রাশেদুল হাসান
প্রকাশ : ০২ এপ্রিল ২০২৩ ০৯:২০ এএম
আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০২৩ ০৯:২১ এএম
ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেলপথ নির্মাণ কাজ বন্ধ। ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে পাথরসহ মূল্যবান সামগ্রী। আলী হোসেন মিন্টু
ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে বিদ্যমান মিটারগেজ রেললাইনের সমান্তরালে একটি ডুয়েল গেজ লাইন নির্মাণ প্রকল্প শুরু হয় ২০১৫ সালে। শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৭ সালের জুনে। এরপর চার দফা সময় বাড়িয়ে গত বছরের ডিসেম্বরে এ কাজ শেষ করার কথা থাকলেও দৃশ্যমান হয়নি নতুন রেলপথ।
প্রকল্প কর্তৃপক্ষের দাবি- কাজ শেষ হয়েছে ৮২ ভাগ। এক বছরেরও বেশি সময় কাজ প্রায় বন্ধ রয়েছে। কাজ বন্ধ থাকায় অর্ধসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে আছে স্টেশন, প্লাটফর্ম, পদচারী সেতুর কাজ। রেললাইনের দুই পাশে পড়ে থাকা নির্মাণসামগ্রী রোদ-বৃষ্টিতে নষ্ট হচ্ছে। দরপত্রে ন্যূনতম দরে কাজ নিলেও জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় বেঁকে বসেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পাওয়ার কনস্ট্রাকশন করপোরেশন অব চায়না (পিসিসিসি)। এখন কাজের চুক্তি বাতিল করতে চায়। ফলে অনিশ্চয়তায় পড়েছে পুরো প্রকল্প।
প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, এ প্রকল্পের আওতায় রয়েছে জুরাইন রেলগেট থেকে নারায়ণগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশন পর্যন্ত ১২ দশমিক শূন্য ১ কিলোমিটার প্রধান লাইন, পাঁচ কিলোমিটার লুপলাইনসহ কিছু আনুষঙ্গিক কাজ। জুরাইন রেলগেট থেকে ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশন পর্যন্ত অবশিষ্ট চার কিলোমিটার নির্মাণকাজ পদ্মা সেতু রেল লিংক প্রকল্পের আওতায় করা হচ্ছে।
আনুষঙ্গিক কাজের মধ্যে রয়েছে পাঁচটি নতুন স্টেশন ভবন ও প্লাটফর্ম, একটি অফিস কাম স্টেশন ভবন, ১১টি ব্রিজ ও কালভার্ট, চারটি পদচারী সেতু, সীমানাপ্রাচীর ও দুটি ওয়াশ পিট নির্মাণ। প্রকল্পটি ২০১৫ সালের জুনে অনুমোদন পেলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পিসিসিসির সঙ্গে চুক্তি সই হয় ২০১৭ সালের জুনে। প্রকল্পের প্রথম মেয়াদ শেষ হয় ২০১৮ সালের জুনে। এরপর চার দফা সময় বাড়ানোর পর সর্বশেষ গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের কাজ বন্ধ রেখে গত ১৫ মার্চ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পিসিসিসি যথাসময়ে পাওনা পরিশোধ না করা, অতিরিক্ত কাজের মূল্য পরিশোধ না করা ও কাজের এলাকা বুঝিয়ে না দেওয়ার কারণ দেখিয়ে কর্তৃপক্ষকে কাজের চুক্তি সমাপ্তির নোটিস দেয়। এর জবাবে ২৩ মার্চ প্রকল্প কর্তৃপক্ষ ঠিাকাদারকে পত্র পাঠালেও এর কোনো জবাব আসেনি।
প্রকল্প কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রকল্পের চাষাঢ়া স্টেশন থেকে নারায়ণগঞ্জ স্টেশনের মাঝামাঝি প্রায় এক কিলোমিটার এলাকা তারা (রেলওয়ে) ঠিকাদারকে বুঝিয়ে দিতে পারেনি। আর ঠিকাদারের কিছু বিল আটকে আছে। কারণ প্রকেল্পের সর্বশেষ মেয়াদ শেষ হয়েছে গত ৩১ ডিসেম্বর। সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাব অনুমোদন না হওয়ায় ঠিকাদারের বিল পরিশোধ করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ রেলওয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নে আরও সাড়ে তিন বছর সময় ও বাড়তি ২৭৯ কোটি ৬৯ টাকা বরাদ্দ চেয়েছিল। রেলওয়ের এই প্রস্তাব এখন পরিকল্পনা কমিশনে আটকে আছে।
২৯ মার্চ রাজধানীর রেল ভবনে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে বৈঠক করে প্রকল্প পরিচালনা কমিটির একটি প্রতিনিধিদল। সভায় রেল সচিব প্রকল্প পরিচালককে এ বিষয়ে ঠিকাদারের সঙ্গে একটি সমাধানে আসতে আহ্বান জানান। এ ছাড়া সম্প্রতি চীনা ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের অভিভাবক কোম্পানি পাওয়ার চায়নার একটি প্রতিনিধিদল রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) আওতায় ভাঙ্গা থেকে পায়রা পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পের প্রস্তাব নিয়ে আসে। রেলমন্ত্রী তাদের সাফ জানিয়ে দেন, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ প্রকল্পটি শেষ না করলে নতুন প্রস্তাব বিবেচনা করা হবে না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে রেলওয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, নির্মাণসামগ্রীর দাম বাড়ায় চীনা কোম্পানিটি এ প্রকল্পের বাজেট বৃদ্ধির আবেদন করেছিল। তাদের সঙ্গে প্রাথমিক চুক্তি ছিল ২৬৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকার। তারা এখনে সে বাজেট বাড়িয়ে যে প্রস্তাব করছে তাতে খরচ দাঁড়াবে ৭৮২ কোটি টাকা। তিনি জানান, ঠিকাদারের এখন প্রায় ১৫ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। সেজন্য তারা কাজ বন্ধ রেখেছে, যা পরিশোধ করতে হলে প্রকল্পের সংশোধনীর অনুমোদন লাগবে। দ্রুত সংশোধনী অনুমোদন নেওয়ার জন্য রেল মন্ত্রণালয় কাজ করছে।
এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক সেলিম রউফ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘তারা (পিসিসিসি) ২০১৭ সালের রেট শিডিউল অনুযায়ী লোয়েস্ট বিডার হিসেবে কাজ নিয়েছে। কাজ নেওয়ার পর জিনিসপত্রের দাম হু হু করে বেড়েছে। তারা খরচ বৃদ্ধির জন্য আমাদের কাছে একটা আবেদন করেছে। কিন্তু এটা বিবেচনায় নেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ তারা সবচেয়ে কম দর দেখিয়েই কাজ নিয়েছে।’
এ প্রকল্পের ভবিষ্যৎ কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তারা ৮০ শতাংশের বেশি কাজ শেষ করেছে। এখন কাজ বাতিল করলে আবার নতুন করে ঠিকাদার নিয়োগ করে প্রকল্প বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে যাবে। আমরা চাই এ প্রতিষ্ঠানই কাজটা শেষ করুক। কারণ দেরি হলে জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’ তিনি জানান, প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রধান দুটি চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ঠিকাদারের আর্থিক সমস্যা এবং চাষাঢ়া ও নারায়ণগঞ্জ স্টেশন পর্যন্ত এক কিলোমিটার জায়গায় কিছু অবৈধ দখল আছে তা অপসারণ করা।
সরেজমিনে যা দেখা গেল
সম্প্রতি জুরাইন রেলগেট থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত দীর্ঘ ১২ কিলোমিটারেরও বেশি রেলপথ পরিদর্শন করে কোথাও একটি মিটার ও ডুয়েল গেজ ট্রাকের দেখা মেলেনি। এমনকি কোনো শ্রমিককেও কাজ করতে দেখা যায়নি প্রকল্প এলাকায়। শ্যামপুর স্টেশন ভবনে গিয়ে দেখা যায়, স্টেশনের কাজ এখনও অনেক বাকি। পদচারী সেতুটি অর্ধসমাপ্ত অব্স্থায় পড়ে আছে। প্লাটফর্মের কাজ হয়েছে, কিন্তু শেড দেওয়া হয়নি। স্টেশনের টয়লেটেরও নির্মাণকাজ হয়নি। একই অব্স্থায় দেখা যায়, পাগলা ও ফতুল্লা স্টেশনে।
জুরাইন রেলগেট থেকে নারায়ণগঞ্জ পুরো লাইনের বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষিপ্তভাবে ফেলে রাখা হয়েছে রেল, স্লিপার, বালু, পাথর ও অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী। এ বিষয়ে শ্যামপুর বড়ইতলা এলাকার বাসিন্দা শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘রেলের স্লিপার ও পাথর বিভিন্ন জায়গায় কয়েক বছর ধরে পড়ে থাকতে দেখছি। এগুলো বৃষ্টিতে ভেজে ও রোদে শুকায়। বিকালের দিকে মানুষজন এখানে বসে আড্ডা দেয়। কেউ আবার এগুলোর ওপর দোকানপাট বসিয়েছে। এ নিয়ে কাউকে কিছু বলতে দেখিনি।’