প্রতিদিনের বাংলাদেশকে সৈয়দ আবুল হোসেন
সৈয়দ ঋয়াদ
প্রকাশ : ২৫ জুন ২০২৩ ১০:১৬ এএম
আপডেট : ২৫ জুন ২০২৩ ১০:১৮ এএম
সৈয়দ আবুল হোসেন।
কল্পিত দুর্নীতির অভিযোগে ২০১২ সালের ৩০ জুন পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে বিশ্বব্যাংক সরে যায়। প্রকল্পের প্রস্তাবিত ১৯০ কোটি ডলার ঋণ সহায়তার মধ্যে বিশ্বব্যাংকের দেওয়ার কথা ছিল ১২০ কোটি। এর বাইরে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ৬১ কোটি ডলার এবং জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) ১৪ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার কথা ছিল। লিড ডোনার বিশ্বব্যাংক সরে যাওয়ায় এডিবি এবং জাইকাও সরে যায়। ওই সময় থেকে ২০১৪ পর্যন্ত বাংলাদেশে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির অভিযোগ।
সেতু উদ্বোধনের এক বছর পূর্ণ হলেও সেই আলোচনা এখনও রয়েছে। তবে এখন সেই আলোচনা হয় ভিন্নভাবে। কীভাবে কল্পিত অভিযোগ তুলে বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের কোনো দেশকে পিছিয়ে দিতে বিশ্ব মোড়লরা চেষ্টা করে সেই আলোচনাই চলে সবকিছু ছাপিয়ে। একই সঙ্গে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়েছিল, বিশ্বব্যাংক কি তাদের সম্মান ফিরিয়ে দেওয়ার কোনো আগ্রহ দেখিয়েছে- এমন প্রশ্ন তোলা হচ্ছে।
দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে পদত্যাগ করতে হয়। সরকার সেতু প্রকল্পের পরামর্শকের দায়িত্ব থেকে অপসারণ করে সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরীকে। সেই সময়ে কানাডিয়ান প্রতিষ্ঠান এসএনসি লাভালিনকে পদ্মা সেতুর পরামর্শকের কাজ পাইয়ে দিতে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগে বিশ্বব্যাংকের চাপে সেতু বিভাগের সচিবসহ সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। সেই মামলায় গ্রেপ্তার হন সেতু বিভাগের সাবেক সচিব মোশাররফ হোসেন ভূ্ঁইয়া।
পরে কানাডার আদালতে হওয়া একটি মামলায় প্রমাণিত হয় পদ্মা সেতু প্রকল্পে কোনো দুর্নীতি হয়নি। সৈয়দ আবুল হোসেন, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী, সেতু সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়াসহ বাকি অভিযুক্তরা নির্দোষ প্রমাণিত হন। তাদের বিরুদ্ধে আদালতে যে অভিযোগ তোলা হয় সেটিকে ‘মিথ্যা’ আখ্যা দেন কানাডার আদালত। পদ্মা সেতুর বর্ষপূর্তির এ আয়োজনে সাবেক মন্ত্রী আবুল হোসেন এবং আবুল হাসানের সঙ্গে কথা বলে প্রতিদিনের বাংলাদেশ।
সৈয়দ আবুল হোসেন বলেন, ‘পদ্মা সেতু নিয়ে আমার ওপরে যে ঝড় আসলো, কারা ঝড় আনল, কারা লিখল, কে আলোচনা করল এসব তো সামনে আসল না। ২০১৩ তে পদ্মা সেতু চালু হওয়ার কথা। সেটা কত বছর পিছিয়ে গেল? দেশের ক্ষতি হলো, অর্থনীতির ক্ষতি হলো, এটার ব্যাপারে কী বলব? আমার বলার কিছু নেই। আমার সম্পর্কে এত লিখছে, এত কার্টুন বানাইছে, কিন্তু আমি কখনও কারও সম্পর্কে একটা বিরূপ মন্তব্য করেছি? করিনি তো। রবার্ট জুলিখের বিরুদ্ধে মানহানি মামলা করতে আমাকে কত লোক প্ররোচিত করেছে! রবার্ট জুলিখ আমার কাছে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন। এদেশের সমস্ত সাংবাদিক-সংবাদপত্রের পক্ষে ক্ষমা চাইছেন নাঈমুল ইসলাম খান। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ষড়যন্ত্র কারা করেছে, কোন কোন সম্পাদক গিয়ে দেখা করেছেন, কোন কোন ব্যারিস্টার দেখা করছেন- এগুলো খুঁজে বের করেন।’
তিনি বলেন, ‘আমার এলাকায় আমি নিজ খরচে ১৫০টা প্রাইমারি স্কুল করেছি। সব সরকারি হয়েছে। ভারতের বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমাকে বলা হয়েছে সৈয়দ আবুল হোসেন বাংলাদেশের বিদ্যাসাগর। এখন দেশে-বিদেশে সব জায়গায় সম্মান পাইতেছি। কিন্তু দুঃখের বিষয় যেটা হয়ে গেছে, সামাজিকভাবে কত অপদস্ত হয়েছি! পারিবারিকভাবে অপদস্ত হয়েছি! আমার একটা মেয়ে আমেরিকার স্মিথ কলেজের অধ্যাপক। যেখানে লারা বুশ এবং তার মেয়ে পড়াশোনা করেছে। আমার মেয়েরাও আমার কারণে বিব্রত হয়েছে। কারণ তাদের বাবার সম্পর্কে যা-তা লেখা হয়। আমাকে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বলেছেন, অনেক ইনোসেন্ট মানুষও ভিকটিমাইজড হয়ে যায়। তবে তিনি যে ইনোসেন্ট সেটা জীবদ্দশায় দেখে যেতে পারেন না, আপনার সেই সৌভাগ্য হয়েছে। আপনি যে নির্দোষ সেটা দেখে গেলেন। কানাডিয়ান আদালতে যখন দুর্নীতির অভিযোগ থেকে আমরা নির্দোষ প্রমাণিত হলাম, তখন অনেকেই আমার পুনরায় মন্ত্রিত্ব ফিরিয়ে দেওয়ার কথা বলেছেন। তাদের মধ্যে সাবেক রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরী, হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদসহ অনেকেই আছেন। আমি তাদের কাছে কৃতজ্ঞ।’
পদ্মা সেতুর বর্ষপূর্তিতে নিজের অনুভূতি জানিয়ে সৈয়দ আবুল হোসেন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তো দেশ, দেশের মানুষ এবং পৃথিবীকে দেখিয়ে দিয়েছেন। আমি সংসদ সদস্য নই। আমি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যও নই। তারপরও তিনি আমাকে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে নিয়ে গেছেন। তার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। এত বিরোধিতার পরও প্রধানমন্ত্রী তো দেশের মানুষকে দেখিয়ে দিয়েছেন। আজকে পদ্মা সেতু হয়েছে, পদ্মা সেতু প্রকল্পে কোনো দুর্নীতি ছিল না প্রমাণিত হয়েছে। এর চেয়ে ভালো লাগার কী হতে পারে? সর্বোচ্চ অপদস্ত হওয়ার পর নির্দোষ প্রমাণিত হলে সেই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।’
আবুল হাসান চৌধুরী
সেতু প্রকল্পে পরামর্শকের দায়িত্ব থেকে অপসারণ করা হয় সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরীকেও। আবুল হাসান চৌধুরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘পদ্মা সেতু তৈরির ঊষালগ্নেই যে ষড়যন্ত্র হয়েছিল এর জন্য আমিসহ অনেককেই অপদস্ত হতে হয়েছে। বিশ্বব্যাংকসহ দাতাগোষ্ঠী পদ্মা সেতুতে অর্থলগ্নি করতে অস্বীকৃতি জানায়। কিন্তু পদ্মা সেতুর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী এত বেশি দৃঢ়তা পোষণ করেছেন যে, দেশের সবচেয়ে বড় অবকাঠামোটি নির্মাণের দুঃসাহসিক চ্যালেঞ্জ তিনি নিয়েছেন এবং সেটা নিজস্ব অর্থায়নে। অনেকেই যখন পদ্মা সেতু হবে না বলে ভেবে নিয়েছেন ঠিক তখন পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়ন করে বিশ্ববাসীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। পদ্মা সেতু বাংলাদেশকে অনেকদূর এগিয়ে নিয়ে যাবে। দেশের এক-তৃতীয়াংশ এলাকাকে পদ্মা সেতু সড়কপথে যুক্ত করেছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পদ্মা সেতু বড় ভূমিকা রেখে চলেছে। যে যা-ই বলুক, এত বড় অবকাঠামো নির্মাণের পর বাংলাদেশ তার যে সামর্থ্যের পরিচয় দিয়েছে, এটা কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। পদ্মা সেতু নির্মাণে প্রধানমন্ত্রীসহ যারা ভূমিকা রেখেছেন তাদের প্রত্যেকের প্রতি আমার বিনম্র শ্রদ্ধা। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে তারা একটি অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখিয়েছেন। আজকের দিন শুধু আমার জন্য না, পুরো বাংলাদেশের জন্য গর্বের দিন।’