প্রাকৃতিক দুর্যোগ
ফারুক আহমাদ আরিফ
প্রকাশ : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ২২:৫১ পিএম
জামশেদ আলীর গোয়াল ভরা গরু ছিল। মাছ ছিল পুকুরে। আত্মীয়স্বজনের সমাগমও ছিল প্রচুর। সেই জামশেদ এখন ঢাকায় রিকশা চালিয়ে সংসার চালান। ধানমন্ডির সেন্ট্রাল রোডে কথা হয় তার সঙ্গে। একরাশ আক্ষেপ নিয়ে তিনি জানান, বন্যা ও নদীভাঙনে তার সবকিছু শেষ। এখন তিনি রাস্তার ভিখারি। পাঁচজনের সংসার তার। সেই ফেলে আসা স্মৃতিগুলো হাতড়ে বেড়ান। আশায় বুক বেঁধে আছেন হয়তো আবার সেই স্বর্ণালি দিন ফিরবে। তবে সেই সুখপাখির দেখা আদৌ কবে মিলবে তা ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দিয়ে রিকশার প্যাডেলে জোর দিলেন।
শুধু এই জামশেদ নয়, মো. হেলাল উদ্দীন ও মো. আবদুল মতিন নামের দুই ব্যক্তির সঙ্গে রাজধানী ঢাকার হাতিরপুলে কথা হয়। হেলাল উদ্দীনকে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, তার বাড়ি গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে। এক শতাংশ জমিও তার নেই। প্রাকৃতিক দুর্যোগ তার সবকিছু কেড়ে নিয়েছে।
আবদুল মতিনকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘ইল্যা কয়া নাব আছে? গাইবান্ধা সদর থানাতেই আমার বাড়ি। ছয় সদস্যের পরিবার। তিন মেয়ে ও এক ছেলের সংসারের জন্য আমাকে রাত-দিন রিকশায় প্যাডেল মারতে হয়। নদীভাঙনে তার স্বপ্ন খান খান হয়ে গেছে।’ তারা জানান, তাদের মতো অসংখ্য লোক দেশের আনাচে-কানাচে নদীভাঙন, বন্যাসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হয়ে স্থানান্তরিত হয়েছেন। অন্য জায়গায় গিয়ে বাসা বেঁধেছেন। কারও বড় বাড়িঘর রেখে ছোট্ট খুপরিতে ঠাঁই হয়েছে।
সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হুমায়ুন কবিরের নেতৃত্বে ‘লোকাল লেভেল অ্যাডাপ্টেশন অব ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যানডিউস ডিসপ্লেসড পিপল : প্রিপারেশন অব এন অ্যাকশন প্লান ফর সাসটেইনেবল লাইভলিহুড’ শীর্ষক গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। সেখানে নদীভাঙন, বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাস্তুচ্যুত মানুষদের কী অবস্থা, তা তুলে ধরা হয়েছে।
দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলা ও ভোলার দৌলতখান, উত্তরাঞ্চলের গাইবান্ধা সদর ও মধ্যাঞ্চল ফরিদপুর জেলার নড়িয়া উপজেলার ভুক্তভোগী মানুষ নিয়ে গবেষণাটি পরিচালিত হয়।
মোরেলগঞ্জের ৩ হাজার ৩৩ জন, দৌলতখানের ৪ হাজার ৫১২ জন, গাইবান্ধা সদরের এক হাজার ৬২৯ ও নড়িয়ার ৩ হাজার ১৪ জনসহ ১২ হাজার ১৮৮ জনের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। তাতে মোরেলগঞ্জে ৬ দশমিক ৩২ শতাংশ, দৌলতখানে ৪৪ দশমিক ৬৩ শতাংশ, গাইবান্ধায় ৩২ দশমিক ৫৭ শতাংশ ও নড়িয়ায় ৬৬ দশমিক ৪২ শতাংশ মানুষ গৃহহীন হয়েছেন।
২০১৮ সালের অপর একটি গবেষণায় দেখানো হয়, মোরেলগঞ্জ, দৌলতখান, গাইবান্ধা ও নড়িয়ায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে নিঃস্ব হয়ে ঢাকার বস্তিগুলোতে আশ্রয় নিয়ে ২০ শতাংশ মানুষ। প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ সাইক্লোন, ঘূর্ণিঝড়, মৌসুমি বন্যা, আগাম বন্যা, সমুদ্র লেভেলের উচ্চতা বৃদ্ধি ইত্যাদি।
ভোলায় ১৯৯০ সালে কৃষিজমির পরিমাণ ছিল ১১১৩ দশমিক ৬৬ বর্গকিলোমিটার ও মানববসতি ছিল ৬৮৩ দশমিক ০৪ বর্গকিলোমিটারে। ২০১৮ সালে কৃষিজমির পরিমাণ কমে নেমেছে ৯০৬ দশমিক ৭০ ও মানববসতি ১০১২ দশমিক ৩৮ কিলোমিটার। অর্থাৎ ২৮ বছরে কৃষিজমি কমেছে ২০৬ দশমিক ৯৬ বর্গকিলোমিটার। মানববসতি বেড়েছে ৩২৯ দশমিক ৩৪ শতাংশ।
ক্ষতিগ্রস্ত এসব পরিবারের সদস্যসংখ্যা মোরেলগঞ্জে ৪.৪৭ শতাংশ, দৌলতখানে ৪.৯৩, গাইবান্ধায় ৪.৪৮ ও নড়িয়ায় ৪.৯ শতাংশ। তাদের মধ্যে ৬৭ থেকে ৮৪ শতাংশ মানুষ পরবর্তী সময়ে ছোট্ট ঘরে বসবাস করছেন।
সর্বস্ব হারানো এসব জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন আয়েও বিশাল পার্থক্য নেমে আসে। যেখানে নিজের জমিজমা চাষ ও অন্যান্য পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আয় ছিল পর্যাপ্ত, এখন তা অনেক নিচে নেমে গেছে। এদের মধ্যে মাসে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা হয় মোরেলগঞ্জে এমন পরিবারের সংখ্যা ৪৮ দশমিক ২ শতাংশ, দৌলতখানে ৪৯ দশমিক ৮২ শতাংশ, গাইবান্ধায় ২৯ দশমিক ৩২ ও নড়িয়ায় ৪৪ দশমিক ৮৯ শতাংশ। ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা আয় করতে পারেন নড়িয়ার ১৩ দশমিক ১৭ শতাংশ পরিবার, মোরেলগঞ্জের ৩২ দশমিক ৬১, দৌলতখানের ২২ দশমিক ১৬ ও গাইবান্ধার ৪৩ দশমিক ২১ শতাংশ পরিবার। গড়ে এসব পরিবার নড়িয়ার ২৬ হাজার, মোরেলগঞ্জের ১৫ হাজার, দৌলতখানের ১৮ হাজার ও গাইবান্ধার পরিবার ১২ হাজার টাকা আয় করে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগে আক্রান্ত হয়ে স্বাস্থ্যগত সমস্যায় সবচেয়ে বেশি শিকার হয় দৌলতখান উপজেলার মানুষ। তাদের মধ্যে এ হার ৯০ দশমিক ৮৬ শতাংশ ও সবচেয়ে কম গাইবান্ধায় ২৮ দশমিক ৩ শতাংশ। তবে জমি হারায় বেশি গাইবান্ধার মানুষ। এ হার ৭৬ শতাংশ ৫৪ শতাংশ। বাড়িঘর হারায় নড়িয়ার ৬৬.৭৯ শতাংশ মানুষ। মোরেলগঞ্জের ৮৩.৯১ শতাংশ মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। কৃষি ফসল ধ্বংস হয় সবচেয়ে বেশি গাইবান্ধায়, এই হার ৬৮.৩৬ শতাংশ। প্রাণহানির শীর্ষে দৌলতখানের মানুষ। সেখানে এ হার ৬.৫৯ শতাংশ। এই ৪ উপজেলার ৪০-৫৭ শতাংশ মানুষ ২-৫ বার এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে পড়েছে। তাদের মধ্যে ৮০ শতাংশ মানুষের কোনো পূর্বপ্রস্তুতি ছিল না।
অধ্যাপক হুমায়ুন কবির জানান, তাদের গবেষণাটির মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হয়ে বিভিন্ন জায়গায় স্থানান্তরিত হওয়া লোকদের কীভাবে নিজ নিজ এলাকায় রেখে বিকল্প আয়ের পথ করে দেওয়া যায়। তিন বছরের গবেষণায় তারা ১৫ হাজার ১৮০টি পরিবারে সমীক্ষা চালিয়ে পরবর্তী সময়ে ১৬শ মানুষকে নিয়ে স্যাম্পল তৈরি করেছে।
ক্ষতিগ্রস্ত লোকদেরকে নিজ এলাকায় রাখতে হলে তিনটি কাজ করতে হবে বলে জানান তিনি। তার মধ্যেÑ ১. বিকল্প আয়ের পথ বের করে দিতে হবে, ২. বাঁধ দিতে হবে, যাতে বন্যার পানি ঢুকতে না পারে এবং কৃষিকাজের ব্যবস্থা করা, ৩. প্রাকৃতিক দুর্যোগে আশ্রয় নেওয়ার জন্য বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।
গাইবান্ধা সদরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শরীফুল আলমের কাছে প্রাকৃতিক দুর্যোগে আক্রান্তদের জন্য কী ধরনের কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আমাদের কামারজানি ও মোল্লাচর; তা ছাড়া চরাঞ্চলে ব্যারাক হাউস নির্মাণ করে দেওয়া হচ্ছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৮১ লাখ টাকা ব্যয় করে এক হাজার মানুষকে বাড়িঘর নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, চরাঞ্চলে বন্যাসহায়ক ফসলের আবাদ বাড়াতে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে সরকারের কাছে। তা ছাড়া চরাঞ্চলের জন্য বিশেষ প্রকল্প নেওয়ার পরিকল্পনা নিতে অনুরোধ জানানো হয়েছে। নদী নতুন করে ভাঙনের শিকার যাতে না হয় সেজন্য দু’পাড়ে গাছপালা লাগানো, ড্রেজিং ইত্যাদির বিষয়ে কথা বলা হয়েছে।
নদীভাঙন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হওয়া এসব জনমানবকে সেই অঞ্চলে রেখে কী ধরনের উন্নয়ন কাজ ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যায় জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর অধ্যাপক আতিউর রহমান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, জলবায়ু সংকটে প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরিমাণ ও তীব্রতা বাড়ছেই। বন্যার কারণে নদীর তীর ভাঙে। নদীভাঙা মানুষ জমি হারিয়ে অনেকেই চরে ঠিকানা খুঁজে নেন। অনেকে শহরে বা উপশহরে চলে যান কাজের সন্ধানে। বন্যার সময় চরের অনেক ঘর ডুবে যায়। তারা তখন বাঁধে আশ্রয় নেন। নদীভাঙা মানুষও একইভাবে অস্থায়ী আশ্রয় খুঁজে নেন। এদের আয়-রোজগারের সুযোগ অপর্যাপ্ত। তাই তাদের জন্য স্থিতিশীল কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে হলে শিল্পের বিকাশ অপরিহার্য। তাই বেশি সংখ্যক বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল কিংবা ইপিজেড গড়তে পারলে এদের কর্মসংস্থান দেওয়া সম্ভব। তাদের কেউ কেউ আবার ক্ষুদ্র ও ছোটখাটো ব্যবসা-বাণিজ্যের উদ্যোক্তা হিসেবেও স্বাবলম্বী হবার চেষ্টায় লিপ্ত। তাদের জন্য বেশি করে পুঁজি ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, জলবায়ুর পরিবর্তন খারাপের দিকে। প্রচুর মানুষ ভিটামাটি হারাচ্ছেন। আগামীতে এই সংখ্যা আরও বাড়বে। কত বাড়বে তার হিসাব বলা যায় না। যেখানে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর বড় ধরনের উদ্যোগ ও ব্যবস্থা নেওয়া কথা ছিল তারা কিছুই করছে না। আশানুরূপ সাহায্য দিচ্ছে না। বসবাসের জন্য এসব মানুষকে গ্রামেও বহুতল বাড়ি করে পুনর্বাসন করা দরকার। সরকার কিছু করতে চেষ্টা করছে, কিন্তু পর্যাপ্ত না। তবে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর এ বিষয়ে অর্থায়ন করা প্রয়োজন, কিন্তু পাওয়া যাচ্ছে না।
অপর প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নদীভাঙন এলাকার মানুষকে তো স্থানীয়ভাবে রাখার সুযোগ নেই। কেননা তারা তো সবকিছু হারিয়ে ফেলছেন। হয়তো অন্য এলাকা বা থানায় স্থান দিতে হবে। সব স্থানে সম্ভব হবে না।
দৌলতখান, নড়িয়া, মোরেলগঞ্জ ও গাইবান্ধা সদরের প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হওয়া মানুষের ব্যাপারে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিনকে প্রশ্ন করা হলে তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, গবেষণাটি তার দৃষ্টিগোচর হয়েছে। এই গবেষণায় এসব দুর্যোগপ্রবণ মানুষের জন্য যে বিষয়গুলো পরামর্শ দেওয়া হবে, পর্যায়ক্রমে সরকার তা বাস্তবায়নে চেষ্টা চালাবে। তা ছাড়া অন্যান্য স্থানেও যদি পরামর্শগুলো বাস্তবসম্মত হয় সেখানেও তা কার্যকরে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।