এলপিজি বাণিজ্য
মামুন-অর-রশিদ
প্রকাশ : ০৪ এপ্রিল ২০২৩ ১১:৪১ এএম
ফাইল ফটো
তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারিভাবে একটি প্ল্যান্ট নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কয়েক বছর ধরে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর সেই প্রকল্প এখন বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, বাজার নিয়ন্ত্রণের বদলে সরকারি সব সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি)) অধীনে বেসরকারি কোম্পানিকে ব্যবসার সুযোগ করে দিতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দেশে এখন পাইপলাইনের গ্যাস ব্যবহার করেন ৪২ লাখ ৯৬ হাজার ৫৭৪ জন গ্রাহক। পাইপলাইনের গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ৭ বছর আগে। বিতরণ কোম্পানিগুলো ২০১৫-১৬ অর্থবছরের পর আনুষ্ঠানিকভাবে আবাসিকে কোনো গ্যাস সংযোগ দেয়নি। এই বাস্তবতায় শহুরে মানুষের রান্নাঘরের বড় ভরসা হয়ে উঠেছে এলপিজি। দ্রুতই এলপিজি বাণিজ্যের খাত সম্প্রসারিত হচ্ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে ভোক্তার ভোগান্তি। বিশেষ করে সরকার প্রতি মাসে যে দাম নির্ধারণ করে দেয়, সেই দামে কখনই বাজারে এলপিজি পাওয়া যায় না। সব সময়ই সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রতি বোতলে গ্রাহককে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা বেশি গুনতে হয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সরকার নিজে এলপিজি উৎপাদন করলে বাজারে নিয়ন্ত্রণ তৈরি হতো। এতে সাধারণ মানুষ ঠকত না। কিন্তু আশা জাগিয়ে সরকার এখন পিছুটান দিচ্ছে।
সরকারি এলপিজি উৎপাদন প্রতিষ্ঠান এলপি গ্যাস লিমিটেড সূত্র বলছে, বেসরকারি যে কোম্পানি এই কাজের জন্য যোগ্য বিবেচিত হবে, সেই কোম্পানি সরকারি কোম্পানির লোগো ব্যবহারের সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে তারা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) যে বিপণন চেইন রয়েছে, তা-ও ব্যবহার করতে পারবে। এলপিজি প্ল্যান্ট নির্মাণের কোনো খরচ সরকার বহন করবে না। এ বিষয়ে একটি ধারণাপত্র (কনসেপ্ট পেপার) তৈরি করে ইতোমধ্যে বিপিসির কাছে পাঠিয়েছে এলপি গ্যাস লিমিটেড। বিপিসির অনুমোদনের পর বিষয়টি যাবে জ্বালানি বিভাগে।
সরকারের এই উদ্যোগকে কীভাবে দেখছেন জানতে চাইলে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সাবেক সদস্য মকবুল ই ইলাহী চৌধুরী বলেন, সরকারি কোম্পানি এলপিজি মজুদ বৃদ্ধি করলে এর সুবিধা পেত সাধারণ মানুষ। বাজারের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ আসত। সরকারি কোম্পানির সক্ষমতা বাড়ত। সরকারি সব সুবিধা নিয়ে বেসরকারি কোম্পানি ব্যবসা করার বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন, জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
জ্বালানি বিভাগ সূত্র জানায়, অনেক আগে থেকে আলোচনা হলেও ২০২০ সাল থেকে এলপিজি প্ল্যান্ট নির্মাণের আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ নেওয়া হয়। জ্বালানি বিভাগের ২০২১ সালের ২৭ জুলাই অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে প্ল্যান্ট নির্মাণে জমি অধিগ্রহণের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয়। এলপি গ্যাস লিমিটেড জমি কিনে প্রকল্পটি নির্মাণ করতে চাইলেও বিপিসি চেয়ারম্যান সরকারি প্রকল্প হওয়াতে জমি কেনার বদলে অধিগ্রহণের বিষয়ে মত দেন। জ্বালানি বিভাগের তৎকালীন সচিব আনিছুর রহমান ওই বৈঠকের কার্যপত্রে সই করেন একই বছরের ৪ আগস্ট।
ওই বৈঠকে নির্দিষ্ট হয় চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণ্ডে এলপিজি প্ল্যান্ট নির্মাণ করা হবে। আর এলপিজি বোতলের কারখানা হবে টাঙ্গাইলে। তবে মাত্র ১২ একর জমি অধিগ্রহণ জটিলতা কাটিয়ে উঠতে পারেনি এলপি গ্যাস লিমিটেড। এরই মধ্যে জ্বালানি বিভাগের তিনজন সচিব পরিবর্তন হয়েছে। ১৮ মাসে ১৮টি সমন্বয় সভা হয়েছে। প্রত্যেকটি সভায় বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু ফলাফল শূন্য।
সবশেষ ২০২২ সালের ১২ ডিসেম্বর জ্বালানি বিভাগের একটি সমন্বয় সভা হয়। ওই বৈঠকে জানানো হয়, নতুন করে এলপি গ্যাস লিমিটেড ১২ দশমিক ৮৮ একর জমি অধিগ্রহণের জন্য প্রশাসনিক অনুমোদন চাওয়া হয়েছে। কিন্তু অর্থ বিভাগ থেকে পরিপত্র জারি করে জমি অধিগ্রহণ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এর আগে ২০২২ সালের ২৪ এপ্রিল জ্বালানি বিভাগে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকে জানানো হয় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে এলপি গ্যাস লিমিটেডকে জানানো হয়েছে, তারা এলপিজি প্ল্যান্ট নির্মাণের জন্য যে জমি নির্ধারণ করেছে সেটি বন বিভাগের নামে। এজন্য বিকল্প জমি খোঁজার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ এর আগেও একবার প্রকল্পটি নির্মাণের জন্য জমি খুঁজে বের করা হয়েছিল। জ্বালানি বিভাগ সূত্র জানায়, ওই জমিটি বন বিভাগের পতিত জমি হলেও তারা তা ছাড়তে রাজি হয়নি। বিষয়টি নিয়ে জ্বালানি বিভাগ বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক করলেও ওই সময় কোনো সুরাহা করতে পারেনি।
নতুন জ্বালানি সচিব ড. খায়রুজ্জামান মজুমদার স্বাক্ষরিত জ্বালানি বিভাগের এক বৈঠকের কার্যপত্রে বলা হয়েছে, গত ১৯ জানুয়ারি বিপিসিকে জ্বালানি বিভাগ থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ওই নির্দেশনায় বলা হয়েছে যথাযথ প্রক্রিয়া নির্ধারণ করে যৌথ উদ্যোগে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে।
এ বিষয়ে জানতে ড. মজুমদারের সঙ্গে যোগাযোগ করেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে তার ই-মেইল ও হোয়াটসঅ্যাপে এ-সংক্রান্ত প্রশ্ন পাঠানো হলেও তিনি কোনো জাবাব দেননি।
দীর্ঘদিনের একটি সরকারি প্রচেষ্টাকে বন্ধ করে দিয়ে কেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে কাজটি ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে, জানতে চাইলে এলপি গ্যাস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আবু হানিফ বলেন, ‘আমরা সীতাকুণ্ডে জমি ঠিক করে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিলাম। এরপর আমাদের বলা হয়েছে প্রকল্পটি আমাদের করার দরকার নেই।’
সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ে একটি বৈঠক হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ওই বৈঠকে আমি জানতে চেয়েছিলাম আমরা এখানে কোনো বিনিয়োগ করব কি না। তখন বলা হয়েছে এখানে আমাদের বিনিয়োগ করতে হবে না। বেসরকারি যে প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হবে সেই কোম্পানি আমাদের লোগো এবং বিতরণ কোম্পানির সব সুবিধা উপভোগ করে এই ব্যবসা করবে।’
এ বিষয়ে একটি কনসেপ্ট পেপার তৈরি করে এলপি গ্যাস লিমিটেড বিপিসির কাছে পাঠিয়েছে বলে জানান তিনি।
সূত্র বলছে, সারা দেশে মাসে গড়ে বর্তমানে এক লাখ টন এলপিজি প্রয়োজন হলেও সরকারি কোম্পানির বার্ষিক ধারণক্ষমতা আছে ১০ হাজার টন, যার পুরোটা আবার ব্যবহার হয় না। গড় বিবেচনায় বাজারে সরকারি এলপিজির অংশীদারত্ব ১ ভাগের কাছাকাছি। এলপিজির বাকি বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করেন বেসরকারি উদ্যোক্তারা।
জানতে চাইলে ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা ড. শামসুল আলম বলেন, ‘আমরা সব সময় বাজারে সরকারি নিয়ন্ত্রণের কথা বলে আসছি। সরকারের কোম্পানি রয়েছে। সরকার চাইলেই বাজরের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সিন্ডিকেটের কবল থেকে মানুষকে মুক্ত করতে পারে। কেন গণমুক্তি সিদ্ধান্তে সরকারের আগ্রহ নেই সেটি বোধগম্য নয়। এখন বেসরকারি কোম্পানির হাতে ছেড়ে দিলে বাজার নিয়ন্ত্রণের সরকারি প্রচেষ্টা অন্ধকারে হারিয়ে যাবে।’