আলাউদ্দিন আরিফ
প্রকাশ : ১১ জুন ২০২৩ ১৩:৩৪ পিএম
ফাইল ফটো
পুলিশ হত্যা, থানা ও ফাঁড়িতে হামলা এবং অস্ত্র লুটের মামলার আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা নিশ্চিত করতে চায় পুলিশ সদর দপ্তর। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে উদ্ধার করতে চায় লুণ্ঠিত অস্ত্র। কিন্তু বছরের পর বছর পার হতে থাকলেও ১২টি থানা ও পুলিশ ফাঁড়ি থেকে লুণ্ঠিত বিপুল পরিমাণ অস্ত্র এবং গোলাবারুদ উদ্ধারে আশানুরূপ সফলতা মিলছে না। এসব অস্ত্র জননিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে কাজ করছে বলে সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তরের একটি সভায় মন্তব্য করা হয়েছে।
এসব মামলার তদন্ত দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করে আসামিদের গ্রেপ্তার ও সাজা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট জেলার পুলিশ সুপার, রেঞ্জ ডিআইজি ও কমিশনারদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পুলিশ হত্যা ও অস্ত্র লুটের মামলাগুলো কোন সালের, মামলায় অভিযোগপত্র হয়েছে কি না, কত আসামির সাজা হয়েছে, কতজন খালাস পেয়েছে, তার বিস্তারিত বিবরণ প্রতিবেদন আকারে পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠাতে সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোকে বলা হয়েছে।
জানতে চাইলে পুলিশের মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘ফাঁড়ি ও থানা থেকে লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে পুলিশ কাজ করছে। পুলিশ হত্যা মামলায় যাদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮০ সাল থেকে এ যাবৎ পুলিশ সদস্য হত্যার ঘটনায় মোট ৭৯টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় এজাহারনামীয় আসামি ২ হাজার ৬৬২ জন। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১ হাজার ৩৩৮ জনকে। চার্জশিটভুক্ত আসামির সংখ্যা ২ হাজার ২৭৩ জন, যাদের মধ্যে জামিনে আছে ১ হাজার ৪৪৭ জন, কারাগারে ১০৫ জন এবং পলাতক ৩০৭ জন। সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে মৃত্যুদণ্ড পেয়েছে ২৭ জন। বিভিন্ন মেয়াদে সাজা পেয়েছে ৭৬ জন। পলাতক ৩৩ জন। পুলিশ হত্যা মামলায় খালাস পেয়েছে ১৯ জন।
অপরদিকে বিগত সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে থানা, ক্যাম্প ও ফাঁড়ি লুটের মামলা হয়েছে ১২টি। থানা ও ফাঁড়ি থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র লুট হলেও সেগুলো উদ্ধার করা যায়নি। এসব অস্ত্র জননিরাত্তায় হুমকি হিসেবে কাজ করছে।
রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি আব্দুল বাতেন জানান, গত ১৫ এপ্রিল সিরাজগঞ্জ থেকে একটি এসএমজি, একটি থ্রি নট থ্রি রাইফেল, একটি থ্রি নট থ্রি কাটা রাইফেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদসহ আট চরমপন্থিকে গ্রেপ্তার করা হয়। উদ্ধার করা অস্ত্রের মধ্যে একটি ছিল ২০০২ সালের বেলকুচি উপজেলার রান্ধুনিবাড়ী পুলিশ ফাঁড়ি থেকে লুট হওয়া অস্ত্র। যদিও আসামিরা ওই অস্ত্রের নম্বর তুলে ফেলেছিল।
২০০২ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর সিরাজগঞ্জের বেলকুচি থানার রান্ধুনিবাড়ী পুলিশ ক্যাম্পে হামলা করে সর্বহারা চরমপন্থিরা। এতে হাবিলদার গোলজার হোসেন, কনস্টেবল সুশান্ত চাকমা, সাদেকুল ইসলাম, রেজাউল হক, বাবুল হোসেন, আনিছুর রহমান ও আব্দুল করিম গুলিবিদ্ধ হন। গুলিতে নিহত হন কনস্টেবল সুশান্ত চাকমা, জাহিদুল ইসলাম, সাদেকুল ইসলাম ও রেজাউল হক। ওই ক্যাম্পের অস্ত্রাগার থেকে সাতটি এসএলআর ও সাতটি ম্যাগজিন, ১৪৪ রাউন্ড গুলি, দুটি রাইফেল, একটি ম্যাগজিন ও ৩০ রাউন্ড গুলি লুট হয়।
পুলিশের অস্ত্র লুটের চাঞ্চল্যকর ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে- ২০০৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর নাটোরের বামিহাল পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা করে চার আনসার সদস্যকে গলা কেটে হত্যা, ১১টি অস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ গুলি লুট এবং ১৯৮৭ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি নাটোরের গুরুদাসপুর থানায় হামলা করে কনস্টেবল হাবিবুর রহমানকে গুলি করে হত্যার পর অস্ত্রাগার থেকে দুটি এসএমজি, চারটি এসএলআর, ১৮টি থ্রি নট থ্রি রাইফেল ও গোলাবারুদ লুট।
এ ছাড়া ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের বামনডাঙ্গা পুলিশ তদন্তকেন্দ্রে ঢুকে চার পুলিশ সদস্য তোজাম্মেল হক, বাবলু মিয়া, হযরত আলী ও নজিম উদ্দিনকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন গত ১০ বছর থেকে দিবসটিকে ‘সুন্দরগঞ্জ ট্র্যাজেডি’ দিবস হিসেবে পালন করে। কিন্তু ১০ বছরেও ওই ঘটনার বিচার হয়নি।
সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত এক সভায় অতিরিক্ত আইজিপি মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, থানা, ক্যাম্প ও ফাঁড়ি লুট এবং পুলিশ সদস্য হত্যার মামলাগুলোয় সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পুলিশ হত্যার যেসব মামলা হয়েছে, সেগুলোর অবশ্যই অভিযোগপত্র দাখিল করতে হবে। পুলিশ হত্যাসংক্রান্তে যেসব মামলা খালাস হয়েছে, সেসব মামলা সম্পর্কে নিজ নিজ ইউনিটের ক্রাইম কনফারেন্সে আলোচনা করা জরুরি। মামলার ক্ষেত্রে পুলিশ সুপার, রেঞ্জ ডিআইজি ও কমিশনারদের নিজ নিজ ইউনিট থেকে তথ্য নিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরকে অবহিত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সংশ্লিষ্ট ইউনিটের টার্গেট থাকবে পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার ও সাজা নিশ্চিত করা। পুলিশ সদস্যকে কেউ হত্যা করে চলে যাবে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করি, আমরা যদি পুলিশের জন্য কাজ করতে না পারি তাহলে খুবই অন্যায় হবে। ঢাকা রেঞ্জে ১৪টি পুলিশ সদস্য হত্যা মামলার আসামি খালাস হওয়ার তথ্য পেয়েছি। যতদিন পর্যন্ত এসব মামলায় আসামির সাজা নিশ্চিত না হবে, ততদিন ঢাকা রেঞ্জের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ বিষয়ে ফলোআপ রাখবেন।
অতিরিক্ত আইজিপি আতিকুল ইসলাম বলেন, থানা, ক্যাম্প ও ফাঁড়িতে লুটের সব মামলার ডকেট পর্যালোচনা করতে হবে। ঘটনাগুলো কীভাবে ঘটানো হয়েছে এবং প্রকৃত কারণ কী, তা উদ্ঘাটন করা জরুরি। সংশ্লিষ্ট জেলার পুলিশ সুপারদের বিশেষভাবে সেদিকে নজর দিতে হবে। কীভাবে এসব মামলার আসামিরা খালাস পেয়ে যাচ্ছে, তার জন্য সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।