সাক্ষাৎকার
ফাল্গুনী রানী চক্রবর্তী
প্রকাশ : ২১ জুন ২০২৩ ০৯:০৫ এএম
নির্মলেন্দু গুণ।
কবিতায় এবং যাপনে কিংবদন্তিতে পরিণত হয়ে ওঠা নির্মলেন্দু গুণ আজ ২১ জুন ৭৮ বছরে পদার্পণ করলেন।
তাঁর জন্মদিনকে স্মরণে রেখে ড. ফাল্গুনী রানী চক্রবর্তীর নেওয়া একটি সাক্ষাৎকার এখানে পত্রস্থ হলো। সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী ড. ফাল্গুনী রানী চক্রবর্তী কবির ওপর একটি এমফিল অভিসন্দর্ভও রচনা করেছেন-
মার্ক্সবাদ আপনাকে কবে প্রথম প্রভাবিত করে, এমন কী ঘটনা আছে যা আপনাকে মার্ক্সবাদে উদ্বুদ্ধ করেছে?
নির্মলেন্দু গুণ : মার্ক্সবাদকে যদি তুলনামূলকভাবে বৈষম্যহীন সাম্যবাদী দর্শনের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করি, তাহলে বলতে পারি প্রতিটি মানুষই জন্মগতভাবে মার্ক্সবাদী। মানুষ সাম্যবাদী হিসেবেই জন্মগ্রহণ করে। ফরাসি দার্শনিক-লেখক রুশো বলেছিলেন, মানুষ মুক্ত হয়েই জন্মগ্রহণ করে, পরে সমাজ তার হাতে-পায়ে শৃঙ্খল পরিয়ে দেয়। আমার বেলাতেও এমনটিই ঘটেছে। আমি গ্রামে জন্মেছি। গ্রামের মানুষের মধ্যেই আমি বড় হয়েছি। আমার বাবা আমাকে খুব কষ্ট করে পড়াশোনা করিয়েছেন। ‘আমার ছেলেবেলা’ বইতে আমি আমার শৈশব ও পারিবারিক জীবন সম্পর্কে লিখেছি। চারপাশে দুঃখী, দরিদ্র ও সংগ্রামী মানুষের কাছ থেকেই আমি সাম্যবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিলাম। পরে জেনেছি, আমার ওই রকমের চিন্তাভাবনা মার্ক্সবাদী চিন্তার কাছাকাছি। সঠিক দিনক্ষণ হিসাব করে বলা কঠিন হবে- কবে, কীভাবে আমি মার্ক্সবাদে আস্থাশীল হয়েছিলাম। তবে এ প্রসঙ্গে একজনের কথা বলতে পারি, তিনি হচ্ছেন আমার স্কুলজীবনের শিক্ষক প্রখ্যাত মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক অধ্যাপক যতীন সরকার। তাঁর কাছ থেকেই আমি মার্ক্সবাদ সম্পর্কে প্রাথমিকভাবে কিছুটা আবছা ধারণা পাই। পরবর্তীকালেও তাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্ক বজায় থাকে। ১৯৭৯-১৮৮৪ পর্যন্ত আমি ময়মনসিংহে কাটিয়েছি। তখন আমি তাঁর নিবিড় সান্নিধ্য লাভ করি এবং তাঁর মাধ্যমেই কমিউনিস্ট পার্টির রাজনৈতিক কার্যক্রমের সঙ্গেও আমি কিছুটা যুক্ত হই।
লেনিনের প্রতিই বা আগ্রহ জন্মাল কখন, কীভাবে?
নির্মলেন্দু গুণ : আমি খুব ছোটবেলায় বিভিন্ন বড় বড় মনীষীর জীবনী পাঠ করেছি। তাঁদের মধ্যে লেনিন আমাকে খুবই আকর্ষণ করেন। তিনি রুশ বিপ্লব কীভাবে করেছিলেন, সে সম্পর্কে জেনে আমি তাঁর প্রতি খুবই আকৃষ্ট বোধ করি। আমার ‘হুলিয়া’ কবিতায় তার উল্লেখ রয়েছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় সেই লেনিনের দেশ সোভিয়েত ইউনিয়ন আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল। সাহায্য করেছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের সাহায্য ও সমর্থন ছাড়া আমাদের পক্ষে জয়ী হওয়া সম্ভব ছিল না। ভারত আমাদের শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়েছিল, আমাদের সমর্থন দিয়েছিল, অস্ত্র দিয়েছিল; কিন্তু ভারতের পেছনে ছিল পরাশক্তি লেনিনের দেশ সোভিয়েত ইউনিয়ন। আমাদের জন্য জাতিসংঘে তারা তিন-তিনবার ভেটোও দিয়েছিল।
লেনিনকে নিয়ে লেখা সুকান্তর কবিতাটি ছিল আমার খুব প্রিয়। তারপর লেনিনকে নিয়ে আর কোনো ভালো কবিতা রচিত হয়নি। ১৯৮০ সালে আমি ময়মনসিংহে থাকার সময় লেনিনকে নিয়ে কবিতা লিখি- ‘লেনিন বন্দনা’। কবিতাটি আমার ‘চাষাভূষার কাব্য’ বইটিতে আছে।
ওই কবিতার সুবাদেই আমি ১৯৮২ সালে লেনিনের দেশে ভ্রমণের সুযোগ পাই। একই সঙ্গে আমি ভিয়েতনাম ও কাম্পুচিয়াতেও যাই। এই ভ্রমণটি আমাকে বহির্বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার প্রথম সুযোগ দেয়। ফিরে এসে আমি লেনিনকে নিয়ে আরও কিছু কবিতা লিখি। মার্ক্সবাদী তত্ত্বগুলোকে সহজবোধ্য করে আমি পদ্য রচনা করি। নাম রাখি ইস্ক্রা। এখন সেই সোভিয়েত আর নেই। লেনিনের কদরও কমে গেছে। কিন্তু আমি তাঁকে আজও ভালোবাসি। প্রাসঙ্গিক বলে বিবেচনা করি।
ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো সম্পর্কে কিছু বলবেন?
নির্মলেন্দু গুণ : সামান্য ধারণাই দিতে হবে, কেননা আমি তাঁর বিষয়ে খুব বেশি জানি না। শুধু জানি যে আর্জেন্টিনার এই কাব্যামোদী বিদুষী মহিলাটি আমাদের পরম প্রিয় কবি রবীন্দ্রনাথের খুব ঘনিষ্ঠজন ছিলেন। রবীন্দ্রনাথকে তিনি ভালোবাসতেন, শ্রদ্ধা করতেন। তিনি বিশ্বকবিকে তাঁর কাছে টানতে সমর্থ হয়েছিলেন। কবিগুরু তাঁর প্রতিকৃতি এঁকেছিলেন এবং তাঁকে একটি কবিতার বই উৎসর্গ করেছিলেন। ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর বাংলা নাম রেখেছিলেনÑ বিজয়া। সেই কারণে আমি ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর প্রতি খুব শ্রদ্ধাশীল।
বর্তমান বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থায় আপনার চিন্তা কী?
নির্মলেন্দু গুণ : বর্তমান বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থায় আমি মোটেও খুশি নই। স্বাধীনতার পক্ষের দলটি ক্ষমতায় আসার কারণে আমাদের ক্রমবর্ধমান অধঃপতন কিছুটা রোধ হয়েছে, তবে তা আশানুরূপ নয়। মানুষে মানুষে বৈষম্য কমানোর জন্য আমাদের আরও ‘বৈপ্লবিক পদক্ষেপ’ নিতে হবে। ক্লিনটনের ট্রিকল ডাউন ইকোনমিক পলিসিতে আমাদের মতো জনবহুল, একটি দরিদ্র রাষ্ট্রের মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত হবে না। সত্যিকারের সোনার বংলা গড়তে হলে পশ্চিমা বিশ্বে অধুনা পরিত্যক্ত মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ থেকেও আমাদের অনেক বিষয়ে শিক্ষা নিতে হবে।
‘স্বদেশের মুখ শেফালি পাতায়’ কবিতায় আপনি কী বলতে চেয়েছেন, আমি খুব ভালো বুঝতে পারিনি।
নির্মলেন্দু গুণ : ওই কবিতাটি আমি লিখেছিলাম ১৯৬৭ সালের কোনো একসময়। যথারীতি তারিখ মনে নেই। তবে মনে আছে অনেক বিলম্বে, ১৯৬৭ সালের ১২ নভেম্বর দৈনিক সংবাদ পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকীতে কবিতাটি ছাপা হয়। শেখ মুজিব তখন স্বদেশের কথা বলতে গিয়ে আইয়ুবের জেলে বন্দিজীবন যাপন করছেন। তাঁকে উদ্বুদ্ধ করার জন্যই আমি ওই কবিতাটি তাঁর নামে উৎসর্গ করি। কবিতাটি পড়ে তিনি খুব খুশি হন। কিন্তু তিনিও কবিতাটি ভালো বুঝতে পারেননি। তাই, বোঝার জন্য তিনি কবিতাটি নিয়ে যান মার্ক্সবাদী সাহিত্যিক রণেশ দাশগুপ্তর কাছে। রণেশদাও তখন জেলে ছিলেন। রণেশদার কাছেই আমি ঘটনাটির কথা শুনেছিলাম। ওই কবিতায় আমি শৃঙ্খল থেকে মুক্তির জন্য মানুষের বিদ্রোহের কথাই বলেছি। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ভিয়েতনামের মুক্তিসংগ্রামের কথাটাও ছিল ‘দক্ষিণ-পূর্ব এশীয়বাসীর বিস্ফোরণ’ কথাটির মধ্যে। ‘স্বদেশের মুখ’ বলতে আমি জীবনানন্দবর্ণিত ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি’ কথাটারই প্রতিধ্বনি করেছিলাম। সর্বোপরি আমি যে ‘মুক্ত ভূমণ্ডলের’ স্বপ্ন নিয়ে বড় হচ্ছিলাম, আমার বিশ্বাস হয়েছিল যে শেখ মুজিবের মধ্য দিয়েই একদিন আমার সেই স্বপ্ন পূরণ হবে। তিনিই হবেন আমাদের জাতীয় মুক্তির স্থপতি।
এখানে আমাকে যদি একটু দূরদর্শী বলে মনে হয়, ভ্রম হয়, তাতে আমি হয়তো সৌজন্যবশত একটু লজ্জিত হব, কিন্তু এটাই সত্য।