সাক্ষাৎকার
দীপক দেব, রাজশাহী থেকে
প্রকাশ : ২০ জুন ২০২৩ ১১:৫১ এএম
আপডেট : ২১ জুন ২০২৩ ০০:৫২ এএম
খায়রুজ্জামান লিটন। ফাইল ফটো
রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এবারও এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের প্রতিই আস্থা রেখেছে আওয়ামী লীগ। সাম্প্রতিক পাঁচ সিটি নির্বাচন ঘিরে খুলনা ও রাজশাহীতে দলীয় প্রার্থিতা নিয়ে খুব বেশি চাপ পোহাতে হয়নি ক্ষমতাসীন দলকে। অন্য তিন সিটিতে নৌকার প্রার্থিতা নিয়ে অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিয়ে ভালোই ধকল পোহাতে হয়েছে।
প্রার্থীকে নিয়ে দলের ভেতরে দ্বন্দ্ব না থাকায় পুরো সময় নির্বাচনী প্রচারে শতভাগ মনোযোগ দিতে পেরেছেন রাজশাহীর লিটন। বিএনপির প্রার্থী না থাকায় ভোটের মাঠে তাকে টেক্কা দেওয়ার মতো শক্তিশালী কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীও নেই। তাই জয় নিয়েও অনেকটা নির্ভার আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য লিটন।
গতকাল সোমবার প্রতিদিনের বাংলাদেশের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে জানতে চাওয়া হয়- এমন অনুকূল ভোটের মাঠেও কোনো চ্যালেঞ্জ কি অনুভব করছেন? রাজশাহী সিটির সদ্যসাবেক মেয়র স্পষ্ট করেই বললেন, নির্বাচন নিয়ে কোনো চ্যালেঞ্জ নেই৷ তবে ভোটার উপস্থিতি বাড়ানোই মূল বিষয়। কারণ রাজশাহীতে আবহাওয়া একটি বড় ফ্যাক্টর। বেশি গরম থাকলে ভোটাররা কেন্দ্রে আসবে না। আবার অনেকে ভাবতে পারে যেহেতু শক্ত কোনো প্রার্থী নেই, নৌকার প্রার্থীই জয়ী হবে, তাই ভোটকেন্দ্রে গিয়ে কী হবে! এই জায়গাটাকে গুরুত্ব দিয়ে আমরা নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা এবং পথসভায় ভোটারদের উদ্দেশে বলেছি, ভোট দেওয়া তাদের অধিকার, এই অধিকার প্রয়োগ করতে হবে, তাদের পছন্দের প্রার্থী নির্ধারণের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে হবে। আমরা বিশ্বাস করি, সাধারণ ভোটাররা আমাদের এই বার্তা গ্রহণ করে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিতে আসবে। ভোটের হার ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশের ওপরে থাকবে।
ভোটের মাঠে বিএনপি বা বড় কোনো দলের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী না থাকায় কোনো অস্বস্তি রয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, রাজনীতিতে বিভিন্ন দলের বিভিন্ন ধরনের কৌশল থাকে। সে কৌশলের অংশ হিসেবেই বিএনপি নির্বাচন বর্জন করেছে এবং নির্বাচনে আসার জন্য শর্ত দিয়েছে। যদিও তাদের এই শর্ত সুস্থ ধারার রাজনীতির সহায়ক নয়। আমরা চাই তাদের শুভবুদ্ধির উদয় হোক। তবে মেয়র পদে বিএনপির দলীয় প্রার্থী না থাকলেও কাউন্সিলর পদে তাদের ও জামায়াতে ইসলামীর অনেক প্রার্থী রয়েছে। সুতরাং তাদের সমর্থনকারী ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে আসবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
এর আগে খুলনা-বরিশালে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা আশা প্রকাশ করেছিলেন, তারা বিএনপি-জামায়াতের ভোটও পাবেন। খায়রুজ্জামান লিটনেরও তেমন কোনো আশা রয়েছে? এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাজশাহীর উন্নয়নের বিষয়টি যারা উপলব্ধি করে সেই ক্ষুদ্র একটি অংশের ভোট আসলেও আসতে পারে। তবে দল দুটির কট্টর সমর্থক ভোটাররা আমাকে ভোট দেবে বলে আমি মনে করি না।
খুব জোরালোভাবে না হলেও স্থানীয় আওয়ামী লীগের একটি অংশ দলীয় প্রার্থী হিসেবে লিটনের বিরোধিতা করেছে বলে গুঞ্জন রয়েছে। এই অংশের নেতৃত্বে রয়েছেন রাজশাহীর কয়েকজন সংসদ সদস্য এবং জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন নেতা। প্রকাশ্যে অবস্থান না নিলেও ভোটের মাঠে তারা কোনো প্রভাব ফেলবেন কি না সে বিষয়ে আলাপকালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী জানান, বিরোধিতাকারী অংশটিকে নির্বাচন পরিচালনার কোনো কার্যক্রমে রাখা হয়নি। এক্ষেত্রে বরিশাল সিটিতে মেয়র পদে বিজয়ী আওয়ামী লীগ প্রার্থী আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ ওরফে খোকন সেরনিয়াবাতের কৌশল অবলম্বন করেছেন জানিয়ে লিটন বলেন, গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে পরাজয়ের পর আজমত উল্লা খান জাহাঙ্গীরের পক্ষের নেতাকর্মীরা তার সঙ্গে বেইমানি করেছে বলে যে অভিযোগ করেন, এটা খুবই স্বাভাবিক ছিল। কোনো ধরনের পরীক্ষা না নিয়ে তাদের ওপর আস্থা রাখাটা অনেক বড় ভুল ছিল আজমত উল্লা খানের। একবার যারা জাহাঙ্গীরের দিকে চলে গিয়েছিল পরীক্ষা ছাড়া তাদের বিশ্বাস করে কীভাবে?
এক্ষেত্রে আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন মন্তব্য করে খায়রুজ্জামান লিটন বলেন, খোকন সেনিয়াবাত রাজনীতিতে নতুন হলেও সঠিক কাজটি করেছেন। যারা আমার পক্ষের নয়, যারা তার মনোনয়ন চাইনি বা যারা তার বিজয় চায়নি, শুরু থেকেই তাদের বাদ দিয়ে নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনা করে এসেছেন। এতে করে ভোটারদের লক্ষ্য নির্ধারণ করা সহজ হয়েছে। বরিশালের সাদিক আব্দুল্লাহর পক্ষের লোকজন শুরু থেকেই খোকন সেরনিয়াবাতের বিরোধিতা করে আসছিল। আমিও রাজশাহীতে মনে করি, এখানে যারা বারে বারে চিহ্নিত হয়েছে, দলের বিরুদ্ধে গেছে, আমার বিরুদ্ধে নানা ধরনের কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়েছে, উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়েছে, তাদেরকে বিশ্বাস করার কোনো কারণ নাই। তাদেরকে ছাড়াই ভালো করতে পারব ইনশাল্লাহ। আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের সর্বস্তরের নেতাকর্মী নৌকার বিজয়ের জন্য সর্বাত্মকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
নিজের জয়ের বিষয়ে আশাবাদের কথা বলতে গিয়ে নৌকার লিটন বলেন, দেশের বড় সিটি করপোরেশনগুলোর সঙ্গে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের উন্নয়নের তুলনা করলে একটি প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যায়। নগরীর রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে অবকাঠামো উন্নয়নের ফলে নাগরিক সেবার মান বৃদ্ধি পেয়েছে, প্রাচ্যের সর্বস্তরের জনগণ এর সুফল ভোগ করছে। আগামী দিনের উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে ঘোষণা ইশতেহারের মাধ্যমে নগরবাসীর সামনে তুলে ধরা হয়েছে তা সর্বস্তরের মানুষ গ্রহণ করেছে বলে আমি বিশ্বাস করি। আগামী ২১ জুন রাজশাহী মহানগরীর সর্বস্তরের জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিয়ে নৌকা প্রতীককে বিজয়ী করবে। আমাকে মেয়র হিসেবে পুনর্নির্বাচিত করে আবারও তাদের সেবা করার সুযোগ দেবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।
এদিকে গতকাল সকালে নগরীর একটি রেস্টুরেন্টে মিট দ্য প্রেস অনুষ্ঠানে উৎসবমুখর পরিবেশে শান্তিপূর্ণভাবে ভোট অনুষ্ঠিত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন লিটন। তিনি ভোটারদের নির্বিঘ্নে ভোট দিতে আসার আহ্বান জানান। কাউন্সিলরদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে, ভোটের দিন এ রকম কোনো ঘটনা ঘটলে শান্তিপূর্ণ ভোটের পরিবেশ বিঘ্নিত হবে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে লিটন বলেন, ভোটের পরিবেশকে বিঘ্নিত করবে বা প্রভাবিত করবে এমন কোনো ঘটনা ভোটের দিন ঘটবে বলে আমি বিশ্বাস করি না। নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ বিষয়ে যথেষ্ট তৎপর রয়েছে বলে আমি জানতে পেরেছি। কেউ যাতে এমন তৎপরতা ঘটাতে না পারে এ বিষয়ে আমাদের দলীয় নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ভোট শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।