× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

আঞ্চলিক সড়কেই দুর্ঘটনা বেশি

শহিদুল ইসলাম রাজী

প্রকাশ : ২৫ জুন ২০২৩ ১১:৪৩ এএম

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

দেশের মহাসড়কের তুলনায় আঞ্চলিক সড়কগুলোতে দুর্ঘটনা বাড়ছে। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে এসব সড়ক। চলতি বছরের গত কয়েক মাসের সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দুর্ঘটনার প্রায় ৪১ শতাংশই ঘটেছে আঞ্চলিক সড়কে। আর বাকি ৫৯ শতাংশ ঘটছে জাতীয় মহাসড়ক, গ্রামীণ ও শহরের সড়কে।

আগে আঞ্চলিক সড়কে এত দুর্ঘটনা ঘটত না। আঞ্চলিক সড়কে দুর্ঘটনা রোধে এবং সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে নানান পদক্ষেপ নিচ্ছে পুলিশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চাহিদার সঙ্গে মিল রেখে সমন্বিত উন্নয়নের ঘাটতির ফলে আঞ্চলিক সড়কে সমস্যা হচ্ছে। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, মহাসড়কে কিছুটা হলেও পুলিশের তদারকি আছে। এখানে সতর্কতার সঙ্গে চলাফেরা করা হয়। কিন্তু আঞ্চলিক সড়কে পুলিশ থাকে না তাই কোনো নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি নাই। ফলে আঞ্চলিক সড়কগুলোতে দুর্ঘটনা ক্রমাগতভাবে বাড়ছে। 

সড়কের নিরাপত্তা ও দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের গত চার মাসের প্রতিবেদন পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত ফেব্রুয়ারিতে দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৪৩৯টি। এতে নিহত হয়েছেন ৪৮৭ জন এবং আহত হয়েছেন ৭১২ জন।

দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে ১৬৮টি অর্থাৎ ৩৮ দশমিক ২৬ শতাংশ মহাসড়কে, ১৭৭টি তথা ৪০ দশমিক ৩১ শতাংশ আঞ্চলিক সড়কে, ৬১টি (১৩ দশমিক ৮৯ শতাংশ) গ্রামীণ সড়কে, ২৯টি (৬ দশমিক ৬০ শতাংশ) শহরের সড়কে এবং অন্যান্য স্থানে ৪টি (শূন্য দশমিক ৯১ শতাংশ) সংঘটিত হয়েছে। গত মার্চে দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৪৮৬টি। এতে ৫৬৪ জন নিহত এবং আহত হয়েছেন ১ হাজার ৯৭ জন। দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে ৩৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে, ৪০ দশমিক ৫৩ শতাংশ আঞ্চলিক সড়কে, ১২ দশমিক ১৩ শতাংশ গ্রামীণ সড়কে, ৮ দশমিক ৮৪ শতাংশ শহরের সড়কে এবং অন্যান্য স্থানে শূন্য দশমিক ৬১ শতাংশ সংঘটিত হয়েছে। এ ছাড়া গত এপ্রিলে দুর্ঘটনা ঘটেছে ৪৩১টি। এতে নিহত হয়েছেন ৪৯৭ এবং আহত হয়েছেন ৭৭৮ জন। দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে ৩৬ দশমিক ৮৯ শতাংশ মহাসড়কে, ৩৭ দশমিক ১২ শতাংশ আঞ্চলিক সড়কে, ১৬ দশমিক ৪৭ শতাংশ গ্রামীণ সড়কে, ৮ দশমিক ৮১ শতাংশ শহরের সড়কে এবং অন্যান্য স্থানে শূন্য দশমিক ৬৯ শতাংশ সংঘটিত হয়েছে।

এদিকে গত মে মাসে দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৪৯১টি। এতে নিহত হয়েছেন ৪০৮ জন এবং আহত হয়েছেন ৬৩১ জন। দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে ৩৩ দশমিক ৬০ শতাংশ মহাসড়কে, ৪০ দশমিক ৯৩ শতাংশ আঞ্চলিক সড়কে, ১৪ দশমিক ৮৬ শতাংশ গ্রামীণ সড়কে, ৯ দশমিক ৭৭ শতাংশ শহরের সড়কে এবং অন্যান্য স্থানে শূন্য দশমিক ৮১ শতাংশ সংঘটিত হয়েছে।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির দুর্ঘটনা মনিটরিং সেলের বার্ষিক দুর্ঘটনা পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার এলাকা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২২ সালে মোট সংঘটিত দুর্ঘটনার ২৭ দশমিক ৭০ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে, ৫২ দশমিক ২ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে সংঘটিত হয়েছে। এ ছাড়া সারা দেশে সংঘটিত মোট দুর্ঘটনার ৫ দশমিক ৬৭ শতাংশ ঢাকা মহানগরীতে, ১ দশমিক ৭১ শতাংশ চট্টগ্রাম মহানগরীতে, শূন্য দশমিক ৯৯ শতাংশ লেভেল ক্রসিংয়ে সংঘটিত হয়েছে।

হাইওয়ে পুলিশের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত বছর মহাসড়কে ২ হাজার ২৯৩টি দুর্ঘটনা ঘটে। এতে নিহত হয়েছেন ১ হাজার ৮৫৩ জন এবং আহত হয়েছেন ২ হাজার ১৩০ জন। চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে মহাসড়কে দুর্ঘটনা ঘটেছে ২৪৯টি। এতে নিহত হয়েছেন ২৫৪ জন এবং আহত হয়েছেন ২৬২ জন। দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণ করে হাইওয়ে পুলিশ জানায়, দুর্ঘটনার মধ্যে ৬৫৯টি পেছন থেকে ধাক্কা দেওয়া, মুখোমুখি সংঘর্ষ ৩৩৫টি, পথচারীকে চাপা বা ধাক্কা দেওয়া ৫৮২টি এবং নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ৩০১টি দুর্ঘটনা ঘটে। 

দুর্ঘটনায় যানবাহনের ধরন সম্পর্কে বলা হয়, দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহনের সংখ্যা ২ হাজার ৭৬৫টি। এর মধ্যে ৭৬২টি ট্রাক/কাভার্ড ভ্যান, ৩৪৬টি থ্রি-হুইলার, ৫৫৩টি মোটরসাইকেল, ৪৯৩টি পিকআপ/মাইক্রোবাস, ৬১১টি বাস। 

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, হাইওয়ে ও আঞ্চলিক সড়কে দুর্ঘটনার ধরন আলাদা। হাইওয়েতে পণ্যবাহী যানবাহনের সঙ্গে অটোরিকশা বা থ্রি-হুইলারের দুর্ঘটনা ঘটছে বেশি। আঞ্চলিক সড়কগুলোতে দুর্ঘটনার বেশি হচ্ছে। মহাসড়কে কিছুটা হলেও পুলিশের তদারকি আছে। এখানে সতর্কতার সঙ্গে চলাফেরা করা হয়। কিন্তু আঞ্চলিক সড়কে পুলিশ থাকে না, তাই কোনো নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি নাই। ওখানে ট্রাফিক আইনের ন্যূনতম বালাই নাই। যে কারণে মোটরসাইকেলগুলো দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হচ্ছে। সেখানে অধিকাংশ যানবাহনের ফিটনেস নাই, রুট পারমিট নাই, চালকদের প্রশিক্ষণ নাই। বালু-ইটবাহী গাড়ি, নছিমনগুলোর বেশিরভাগই শ্রমিকরা চালান, যারা কিছু গাড়িতে থেকে চালক হয়ে যান। এ কারণে আঞ্চলিক সড়কে দুর্ঘটনা ঘটছে। 

সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাসে তিন পরিকল্পনা পুলিশের

সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে তিন ধরনের পরিকল্পনা নিয়েছে পুলিশ। স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি। স্বল্পমেয়াদির মধ্যে রয়েছে, সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮-এর যথাযথ প্রয়োগ, মহাসড়কে থ্রি-হুইলার চলাচল বন্ধ করা, অবৈধ স্থাপনা অপসারণ, সাইন সিগন্যাল মেরামত ও সংস্কার। পর্যাপ্ত পুলিশ টহল নিশ্চিতকরণ, সর্বস্তরের জনসাধারণের সচেতনতামূলক কার্যক্রম, সেফটি অডিট। মধ্যমেয়াদির মধ্যে রয়েছে, ড্রাইভার ও স্টাফদের বিশ্রামের ব্যবস্থা, চালকের কর্মঘণ্টা নির্ধারণ ইত্যাদি। দীর্ঘমেয়াদির মধ্যে রয়েছে, পর্যাপ্ত সার্ভিস লেন, নিরবচ্ছিন্ন যান চলাচলের জন্য আন্ডারপাস, ওভারপাস, ইউলুপ, সাইডলুপ, পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি মহাসড়ক সিসিটিভির আওতায় আনা।

সংশ্লিষ্টরা যা বলছেন 

সড়ক দুর্ঘটনারোধে সড়ক পরিবহন আইনের বাস্তবায়ন করতে হবে- এর কোনো বিকল্প নেই উল্লেখ করে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, ‘আমরা এখনও শুরুই করতে পারিনি। মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়িগুলো তুলে নিতে হবে। চালক তৈরির প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। কিন্তু এই বিষয়গুলো একটা চক্রের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। যখনই কোনো বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে, তখন একটা কমিটি হয়। এই কমিটি একটি সুপারিশ তৈরি করে। পরে এই সুপারিশ আর বাস্তবায়ন হয় না।’ 

তিনি বলেন, দেশে নিরাপদ সড়কব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার বিষয়টি সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর অনেকটা নির্ভর করছে। সরকার যদি শুধু কমিটি গঠন ও সুপারিশমালা তৈরির চক্র থেকে বেরিয়ে একটি টেকসই গণপরিবহনকৌশল প্রণয়ন করে বাস্তবায়ন করতে পারে, তাহলেই দেশে নিরাপদ সড়কব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা হবে।

হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি (অপারেশনস) মো. মোজাম্মেল হক বলেন, ‘অঞ্চলিক সড়কের দেখভাল সংশ্লিষ্ট জেলা পুলিশ করে থাকে। আমরা হাইওয়ে পুলিশ মহাসড়কে শৃঙ্খলা রক্ষা এবং দুর্ঘটনারোধে ঝুঁকিপূর্ণ মালামাল পরিবহন নিয়ন্ত্রণ; ফিটনেসবিহীন যানবাহন নিয়ন্ত্রণ; ওভার ওয়েট যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণসহ বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।’ 

বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক হাদিউজ্জামান বলেন, ‘আসলে উন্নয়নটা হতে হবে সমন্বিত। আমরা জাতীয় মহাসড়কগুলো যেমন চওড়া করছি, সেটার সঙ্গে মিল রেখে আঞ্চলিক সড়কগুলোকেও ঢেলে সাজাতে হবে। আমাদের আঞ্চলিক সড়কে অনেক সমস্যা রয়েছে। একটা প্রশস্তকরণের ঘাটতির পাশাপাশি বাঁকগুলো এখনও সরলীকরণ করা হয়নি। জাতীয় মহাসড়কে যানবাহনের চাহিদা বেড়ে গেছে। এই যানবহন শেষ পর্যায়ে গিয়ে আঞ্চলিক সড়ক ব্যবহার করে। এই চাহিদার সঙ্গে মিল রেখে সমন্বিত উন্নয়নের ঘাটতির ফলে সমস্যা হচ্ছে। পাশাপাশি আঞ্চলিক সড়কে আনফিট এবং অনানুষ্ঠানিক যানবাহনগুলোর দৌরাত্ম্য দিন দিন বাড়ছে, যার জন্য দুর্ঘটনা বাড়ছে। এ ছাড়া চাহিদার সঙ্গে আমরা ওইভাবে চালক তৈরি করতে পারছি না। বিশেষ করে আমাদের অনানুষ্ঠানিক যানবাহনের চালক যাদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স নেই। অর্থাৎ সড়কের সক্ষমতার ঘাটতি এবং চালকের ঘাটতি সবকিছু মিলিয়ে আঞ্চলিক সড়ক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দিন দিন বাড়ছে দুর্ঘটনা।’ 

তিনি বলেন, জাতীয় মহাসড়কে চার লেন, ছয় লেন করে ডিভাইডার বানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে দুর্ঘটনা কমবে। এই দুর্ঘটনা গিয়ে ঘটবে আঞ্চলিক সড়কে। কারণ আঞ্চলিক সড়কে গিয়ে ডিভাইডার পাচ্ছেন না চালকরা। 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা