাব ও পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, নগরীতে ছিনতাইরোধে নিয়মিতই অভিযান চালানো হচ্ছে। এরপরও কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটছে। প্রায় প্রতিদিনই র্যাব-পুলিশের অভিযানে ধরা পড়ছে ছিনতাইকারীরা। তবে রাতে চলাচল নির্বিঘ্ন করতে এবং ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা ঠেকাতে কাজ চলছে বলেও জানিয়েছেন তারা।
জানা গেছে, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তালিকায় ১ হাজার ৭৩৭ ব্যক্তি ছিনতাই-সংক্রান্ত অপরাধের সঙ্গে যুক্ত। ডিএমপিতে সবচেয়ে বেশি তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারী আছে তেজগাঁও বিভাগে। আর সবচেয়ে কম মিরপুর বিভাগে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভোরের যাত্রীদের একটি বড় অংশ ছিনতাইয়ের শিকার হন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ছেড়ে আসা বাস, লঞ্চ ও ট্রেন ভোরের দিকে রাজধানীতে যাত্রীদের নামিয়ে দেয়। স্টেশনে নেমে নির্দিষ্ট গন্তব্যে যাওয়ার পথে বিভিন্ন সময় ছিনতাইকারীদের শিকারে পরিণত হন সাধারণ যাত্রীরা। কিছু ক্ষেত্রে ছিনতাইয়ে জড়িতরা গ্রেপ্তার হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে।
ডিএমপির তথ্যভান্ডার থেকে আরও জানা গেছে, থানা হিসেবে ছিনতাইকারীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ভাটারা, শাহবাগ ও শেরেবাংলা নগর এলাকায়। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে হাজারীবাগ, মোহাম্মদপুর, বিমানবন্দর, খিলক্ষেত, তেজগাঁও, রমনা, হাতিরঝিল ও উত্তরা পশ্চিম থানা এলাকায়।
গত শনিবারই ভোরের ঢাকায় ছিনতাইকারীদের হাতে প্রাণ হারান ট্রাফিক কনস্টেবল মনিরুজ্জামান। পরিবারের সঙ্গ ঈদের ছুটি কাটিয়ে শনিবার ভোরে তেজগাঁও রেলস্টেশনে নামেন তিনি। হেঁটে তেজগাঁও ট্রাফিক পুলিশের অফিসে যাওয়ার পথে ফার্মগেটের সেজান পয়েন্টের সামনে দুর্বৃত্তের ছুরিকাঘাতে নিহত হন তিনি। সিসি ক্যামেরার ফুটেজের সূত্র ধরে পুলিশ জানায়, শনিবার ভোর ৪টা ১৫ মিনিটের দিকে হত্যার এ ঘটনা ঘটে। দুই ব্যক্তি কনস্টেবল মনিরুজ্জামানকে ঘিরে ধরে। তার কাছে থাকা মালামাল নিতে গেলে তিনি বাধা দেন। এ সময় ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে তার বুকে ও পিঠে ছুরিকাঘাত করে চলে যায় দুর্বৃত্তরা।
গত বৃহস্পতিবার ঈদের দিন রাত আড়াইটার দিকে অফিস থেকে হেঁটে রামপুরার উলন রোডের বাসায় ফিরছিলেন ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের প্রযোজনা সহকারী রাকিবুল হাসান রানা। সঙ্গে ছিলেন এলাকারই মোহন নামে আরেক যুবক। রামপুরা বিটিভি অফিসের সামনের রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় একটি মোটরসাইকেলে তিন ছিনতাইকারী এসে তাদের পথরোধ করে। তাদের দুজনকে দুই পাশে নিয়ে ধারালো অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে সবকিছু হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। ভয়ে মোহন তার সঙ্গে থাকা মানিব্যাগ ও মোবাইল ফোন দিয়ে দেন। তবে রানা প্রতিবাদ করেন। তখন ছিনতাইকারীরা চাপাতি দিয়ে রানার মাথায় ৩টি আঘাত করে। দুই হাতে ও পায়ে আঘাত করে পালিয়ে যায়। আহত রানাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে পঙ্গু হাসপাতালে নেওয়া হয়।
গত ২০ জুন মঙ্গলবার ভোররাতে রাজধানীর মিরপুরের ১৪ নম্বর সেকশনে ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে মারা যান রাইড শেয়ারিং (পাঠাও) চালক সুরুজ আলী। ছিনতাইকারীরা তার মোটরসাইকেল ছিনিয়ে নিতে পেটে ছুরিকাঘাত করে। পরে লোকজনের উপস্থিতি টের পেয়ে তারা মোটরসাইকেল রেখে পালিয়ে যায়।
এর আগে গত ১২ মে ভোরে দুর্বৃত্তদের কবলে পড়েন পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) নারী কনস্টেবল নার্গিস আক্তার। দুর্বৃত্তরা রিকশা থামিয়ে তার কাছ থেকে সোনার চেইন, নগদ টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে যায়।
রাজধানীতে ছিনতাইকারীদের অপ্রতিরোধ্য তৎপরতা সম্পর্কে জানতে চাইলে ডিএমপি কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক বলেন, রাতের শেষভাগে দুর্বৃত্তরা ঢাকায় ছিনতাই করে থাকে। এমনিতেই রাতে ঢাকা শহর ফাঁকা হয়ে যায়। রাত ২টার পর রাস্তা আরও অনেক ফাঁকা থাকে। এ সময় ছিনতাইকারীরা তৎপর হয়। কীভাবে পুলিশি কার্যক্রম আরও বাড়ানো যায়, সে বিষয়গুলো নিয়ে কাজ চলছে। তিনি আরও বলেন, যেসব ছিনতাইকারী শেষ রাতকে ছিনতাইয়ের সময় হিসেবে বেছে নেয়, তারা আর সেটা পারবে না। ছুরিকাঘাতে পুলিশ সদস্য নিহতের যে ঘটনাটা ঘটেছে, সেটা নিয়েও কাজ চলছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
র্যাব-৩-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আরিফ মহিউদ্দিন আহমেদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, গত ছয় মাসে তারা ৫৯ জন ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় এনেছেন। ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চলমান রয়েছে। টহল কার্যক্রম বাড়ানো হয়েছে। র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈনও ছিনতাইকারীদের প্রতিরোধে টহল বাড়ানোর তথ্য জানিয়েছেন।