ফারুক আহমাদ আরিফ
প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০২৩ ১৩:০১ পিএম
রাজধানী ঢাকায় গত ৭ এপ্রিল থেকে বইছে তাপপ্রবাহ। জনজীবন বিপর্যস্ত। প্রচণ্ড এই গরমের মধ্যে বুড়িগঙ্গার কালো পানি উপেক্ষা করে শরীরটাকে শীতল করে নিতে দুরন্তপনায় মেতে ওঠে এক শিশু। ইন্দ্রজিৎ কুমার ঘোষ
রাজধানীর মহাখালীর বাসিন্দা সাজ্জাদুল ইসলাম শনিবার রাতে এক মিনিটও ঘুমাতে পারেননি। গরমে বিছানা, শরীর সব ভিজে যায়। কয়েকবার গোসলও করেছেন। বারবার ছাদে গিয়ে গরম নিবারণের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি বলেন, সেহরির পর ঘণ্টা দুই বিদ্যুতের অভাবে শরীরের অবস্থা আরও নাজুক হয়ে পড়েছে। দিনে আর কাজ করার মতো পরিস্থিতি নেই। সকালে বের হয়েছি, কিন্তু কাজে মনোযোগ দিতে পারিনি। শরীরে বল পাচ্ছি না।
আগারগাঁও থেকে বিমানবন্দরে যাওয়ার পথে বাসে কথা হয় প্রবীণ আমিরুল ইসলামের সঙ্গে। তার বাড়ি শেরপুর জেলায়। তিনি ঢাকায় এসেছিলেন পাঁচ দিন আগে। গতকাল রবিবার গ্রামে ফিরে যাচ্ছিলেন। এই প্রতিবেদককে তিনি বলেন, আমার ৭৫ বছর বয়সের জীবনে এমন গরম কখনও দেখিনি। হাত-মুখ পুড়ে যাওয়ার অবস্থা। গ্রামের মানুষও স্বস্তিতে নেই। কৃষি ও অন্যান্য শ্রমিকশ্রেণির মানুষ সামান্য কাজ করেই হাঁপিয়ে উঠছেন।
রাজধানী ঢাকায় গত ৭ এপ্রিল থেকে বইছে তাপপ্রবাহ। উত্তরের জেলা চুয়াডাঙ্গার অবস্থা আরও ভয়াবহ। সেখানে ৪ এপ্রিল থেকে টানা ১২ দিন দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বিরাজ করছে। দেশের অন্যান্য জেলাতেও অতি তীব্র, তীব্র, মাঝারি ও মৃদু তাপপ্রবাহ চলছে। প্রচণ্ড গরমে রাতে ঘুম হচ্ছে না মানুষের। এতে প্রভাব পড়ছে কাজের ক্ষেত্রেও। কর্মস্পৃহা হারাচ্ছে মানুষ। অল্প কাজ করেই ক্লান্ত হয়ে পড়ছে তারা।
এ বিষয়ে সিলেটের এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইএনটি সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মনি লাল আইচ লিটু প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, গরমে মানুষের ঘুম কম হয়। কেননা ঘুমানোর জন্য শরীরের তাপমাত্রা এক ডিগ্রি কমাতে হয়, কিন্তু অধিক তাপমাত্রার কারণে তা কমতে পারছে না। এতে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটছে। যার ফলে কাজের গতি কমে যাচ্ছে। মানুষ কাজ করে আনন্দ পায় না। এজন্য ঘুমানোর আগে গোসল বা গা মুছে দিতে হবে। পানি খেতে হবে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. শাখাওয়াত হোসেন বলেন, এই তাপপ্রবাহ শরীরের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। সূর্যের সরাসরি আলো থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। রিকশাওয়ালা বা রাস্তাঘাটের শ্রমিক, কৃষিশ্রমিকদের টানা পরিশ্রম না করে বিশ্রাম নিয়ে নিয়ে কাজ করতে হবে। বেলা ১১টা থেকে সাড়ে ৩টা পর্যন্ত বাইরে কাজ করতে হলে মাথায় কিছু একটা রেখে ঢেকে দিতে হবে। শরীর কিছুক্ষণ পরপর মুছে দিতে হবে।
শিশুদের সম্পর্কে তিনি বলেন, বেলা ১১টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত শিশুদের ঘরের বাইরে কম বের করতে হবে। গ্রামের শিশুদের বাড়ির উঠানের গাছপালার ছায়ায় রাখতে হবে। কিছুক্ষণ পরপর পানি পান করাতে হবে। রোজাদাররা ইফতারের পর থেকে কিছুক্ষণ পরপর পানি পান করবেন।
মানুষের মতো প্রাণিকুলও গরমে অতিষ্ঠ। শনিবার রাত ১২টার পর ঢাকার ফার্মগেট এলাকায় দেখা যায়, কয়েকটি কুকুর গরমে হাঁপাচ্ছে। খাবার দেওয়া হলে সেগুলো না খেয়ে জিহ্বা বের করে লালা ঝরাচ্ছে। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, অতিরিক্ত তাপের কারণে এ অবস্থা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা গৃহপালিত পশু যেমন- গরু, ছাগল, মহিষকে দুপুর ১২টা থেকে বেলা সাড়ে ৩টা পর্যন্ত মাঠে না রেখে ছায়াযুক্ত স্থানে রাখার পরামর্শ দেন।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের প্রাণিস্বাস্থ্য শাখার উপপরিচালক ডা. নাজমুল হক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, গবাদিপশুকে একাধিকবার গোসল করাতে হবে, পর্যাপ্ত পানি পান করাতে হবে এবং ছায়াযুক্ত স্থানে রাখতে হবে। দিনের বেলা খাদ্য কমিয়ে দিতে হবে।
এ মৌসুমে দেশে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহের কারণ হিসেবে আবহাওয়া অধিদপ্তরের জলবায়ু মহাশাখার বিভাগীয় প্রধান সাঈদ আহমদ চৌধুরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, এর আগেও দেশে বেশ কয়েকবার দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ বিরাজমান ছিল। দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৩১ দিনের টানা তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ১৯৯৫ সালে চুয়াডাঙ্গা জেলায়। সে বছর ৮ এপ্রিল থেকে ৮ মে পর্যন্ত টানা তাপপ্রবাহ ছিল। তিনি আরও বলেন, ১৯৯৪ সালে চুয়াডাঙ্গায় ২৪ এপ্রিল থেকে ১০ মে পর্যন্ত টানা ১৭ দিন, ১৯৯৯ সালে ১৪ এপ্রিল থেকে ৮ মে পর্যন্ত টানা ২৫ দিন, ২০০১ সালে ২০ থেকে ২৯ এপ্রিল ১০ দিন, ২০০৪ সালে ৩০ এপ্রিল থেকে ২১ মে ২২ দিন, ২০১০ সালে ৫ থেকে ২৬ এপ্রিল টানা ২২ দিন এবং ২০১৪ সালে ১৪ এপ্রিল থেকে ২ মে টানা ১৯ দিন দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ ছিল।
সাঈদ আহমদ চৌধুরী আবহাওয়া অধিদপ্তরের সংরক্ষিত তথ্য বিশ্লেষণ করে জানান, ঢাকায় ১৯৯৫ সালে ২৪ এপ্রিল থেকে ৪ মে টানা ১১ দিন; ২০১৪ সালে ১৬ থেকে ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত টানা ১২ দিন; ২০১৬ সালে ২২ এপ্রিল থেকে ১ মে পর্যন্ত টানা ১০ দিন তাপপ্রবাহ ছিল।
তিনি বলেন, দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ মানুষসহ পশুপাখি ও কৃষি ফসলের জন্য ক্ষতিকর। আবহাওয়া ঠিক রাখতে হলে আমাদের বেশি করে গাছ লাগাতে হবে। আগামীকাল মঙ্গলবার ঢাকায় সামান্য বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনার কথা জানিয়ে সাঈদ আহমদ চৌধুরী বলেন, সামান্য এই বৃষ্টিতে গরম কমবে না। তাপের কারণে সেটি মাটি পর্যন্ত পৌঁছানোর সম্ভাবনা কম। ২২ এপ্রিল সিলেটের জৈন্তাপুরে, ২৩ এপ্রিল ময়মনসিংহে এবং ২৪ এপ্রিল সারা দেশে বৃষ্টি হতে পারে বলেও জানান তিনি।
গরমে রোগবালাই থেকে বেঁচে থাকার উপায় সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, গরমে সর্দি, কাশি, জ্বর, টনসিল, শ্বাসজনিত রোগবালাই বেড়ে যাচ্ছে। টাইফয়েড, জন্ডিস ও ডায়রিয়াজনিত রোগ বেশি হচ্ছে। তীব্র গরমে মানুষের শরীর থেকে ঘামের সঙ্গে লবণ বেরিয়ে যায়। শরীর দুর্বল লাগে, মাথা ঘোরায়, বিশেষ করে যারা রোজা রাখেন তাদের কষ্টটা আরও বেশি। যারা রোজা থাকেন তারা ইফতারের পর থেকে সেহরি পর্যন্ত অল্প অল্প করে কিছুক্ষণ পরপর পানি পান করবেন। পানিতে সামান্য লবণ মিশিয়ে পান করতে হবে। বাইরের বা রাস্তাঘাটের শরবত, খোলা পানি খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
তিনি বলেন, খুব বেশি প্রয়োজন না হলে বাইরে বের না হওয়াই ভালো। স্কুলে শিশুরা যাতে দৌড়াদৌড়ি, লাফালাফি কম করে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। বাইরে গেলে কাপড়-চোপড় ঢিলেঢালা পরতে হবে। যারা বাইরে কাজ করবেন বা করছেন তাদের মাথায় ছাতা ব্যবহার করতে হবে। ছাতা না হলে কোনো কাপড় বা অন্য কিছু দিয়ে মাথা ঢেকে রাখতে হবে। আর যাদের রাস্তায় বা রোদে বসে কাজ করতে হয়, তারা এক-দুই ঘণ্টা পরপর ছায়াযুক্ত স্থানে গিয়ে বিশ্রাম করবেন। এভাবে পরিবেশ-পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে হবে।
ডা. আব্দুল্লাহ আরও বলেন, কেউ যদি বেশিক্ষণ কাজ করতে করতে অজ্ঞান হয়ে যায় যাকে হিট স্ট্রোক বলে, তাকে ছায়াযুক্ত স্থানে নিয়ে যেতে হবে। পানি বা ডাব বা লেবুর শরবত পান করাতে হবে। এসব না পেলে স্যালাইন খাওয়ানো যেতে পারে। আর অজ্ঞান হয়ে গেলে নিকটস্থ হাসপাতালে নিতে হবে।
এদিকে তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে স্বাস্থ্যগত কোনো নির্দেশনা জারি করা হবে কি না- এ বিষয়ে জানতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালিক, স্বাস্থ্য সচিব ড. মু. আনোয়ার হোসেন হাওলাদার এবং অতিরিক্ত সচিব (জনস্বাস্থ্য অনুবিভাগ) নাজমুল হক খানকে মোবাইলে ফোন করলে তারা রিসিভ করেননি।