রাশেদুল হাসান
প্রকাশ : ১৫ মার্চ ২০২৩ ১২:৪৯ পিএম
আপডেট : ১৫ মার্চ ২০২৩ ১২:৪৯ পিএম
ফাইল ফটো
রাজধানীর মিরপুরের মনিপুর এলাকার বাসিন্দা শোভন হোসেন। ২০১৯ সালের ১৭ জুন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরির ভাইভা শেষ করে নারায়ণগঞ্জ থেকে মোটরসাইকেলে বাসায় ফিরছিলেন। নারায়ণগঞ্জের কাঞ্চন ব্রিজের কাছে তাকে বহনকারী মোটরসাইকেলের সঙ্গে ট্রাকের সংঘর্ষ হয়। এতে তার বাম হাতের রগ ছিঁড়ে যায়।
বাংলাদেশে ডাক্তার দেখানোর পর ভারতের চেন্নাইতেও চিকিৎসা করান তিনি। তাতেও সারেনি তার হাত। বর্তমানে তার এ হাতটি প্যারালাইজড। ওই হাত দিয়ে কোনো কাজ করতে পারেন না। তার চাকরির স্বপ্ন ভেঙে এখন দুঃস্বপ্ন হয়ে গেছে।
শোভন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ভাইভায় আমার চাকরি হয়। পরের দিন আমার চাকরিতে জয়েন করার কথা। বাবাহীন সংসারের হাল ধরার কথা। মা শুনে খুব খুশি হয়েছিলেন। এখন আমিই পরিবারের বোঝা।
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ থানার বাসিন্দা আব্দুল হক মোল্লা। বেসরকারি একটি সংস্থায় (এনজিও) কাজ করেন। গ্রাম থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরের অফিস করতে কিনেছিলেন একটি মোটরসাইকেল। গত ৯ ফেব্রুয়ারি বিকালে সাত বছর বয়সি ছোট ছেলেকে মোটরসাইকেলে নিয়ে বাজার করতে যান। ছোট ভাকলা রাস্তার মোড় ঘোরার সময় আরেকটি মোটরসাইকেলের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। আহত হন বাবা-ছেলে।
ঘটনাস্থলেই পা ভেঙে হাড় বের হয়ে যায় আব্দুল হক মোল্লার। হাত ভেঙে যায় ছেলে তামিমের। সেদিন থেকেই আব্দুল হক জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের শয্যায় কাতরাচ্ছেন। এক লাখেরও বেশি টাকা খরচ করেছেন চারটি অস্ত্রোপচারে। এখন তিনি পা ও চাকরি দুটোই হারানোর শঙ্কায় আছেন।
আব্দুল হক বলেন, আমার পায়ের হাড় ভেঙে বেরিয়ে যায়। প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে। চিকিৎসার জন্য হাড়টি ছয় ইঞ্চি কাটতে হয়। আমি আর আগের মতো স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারব না। তবে, কাজ করতে পারব কি না ডাক্তাররা বলতে পারবেন। স্বাভাবিক না হলে আমার চাকরি তো থাকবে না। বেতন গত মাসের পেয়েছি, এ মাসেরটা পাইনি।
প্রতিদিনই ঘটছে এ ধরনের সড়ক দুর্ঘটনা। শোভন ও আব্দুল হকদের মতো সংসারের কর্মক্ষম ব্যক্তিরা হয়ে যাচ্ছেন পরনির্ভরশীল, সংসারের বোঝা। এমন পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য সবাইকে সচেতন করতে প্রতিবছর ১৫ মার্চ পালিত হয় বিশ্ব পঙ্গু দিবস।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের পুরুষদের ই-এফ ওয়ার্ড পরিদর্শন করে দেখা গেছে, এ ওয়ার্ডে যারা ভর্তি হয়েছেন তারা বেশিরভাগ সড়ক দুর্ঘটনার রোগী। যার বেশিরভাগই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত।
সেখানে কথা হয় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত ঠাকুরগাঁওয়ের মো. রাশেদ ও ফরিদপুরের ভাঙ্গা থানার আব্দুর রহমানের সঙ্গে। পেশায় ভেটেরিনারি চিকিৎসক আব্দুর রহমান বলেন, গত ৮ ফেব্রুয়ারি সকালে ভাঙ্গা হাইওয়ের সার্ভিস রোডে তার মোটরসাইকেলের সঙ্গে একটি নসিমনের সংঘর্ষ হয়। এতে তিনি ও তার ব্যক্তিগত চালক সাগর; দুজনেরই পা ভেঙে যায়। দুজনই এই হাসপাতালে ভর্তি।
এ ওয়ার্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত সেবিকারা জানিয়েছেন, গতকাল এখানে মোট ভর্তি রোগী ছিলেন ৭৮ জন, যাদের বেশিরভাগই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় বিভিন্ন অঙ্গ হারিয়েছেন।
এ বিষয়ে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আমাদের হাসপাতালে প্রতিদিনই সড়ক দুর্ঘটনার রোগী আসেন। এর মধ্যে কিছু রোগী এমন অবস্থায় আসেন, যাদের হাত-পা, কবজি ও শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে ফেলতে হয়। এখন এ ধরনের রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। পা কাটতে হয় তখনই, যখন রক্তনালি ফুলে যায়। এটা তখনই হয় যখন রক্ত চলাচল হয় না, মাংস মরে যায়। তখন আমাদের কেটে ফেলা ছাড়া উপায় থাকে না। অনেক সময় এমন রোগী আসে যাদের হাত-পা ভেঙে হাড় বাইরে চলে আসে। অনেকের মাংস উড়ে যায়, আবার অনেকের মাংসের ভেতরে ময়লা ঢুকে যায়। ময়লা ঢুকে গেলে তখন ইনফেকশন হয়, তখন আবার কাটতে হয়।
জাহাঙ্গীর আলম আরও বলেন, তারা মাসে ৫-১০টা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কাটার রোগী পান। আর প্রতিদিন জরুরি বিভাগে গড়ে ২৫০ রোগী, আর ইনডোর-আউটডোর মিলিয়ে মোট দুই হাজার রোগীকে সেবা দেন। তার মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনার রোগীই বেশি। এর মধ্যে আবার মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার রোগী বেশি।
এই চিকিৎসক মনে করেন, এর জন্য এককভাবে কেউ দায়ী নয়, এর পরিমাণ কমাতে সড়কের সঙ্গে জড়িত সব বিষয়কেই দেখতে হবে। বাংলাদেশে আইন না মানার প্রবণতা এবং সড়ক ও যানবহনের অব্যবস্থাপনার কারণে কেউ ভালো গাড়ি চালাতে পারলেই দুর্ঘটনার শিকার হবেন না, এ ধরনের নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবেন না।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২ সালে ৬ হাজার ৭৪৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ৯৫১ জন নিহত ও ১২ হাজার ৩৫৬ জন আহত হয়েছেন। তাদের হিসাব অনুযায়ী ২০২১ সালে ৫ হাজার ৬২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৮০৯ জন নিহত ও ৯ হাজার ৩৯ জন আহত হয়েছেন। আর ২০২০ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় ৬ হাজার ৬৮৬ জন নিহত ও ৮ হাজার ৬০০ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনার জন্য মোটরসাইকেল দায়ী বলে দাবি করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের বড় অংশকেই পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়। তবে এর সঠিক সংখ্যা কারও কাছে নেই।
সড়কে দুর্ঘটনা কমাতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে জানতে চাইলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদার বলেন, আমরা মহাসড়কে হাইওয়ে পুলিশকে নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছি। বিশেষ করে টিনেজারদের উচ্চগতিতে মোটরসাইকেল চালাতে দেখলেই অভিভাবক ডেকে জানানোর কথা বলেছি। এ ছাড়া আমরা একটা নীতিমালা করছি, যাতে ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া মোটরসাইকেল বিক্রি না করা হয়।