হিরা তালুকদার
প্রকাশ : ১৩ মার্চ ২০২৩ ১১:১৪ এএম
ফাইল ফটো
বছরের পর বছর মামলা চালাতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে যান অনেকেই। আবার মামলার নিষ্পত্তি হলেও বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে থেকে যায় শত্রুতা। মূলত এসব কারণে মানুষকে মামলার গ্রাস থেকে রেহাই দিতেই বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (অলটারনেটিভ ডিসপুট রিসল্যুশন বা এডিআর) ব্যবস্থা চালু করেছে সরকার।
দেশের প্রচলিত আইন সংশোধন করেই এটি করার কথা ছিল। কিন্তু এখন সে অবস্থান থেকে সরে এসে আইন সংশোধন না করেই মামলাজট কমাতে চালু থাকছে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি। আইন মন্ত্রণালয় সূত্র এই তথ্য জানিয়েছে।
২০১৫ সালের জুলাই মাস থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে লিগ্যাল এইড অফিসে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি কার্যক্রম শুরু হয়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কেবল ২০২২ সালে ৩৭ হাজার ৮৬০ জন মামলা করার আগেই এডিআর করার জন্য লিগ্যাল এইড অফিসে গিয়েছেন। এ পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে যে, মানুষ এখন মামলা করার আগেই তাদের বিরোধ মেটাতে উৎসাহবোধ করছেন। তাই বর্তমান আইন সংশোধন না করেই দ্রুত মামলাজট কমাতে সারা দেশে পূর্ণাঙ্গভাবে থাকছে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি।
এ ব্যাপারে আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বিদ্যমান আইন ও বিধিমালার মাধ্যমেই বিকল্প পদ্ধতিতে বিরোধ নিষ্পত্তি করা সম্ভব হচ্ছে। তাই এ পর্যায়ে প্রচলিত আইন সংশোধনের পরিকল্পনা সরকারের নেই। যত দ্রুত সম্ভব এডিআর সারা দেশে চালু করতে হবে।
মন্ত্রী বলেন, জমির মালিকানাসংক্রান্ত বিরোধ কমিয়ে আনার জন্য আইনানুগ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ছাড়পত্রের বিধান করার কোনো পরিকল্পনা আপাতত সরকারের নেই। তবে জমির মালিকানাসংক্রান্ত বিরোধ হ্রাস করার জন্য সরকার কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে দেশের ভূমি নিবন্ধনে জনবান্ধব ই-রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় সাব-রেজিস্ট্রি অফিস ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসকে প্রশাসনিক এখতিয়ারের মধ্যে রেখে ইতোমধ্যে আন্তঃসংযোগ স্থাপন করা হয়েছে। এসবই হচ্ছে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে।
ফৌজদারি ও দেওয়ানি কার্যবিধি সংশোধন করে সেখানেও বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করায় অর্থঋণ আদালতে সুফল আসা শুরু হয়েছে বলে জানান আইনমন্ত্রী।
আনিসুল হক বলেন অনিয়ম, দুর্নীতি ও তথ্য সরবরাহকারীদের সুরক্ষা আইন বর্তমানে সংসদীয় কমিটির তত্ত্বাবধানে পর্যালোচনা হচ্ছে। যদি কোনো ব্যক্তি তার মামলাগুলো আপস মীমাংসার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে চান, তাহলে তিনি জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে শরণাপন্ন হতে পারেন। সেখানে দ্রুত সময়ের মধ্যে তার বিরোধ বা মামলা নিষ্পত্তির জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন দায়িত্বে থাকা বিচারক।
মন্ত্রী আক্ষেপ করে বলেন, অর্থঋণ আদালতের মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা হলে হাজার হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ অনাদায়ী থেকে যায়। উল্টো মামলাগুলোর পেছনে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর যেমন ব্যয় হয়, তেমনি ব্যবস্থাপনায় সৃষ্টি হয় জটিলতা। বিষয়টি বিবেচনা করেই অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩ সংশোধন করে আদালতের বাইরে এডিআর পদ্ধতিতে মামলা নিষ্পত্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কিন্তু লক্ষণীয় যে, বিভিন্ন কারণে এ পদ্ধতির সফল প্রয়োগ হচ্ছে না।
২০১৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি আইনি পরামর্শ ও বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বিধান প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করা হয়। এরপর লিগ্যাল এইড অফিসাররা ২০১৫ সালের জুলাই মাস থেকে জেলা পর্যায়ে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতির প্রয়োগ শুরু করেন। যা এখন পর্যন্ত চলমান।
আইন মন্ত্রণালয় সূত্র আরও জানায়, সিনিয়র সহকারী জজ পদমর্যাদার কর্মকর্তা জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার হিসেবে মামলা পূর্ববিরোধ (প্রি-কেস) এবং চলমান মামলা মধ্যস্থতার মাধ্যমে নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিয়ে থাকেন। ২০১৭ সালের ২১ সেপ্টেম্বর দেওয়ানি কার্যবিধি ১৯০৮-এর ৮৯-এ ধারা সংশোধন করে মধ্যস্থতার মাধ্যমে মামলার নিষ্পত্তির জন্য আদালত থেকে লিগ্যাল এইড অফিসারের কাছে মামলা পাঠানোর ক্ষমতা দেওয়া হয়। জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার আপসযোগ্য বিরোধ (প্রি-কেস) ও রেফার করা মামলা (পোস্ট কেস) মধ্যস্থতার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করে আসছেন।
এডিআর এমন একটা পদ্ধতি, যার মাধ্যমে মধ্যস্থতাকারী ব্যক্তির উপস্থিতিতে আদালতের ভেতরে বা বাইরে বসেও বিরোধ নিষ্পত্তি করা যায়। এডিআরের মাধ্যমে একটি মামলা নিষ্পত্তি হতে সময় লাগে ৯০ দিন। উকিলের খরচ লাগে না বললেই চলে। এতে উভয় পক্ষই লাভবান হয়। যদি কোনো মামলা এডিআরের মাধ্যমে নিষ্পত্তি না হয়, তাহলে মামলাটি আদালতে চলে যায়।
সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, মামলাজট দূর করার জন্য বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে আইন সংশোধন না করেই এটা করা যেতে পারে। এতে করে অনেক মামলার নিষ্পত্তি হয়ে যাবে দুই-এক মাসের মধ্যেই। না হলে মামলার জট কমানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।
অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন বলেন, বিচারিক আদালত ও সুপ্রিম কোর্টে প্রায় ৩৮ লাখ মামলার জট। এত মামলা নিষ্পত্তি করতে রাষ্ট্রপক্ষ ও বিচারকরা হিমশিম খাচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে আইন সংশোধন না করেই যদি বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি পুরোপুরি চালু করা হয়, সেটা দেশের মানুষের জন্যই মঙ্গল হবে। কারণ এতে মামলাজট দ্রুত কমে যাবে।