রাশেদ মেহেদী
প্রকাশ : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১০:১৭ এএম
ফাইল ফটো
সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়ায় ভার্চুয়াল জগতে পিছিয়ে পড়ছে বাংলা। অথচ বাংলা কনটেন্ট ছড়িয়ে দিতে কম্পিউটারে এবং স্মার্টফোনে বাংলা লেখার কি-বোর্ড উদ্ভাবিত হয়েছে অনেক আগেই। কিন্তু বাংলাকে ভার্চুয়াল জগতে বোধগম্য করার একটি উদ্যোগ সরকারি অর্থ বরাদ্দের অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে।
একটি প্রকল্পের উদ্বোধন করা হলেও সেটি থেকে নির্মিত সফটওয়্যার পরে আর কার্যকর হয়নি। অন্যদিকে চলমান প্রকল্প চলছে ধীরগতিতে। এসব কারণে বিশ্বের প্রায় ২৫ কোটি মানুষের মুখের মাতৃভাষা হিসেবে পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম ভাষা বাংলা তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ভার্চুয়াল জগতে পিছিয়ে পড়েছে।
তথ্যানুসন্ধানে দেখা গেছে, তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে বাংলাকে অন্য ভাষার মানুষের কাছে বোধগম্য করে তুলে এটিকে একটি বৈশ্বিক রূপ দেওয়ার প্রকল্পে বারবার অর্থ সংকট, অবহেলা ও দীর্ঘসূত্রতার ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ ‘গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধকরণ’ শীর্ষক প্রকল্পের মেয়াদ তিন বছর থেকে আট বছর পর্যন্ত বাড়ানোর ফলে ভার্চুয়াল জগতে বাংলাকে অন্যতম বৈশ্বিক ভাষায় রূপান্তর করার প্রক্রিয়া আবারও দীর্ঘসূত্রতার মুখে পড়েছে।
অবশ্য তথ্যপ্রযুক্তি দুনিয়ায় বহুমুখী সেবা দেওয়ার বৃহত্তম প্রতিষ্ঠান গুগলের কল্যাণে ভার্চুয়াল জগতে বাংলা অনেকটাই সম্প্রসারিত হয়েছে। গুগলের ট্রান্সলেটর বাংলাদেশে ১৫২টি ভাষায় অনুবাদের সুযোগ করে দিচ্ছে। বাংলা করপাস বলতে এখন যতটুকু আছে, তাও গুগলের ব্যবসায়িক প্রয়োজন থেকেই তৈরি করা। এদিকে ২০১৫ সালে সাড়ম্বরে বাংলা অপটিক্যাল ক্যারেক্টার রিডার (ওসিআর) সফটওয়্যার তৈরি করা হলেও ২০২৩ সালে এসে সেটি খোদ বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের ওয়েবসাইট থেকেই আর ডাউনলোড করা যাচ্ছে না।
অর্থের অভাবে বন্ধ ইউএনএল প্রকল্প
ইউনিভার্সাল নেটওয়ার্কিং ল্যাঙ্গুয়েজ (ইউএনএল) প্রোগ্রামে যুক্ত আছে বিশ্বের ১৫২টি ভাষা। কিন্তু উদ্যোগ নিয়েও ইউএনএল প্রোগ্রামে বাংলাকে যুক্ত করার প্রচেষ্টা সফল হয়নি। ইন্টারনেটভিত্তিক এই প্রযুক্তির মাধ্যমে এই প্রোগ্রামভুক্ত একটি ভাষাকে অন্য ভাষায় রূপান্তর করা যায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে। এ কারণে মানুষ খুব সহজে অনলাইনে বিনামূল্যে মাতৃভাষায় পড়ার সেবা ও সুযোগ পাচ্ছে। ইংরেজি, ফারসি, চায়না, আরবি, হিন্দি, বাহাসাসহ বিশ্বের ১৫২টি ভাষা এই প্রোগ্রামের আওতায় এসেছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতের ভাষা হিন্দি ইউএনএল-এর আওতায় এসেছে ২০১১ সালে।
তথ্যানুসন্ধানে দেখা যায়, ১৯৯৬ সালে ইউএনএল প্রোগ্রাম উদ্ভাবন করে টোকিওর ইউনাইটেড নেশনস ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্স স্টাডিজ। পরে জাতিসংঘের ইউনেস্কোর তত্ত্বাবধানে এই প্রোগ্রাম প্রসারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ইউনাইটেড নেশনস ইউনিভার্সিটি ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠা করে ইউএনডিএল ফাউন্ডেশন। এই ফাউন্ডেশনই বর্তমানে একটি দেশের রাষ্ট্রীয় ভাষাকে ইউএনএলে রূপান্তর করার বিষয়ে অনুমোদন ও সহযোগিতা দিচ্ছে।
২০১০ সালে বাংলাকে ইউএনএলের অন্তর্ভুক্ত করার কাজ শুরু করে এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ। তখন এ নিয়ে গবেষণার জন্য বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। এ কাজের জন্য সরকারি অর্থ বরাদ্দ চায় এশিয়াটিক সোসাইটি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ায় প্রকল্পটি এগোয়নি। পরে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটকে যুক্ত করে এ প্রকল্প এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টাও সফল হয়নি।
এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক অধ্যাপক হাকিম আরিফ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর এ প্রকল্প সম্পর্কে কিছু শোনেননি। তার দায়িত্ব নেওয়ার আগেও এ ধরনের কোনো প্রকল্প ছিল বলে তার জানা নেই। তিনি বলেন, সম্ভবত এশিয়াটিক সোসাইটির সেই উদ্যোগ পরে আর এগোয়নি।
‘গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধকরণ’ প্রকল্পে ধীরগতি
ইউএনএল প্রোগ্রামে বাংলাকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রকল্প সরকারি বরাদ্দ না পেলেও ২০১৬ সালে সরকারের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের উদ্যোগে তথ্যপ্রযুক্তি জগতে বাংলা ভাষার সমৃদ্ধ অবস্থান তৈরির লক্ষ্যে একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। ১৬টি উপাদান বা টুলস যুক্ত করে এই প্রকল্প নেওয়া হয়। এ প্রকল্পের অন্যতম উপাদান ছিল বাংলা করপাস। করপাস হচ্ছে অনলাইন জগতে কোনো একটি ভাষার বিপুল শব্দসম্ভার। এখানে ওই ভাষার বিভিন্ন প্রবাদ, আঞ্চলিক ভাষার প্রমিত রূপ, প্রাচীন শব্দ এবং বিভিন্ন ধরনের প্রতিশব্দও থাকে। ফলে যেকোনো ভাষা থেকে নিজের ভাষায় অনুবাদ ও অনলাইনে তথ্য খোঁজার কাজ সহজ হয়।
এই করপাসসহ প্রকল্পের বিভিন্ন টুলস হচ্ছে- বাংলা করপাস, বাংলা থেকে পৃথিবীর প্রধান ১০টি ভাষায় স্বয়ংক্রিয় অনুবাদক, বাংলা ওসিআর (টাইপ করা ও হাতের লেখা স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ও কম্পোজ), কথা থেকে লেখা ও লেখা থেকে কথায় রূপান্তর সফটওয়্যার, জাতীয় কি-বোর্ড (বাংলা), বাংলা ফন্ট রূপান্তর ইঞ্জিন, বাংলা বানান ও ব্যাকরণ সংশোধক, স্ক্রিন রিডার (লিখিত টেক্সট স্বয়ংক্রিয় পড়ে শোনানোর সফটওয়্যার), অনুভূতি বিশ্লেষণ সফটওয়্যার এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষার জন্য কি-বোর্ড।
২০১২ সালে এ প্রকল্পের রূপরেখা তৈরি করেন বর্তমান ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার। পরে ২০১৬ সালে তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের অধীনে এই প্রকল্প নেওয়া হয় ১৫৯ কোটি টাকা ব্যয় ধরে। প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদ ছিল ২০১৯ সাল পর্য়ন্ত। তবে ২০১৯ সাল পর্যন্ত এ প্রকল্পের একটি টুলসও সম্পন্ন হয়নি। ফলে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৪ সাল পর্যন্ত করা হয়। তবে ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের বর্তমান সময়ের মধ্যেও কোনো টুল সম্পূর্ণভাবে নির্মাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ।
প্রসঙ্গত, এর আগে ২০১৫ সালে তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের অধীন বাংলা ওসিআর আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচন করে তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের আওতাভুক্ত বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ‘এটুআই প্রকল্পের’ সহায়তায় এই ওসিআর তৈরি হয়, যা বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের ওয়েবসাইট থেকে বিনামূল্যে ডাউনলোডের অপশন রাখা হয়। তবে শুরু থেকেই এটি ডাউনলোড করা সম্ভব হচ্ছে না, এমন অভিযোগ ছিল। ২০২৩ সালে এসে দেখা যায়, কাউন্সিলের ওয়েবসাইটে সেই ওসিআরের প্রথম এবং হালনাগাদকৃত দুটি ভার্সন আছে; কিন্তু ডাউনলোড করতে গেলে নোটিফিকেশন আসে ‘পেজ নট ফাউন্ড’।
একটি সূত্র জানায়, এর আগেও সরকারি ৫০০ অ্যাপ তৈরি প্রকল্পের ফলাফল শূন্য হয়েছে। এখন তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধ করার এ প্রকল্পটির পরিণতিও একই হতে পারে। কারণ এটি বাস্তবায়নে খুব বেশি আগ্রহ নেই প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের। অবশ্য প্রকল্পের ভারপ্রাপ্ত প্রকল্প পরিচালক মাহবুব করিম জানান, ১৬টি টুলসের মধ্যে বাংলা করপাসের ছয়টি পর্যায় আছে। এর মধ্যে প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ হয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ চলছে। এ ছাড়া টেক্সট টু স্পিচের তিনটি পর্যায়ের কাজ চলছে। এভাবে প্রতিটি টুলস তৈরির কাজ চলছে। তিনি আশাবাদী যে, ২০২৪ সালের মধ্যে সব কাজ শেষ হয়ে যাবে।
ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী বলেন, ২০১২ সালে তিনি বাংলা করপাস তৈরির উদ্যোগ থেকেই এ ধরনের একটি প্রকল্প নিতে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা করেন। ২০১৬ সালে প্রকল্পটি নেওয়া হয়। পরে ২০১৮ সালে মন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি প্রকল্পটি অগ্রাধিকার দিয়ে বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেন। তবে পরে তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের দায়িত্বে আর না থাকায় এ প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে তার আর কিছু জানা নেই।