× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বিপর্যয়ে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’

রাশেদ মেহেদী

প্রকাশ : ২৪ জানুয়ারি ২০২৩ ১০:৪৪ এএম

আপডেট : ২৪ জানুয়ারি ২০২৩ ১৩:৫৮ পিএম

বিপর্যয়ে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’

অবৈধ পথে আসা মোবাইল হ্যান্ডসেটে সয়লাব দেশের বাজার। এর ধাক্কায় বিপর্যস্ত দেশে স্থাপিত স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের কারখানাগুলো। এসব কারখানায় উৎপাদিত হ্যান্ডসেট বিক্রি কমেছে আশঙ্কাজনক হারে।

এভাবে চলতে থাকলে সরকারের ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ বাস্তবায়ন পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে পারে। বিদেশি কোম্পানিগুলোও এক সময় ফিরে যেতে পারে তাদের সমুদয় বিনিয়োগ তুলে নিয়ে। সেই দুশ্চিন্তাই এখন ভর করে আছে দেশে মোবাইল ফোন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মাথার ওপর। 

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থার (বিটিআরসি) ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য এবং হ্যান্ডসেট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিক্রির পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ২০২১ সালে দেশে উৎপাদিত মোবাইল ফোনসেট বিক্রির সংখ্যা ছিল ৩ কোটি ৬ লাখ ৮ হাজার ৪৯৩ ইউনিট। এর মধ্যে ফিচার ফোন ১ কোটি ৯২ লাখ ১৭ হাজার ৮৭৮ ও স্মার্টফোন ১ কোটি ১৩ লাখ ৯০ হাজার ৬১৫ ইউনিট। অন্যদিকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত (তৃতীয় প্রান্তিক) বিক্রির মোট পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৯২ লাখ ১৬ হাজার ৫৯ ইউনিট।

বিটিআরসির পরিসংখ্যান বলছে, একই বছরের প্রথম ৯ মাসে দেশে স্থাপিত কারখানাগুলোতে মোট উৎপাদিত হ্যান্ডসেটের পরিমাণ ছিল ২ কোটি ৫৭ লাখ ৯৯ হাজার ইউনিট। সে হিসাবে ওই ৯ মাসে উৎপাদিত হ্যান্ডসেটের মধ্যে ৬৫ লাখ ৮২ হাজার ৯৪১ ইউনিট অবিক্রীত থেকে গেছে, যা উৎপাদিত মোট হ্যান্ডসেটের ২৫ শতাংশ। 

উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, ২০২০ ও ২০২১ সালেও দেশে উৎপাদিত হ্যান্ডসেটের ৯৮ শতাংশই বিক্রি হয়েছে। পরের বছর ২৫ শতাংশ হ্যান্ডসেট অবিক্রীত থাকার বিষয়টি কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়। কারণ বাজারের চাহিদা দেখেই উৎপাদনের ইউনিটসংখ্যা নির্ধারণ করা হয়। এমন নয় যে, দেশের বাজারে আগের চেয়ে হ্যান্ডসেটের চাহিদা কমে গেছে। বরং সেটের চাহিদা অনেকটাই বেড়েছে। কিন্তু বাজারে ভাটার চিত্র অসঙ্গতিপূর্ণ। উৎপাদন ও বিক্রির এত তারতম্য হওয়ার কোনো যুক্তি নেই।

আর এই পরিস্থিতির নেপথ্য কারণ একটাই, তা হলো- ২০২২ সালজুড়ে দেশে অবৈধ পথে হ্যান্ডসেট ঢুকেছে প্রচুর। সেগুলোর বিক্রিও হয়েছে বেশ। আর এতে মার খেতে হচ্ছে দেশে স্মার্টফোন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে। বর্তমানে চরম বিপর্যয়ের মুখে রয়েছে তারা। এ অবস্থা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে মোবাইল সেটে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ লেখা স্টিকার বিলুপ্তির পথে চলে যেতে পারে। 

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, অবৈধ পথে হ্যান্ডসেট আসা বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে এরই মধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়া হয়েছে। কারণ হ্যান্ডসেট চোরাচালান বন্ধের দায়িত্ব কাস্টমস বিভাগের। অবৈধ পথে হ্যান্ডসেট আসার কারণে শুধু উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, সরকারও বড় অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে। আমি চাই অবৈধ পথে একটিও হ্যান্ডসেট যেন না আসে। 

বাংলাদেশ মোবাইল হ্যান্ডসেট উৎপাদন ও আমদানিকারকদের সংগঠন বিএমপিআইর সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া শহীদ বলেন, অবৈধভাবে হ্যান্ডসেট আসা বাড়তে থাকায় দেশে কারখানা স্থাপন করা প্রতিষ্ঠানগুলো বড় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে। অবস্থা এমন দাঁড়াচ্ছে যে, কারখানা টিকিয়ে রাখাই চ্যালেঞ্জ হয়ে গেছে। 

বিপর্যয়ের বছর ২০২২

বিটিআরসির পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এ বছরের শুরুর তুলনায় শেষের দিকে এসে মোবাইল হ্যান্ডসেটের উৎপাদন অর্ধেকের নিচে নেমে গেছে। জানুয়ারিতে দেশে মোট হ্যান্ডসেট উৎপাদন হয় ৪১ লাখ ৪৫ হাজার ইউনিট। ডিসেম্বরে কমে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭ লাখ ৫৩ হাজার ইউনিট। বছরের মাঝামাঝি সময়ে উৎপাদন কিছুটা বাড়লেও শেষ তিন মাসে দ্রুত কমতে থাকে। বছরের সর্বনিম্ন উৎপাদন ছিল নভেম্বরে ১৭ লাখ ২১ হাজার ইউনিট। প্রথম তিন মাসে উৎপাদন হয়েছে ৯৯ লাখ ৫৬ হাজার ইউনিট। দ্বিতীয় প্রান্তিকে ৮৬ লাখ ১০ হাজার, তৃতীয় প্রান্তিকে ৭২ লাখ ৩৩ হাজার এবং চতুর্থ প্রান্তিকে উৎপাদন হয়েছে ৫৬ লাখ ৭৩ হাজার ইউনিট। 

অন্যদিকে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিক্রির পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২২ সালের প্রথম তিন মাসে (প্রথম প্রান্তিক) মোট বিক্রির পরিমাণ ছিল ৬৬ লাখ ৫৬ হাজার ৩১৪ ইউনিট, দ্বিতীয় প্রান্তিকে ৬৯ লাখ ৩৯ হাজার ৮৬৫ ও তৃতীয় প্রান্তিকে ৫৬ লাখ ১৯ হাজার ৮৮০ ইউনিট। 

দেশীয় প্রতিষ্ঠান ওয়ালটন ছাড়াও বেশ কয়েকটি বিদেশি কোম্পানি বাংলাদেশে মোবাইল হ্যান্ডসেট উৎপাদন ও সংযোজন (অ্যাসেম্বল) করে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে স্যামসাং, টেকনো, অপো, শাওমি, সিম্ফনি, নকিয়া, আইটেল, জেডটিই, ওয়ান প্লাসের মতো নামি-দামি ব্র্যান্ড। 

দেশে হ্যান্ডসেট তৈরির কারখানা উৎসাহিত করতে সরকার ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে ৪৪টি যন্ত্রাংশে বড় ধরনের শুল্ক ছাড় দেয়। দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয় আমদানিকৃত হ্যান্ডসেটের শুল্ক। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে আরও ৪৪টি যন্ত্রাংশের শুল্ক কমানো হয়। বিপরীতে বিদেশে তৈরি মোবাইল ফোন আমদানিতে শুল্ক ১০ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়। এ কারণে একের পর এক বিদেশি কোম্পানি দেশে কারখানা স্থাপন করতে শুরু করে। দেশে উৎপাদিত মোবাইল হ্যান্ডসেটের দাম যেমন কম, মানের দিক দিয়েও উৎকৃষ্ট। তারপরও বিদেশ থেকে আসা অবৈধ হ্যান্ডসেটের দাপটে দেশীয় উৎপাদন কোণঠাসা হয়ে পড়ছে।

এ বিষয়ে হ্যান্ডসেট উৎপাদনকারী একটি প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বিশ্ববাজারে সাম্প্রতিক অস্থিরতার কারণে যন্ত্রাংশের সংকট এবং খরচ আগের চেয়ে কিছুটা বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন কমেছে। তবে মূল কারণ অবৈধ পথে আসা হ্যান্ডসেটের দৌরাত্ম্য। 

তিনি আরও বলেন, বছরের প্রথম ও দ্বিতীয় প্রান্তিকে বড় সংখ্যায় উৎপাদনের পরও প্রায় ৪০ শতাংশ হ্যান্ডসেট অবিক্রীত থেকে গেছে। অথচ বাজারে চাহিদা মোটেও কম ছিল না। এ কারণে তৃতীয় ও চতুর্থ প্রান্তিকে উৎপাদন কমিয়ে দেয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। এ ছাড়া উপায় ছিল না।

ঘোষণা দিয়ে বিক্রি হচ্ছে অবৈধ হ্যান্ডসেট

অনুসন্ধানে দেখা যায়, রাজধানীর বিভিন্ন মার্কেটে অবৈধ পথে আসা হ্যান্ডসেট ফেসবুকে পেজ খুলে ঘোষণা দিয়েই বিক্রি হচ্ছে। ফেসবুক পেজে দেখে রাজধানীর দুটি মার্কেটে সরেজমিনে যান এই প্রতিবেদক। দুই জায়গাতেই স্যামসাং ব্র্যান্ডের এস-২২ আল্ট্রা মডেলের হ্যান্ডসেটের দাম চাওয়া হয় ১ লাখ ৪ হাজার টাকা। একটি মার্কেটে দরকষাকষির পর ৪ হাজার টাকা কমিয়ে ১ লাখে দিতে রাজি হন শোরুমের কর্মচারী। এখানে ব্যবহার হওয়া হ্যান্ডসেটও পাওয়া যায় বলে জানান ওই দোকানি। সেই একই মডেলের ব্যবহৃত হ্যান্ডসেটের দাম চান তিনি ৮৮ হাজার টাকা।

হ্যান্ডসেটটি আসল কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আসলের চেয়েও বেশি আসল। এটা বাংলাদেশে নয়, দেশের বাইরে উৎপাদন করা এবং বাংলাদেশের নেটওয়ার্কে চলার শতভাগ গ্যারান্টিও রয়েছে।’

উৎপাদক কোম্পানি স্যামসাংয়ের শোরুমে এস-২২ আল্ট্রা সেটের মূল্য বর্তমানে ১ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। বছরের শুরুতে বাজারে আসার সময় দাম ছিল ১ লাখ ৭৯ হাজার টাকা। এভাবে ওয়ান প্লাস এবং ভিভো ব্র্যান্ডের হ্যান্ডসেটের দামও বাজারমূল্যের চেয়ে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা কম চাওয়া হয়। এ দুটি মার্কেটের বিভিন্ন শোরুমে আইফোনের নানা মডেলের স্মার্টফোনও কম দামে পাওয়া যায়। অবশ্য স্যামসাং, অপো, ভিভো ব্র্যান্ডের হ্যান্ডসেটের কারখানা বাংলাদেশে আছে এবং মোট চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশই এসব কারখানায় তৈরি হয়। তবে বাংলাদেশে আইফোনের কোনো কারখানা নেই। 

অবৈধ পথে হ্যান্ডসেট বাড়ছে কেন

বিএমপিআই সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া শহীদ বলেন, অবৈধ পথে হ্যান্ডসেট বৃদ্ধি ঠেকাতে ২০২১ সালের জুলাই মাসে এনইআইআর (ন্যাশনাল ইক্যুইপমেন্ট আইডেনটিটি রেজিস্ট্রার) চালু করেছিল বিটিআরসি। সে সময় সিদ্ধান্ত ছিল এনইআইআর ডেটাবেজে আইএমইআই (ইন্টারন্যাশনাল মোবাইল ইক্যুইপমেন্ট আইডেনটিটি) নিবন্ধিত না থাকলে সেসব হ্যান্ডসেটে সিমকার্ড মোবাইল অপারেটরদের নেটওয়ার্কে সচল হবে না। তখন বিটিআরসি নিয়মিত অভিযানও পরিচালনা করত। ফলে সে সময় অবৈধ পথে হ্যান্ডসেট আসার সংখ্যা প্রায় ১০ শতাংশে নেমে আসে। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে বিটিআরসি এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। ফলে আবারও অবৈধ পথে হ্যান্ডসেট আসা বেড়ে যায়। এখন বাজারে বিক্রি হওয়া সেটের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশই অবৈধ পথে আসা। 

বিদেশ থেকে কেনা হ্যান্ডসেট নিয়ে আসার পর তার নিবন্ধন নিয়ে জটিলতা দূর করতে বিটিআরসির সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিটিআরসি গ্রাহকদের ভোগান্তি দূর করতে কোনো সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপ নিলে তা নিয়ে আপত্তি নেই। কিন্তু উৎপাদকরা চান দেশে অবৈধ পথে হ্যান্ডসেট আসা বন্ধ হোক। কারণ যারা সরকারকে নিয়মিত কর দিয়ে বিপুল বিনিয়োগ করে দেশে কারখানা স্থাপন করেছেন, যারা মোবাইল হ্যান্ডসেট খাতে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ বাস্তবায়ন করেছেন, তারা ক্ষতির মুখে পড়লে দেশে প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদন খাতই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। 

এ বিষয়ে বিটিআরসির চেয়ারম্যান শ্যাম সুন্দর সিকদার বলেন, ‘এনইআইএর ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রাহকরা মোবাইল হ্যান্ডসেট কেনার সময় মেসেজ পাঠিয়ে তা বৈধ কি না জেনে নিতে পারছেন। এ ছাড়া বাজারে অবৈধ হ্যান্ডসেটের বিক্রি বন্ধে বিটিআরসি নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে।’ অভিযান আরও বাড়ানোর জন্য নির্দেশ দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা