ফেনী প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১২:৩০ পিএম
ফেনী জেনারেল হাসপাতাল। প্রবা ফটো
ফেনী ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ডায়ালাইসিস সেবা দেওয়া শুরু হয়। বর্তমানে প্রতিদিন ২৪ জন রোগী এ সেবা পেয়ে থাকেন, যা চাহিদার তুলনায় খুবই নগণ্য। এর চেয়ে কয়েকগুণ বেশি ডায়ালাইসিস সেবা পেতে আবেদন করেছেন বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালীদের সুপারিশে সেবা দেওয়ারও।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, এখানে ১০টি ডায়ালাইসিস বেডের মধ্যে ২টি হেমোডায়ালাইসিস বেড। বাকি ৮টি বেডে প্রতিদিন ৩ জন করে ২৪ জনকে ডায়ালাইসিস করা হয়। প্রতি রোগীকে ডায়ালাইসিস করতে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা সময় লাগে। প্রত্যেককে সপ্তাহে দুইবার ডায়ালাইসিস সুবিধা দেওয়া হয়। ৬ মাসের প্যাকেজে প্রত্যেকে ৪৮টি ডায়ালাইসিস পেয়ে থাকেন। এজন্য রোগীকে ২২ হাজার টাকা ফি দিতে হয়। ৬ মাসের মধ্যে রোগীর উন্নতি না হলে তাকে আবার নতুন প্যাকেজে ভর্তি হতে হয়। ফলে নতুন কোনো রোগীর ডায়ালাইসিসের জন্য সিরিয়াল পাওয়া জটিল হয়ে পড়েছে। কারণ ডায়ালাইসিসের রোগীরা যতদিন বেঁচে থাকবেন ততদিনই ডায়ালাইসিস করাতে হবে।
যারা আর্থিক সংকটের কারণে প্রাইভেট হাসপাতাল কিংবা ক্লিনিকে ডায়ালাইসিস করাতে পারেন না তারাই সরকারি হাসপাতালে ঝুঁকে থাকেন। কিন্তু জেনারেল হাসপাতালের সেবার মান ভালো হওয়ায় সামর্থ্যবানরাও সেবা নিতে ঝুঁকছেন। অভিযোগ আছে প্রভাবশালীদের সুপারিশে তাদেরকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। গরিব-অসহায় রোগীরা সেবা পাচ্ছেন না, মাসের পর মাস তাদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
সাবিনা আক্তার নামে একজন জানান, তার স্বামী সামান্য বেতনে চাকরি করতেন। বেশ কিছুদিন যাবৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশী থেকে টাকা নিয়ে চিকিৎসা চলছে। তার কিডনি সমস্যার কারণে ডায়ালাইসিস খুবই জরুরি বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। ফেনী জেনারেল হাসপাতালে আবেদন করার পর প্রায় বছর চলে গেছে, কিন্তু এখনও সিরিয়াল পাওয়া যাচ্ছে না। স্বামীর চিকিৎসার বাড়তি টাকা কীভাবে জোগাড় হবে সে চিন্তায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। জীবিকা নির্বাহের জন্য গৃহকর্মীর কাজ করছেন। চাহিদা অনুযায়ী রোগীর ডায়ালাইসিস করানোর ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
ফখরুল ইসলাম, আশরাফ হোসেন, নুরুল আফসারসহ কয়েকজন রোগী জানান, ‘মাসের পর মাস চলে যাচ্ছে কিন্তু ডায়ালাইসিস করার জন্য সিরিয়াল পাওয়া যাচ্ছে না। ফেনী জেনারেল হাসপাতালে ডায়ালাইসিস যেন সোনার হরিণ হয়ে গেছে। আমরা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী না হওয়ায় সরকারি হাসপাতালে কম খরচে চিকিৎসাসেবা নিতে আসি। কিন্তু বিত্তবান ও প্রভাবশালীদের তদবিরের কারণে সেটা সম্ভব হচ্ছে না। প্রয়োজনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আবেদনগুলো স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করতে পারেন। অসহায় ব্যক্তিরা যেন এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত না হয় সেদিকে তাদের নজর রাখতে হবে।’
তারা আক্ষেপ করে বলেন, ‘সাধারণত সরকারি হাসপাতালে দিনমজুর কিংবা অসচ্ছল ব্যক্তিরা ভর্তি হন। এখন সেবার মান ভালো হওয়ায় প্রভাবশালীরাও ভর্তি হচ্ছেন। গরিব হওয়ার কারণে সব জায়গায় আমরা সেবা ও সুবিধা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছি।’
হাসপাতালে আবাসিক মেডিকেল অফিসার আসিফ ইকবাল জানান, হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক বরাবর লিখিত আবেদনকারী নির্দিষ্ট রোগীর বাইরে ডায়ালাইসিস করানো সম্ভব নয়। একজনের শিডিউল আরেকজনকে দেওয়া যায়। রোগীর ডায়ালাইসিসের ৬ মাসের প্যাকেজ রয়েছে। যাদের শুরু হয় তাদের সারাজীবনই করতে হয়, ৬ মাসেও শেষ হয় না। এজন্য নতুন করে আবার প্যাকেজ করতে হয়। কোনো রোগী মারা গেলে নতুনরা আবেদনের সুযোগ পেয়ে থাকেন।
তিনি বলেন, ‘২০২১ সালের অনেক রোগীকে ডায়ালাইসিস করানো যায়নি। তারা এখনও অপেক্ষমাণ রয়েছেন। গত ৬ মাসে নতুন একজনকে যুক্ত করতে পেরেছি। রোগীর সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে।’
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, আরও ১০ বেডে ডায়ালাইসিস চালু করার মতো কক্ষ রয়েছে। এ ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে অবহিত করা হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অনুমতি দিলে এসব বেডে নতুন রোগীদের ডায়ালাইসিস করা যাবে। সেক্ষেত্রে প্রতিদিন ৪৮ জন রোগী ডায়ালাইসিস সেবা পাবেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক আবুল খায়ের মিয়াজী বলেন, ‘কোনো প্রভাবশালীর তদবিরে রোগী সিরিয়াল দেওয়া হয় এ কথাটি সত্য নয়। আবেদনকৃত ও অপেক্ষমাণ রোগী চার শতাধিক হবে। সে তুলনায় আমাদের শয্যাসংখ্যা খুবই কম।’