× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

দখলদারের পক্ষে নদীরক্ষা কমিশন!

আমিনুল ইসলাম মিঠু

প্রকাশ : ১৮ জানুয়ারি ২০২৩ ১১:৩৯ এএম

দখলদারের পক্ষে নদীরক্ষা কমিশন!

প্রায় ৩৪ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের আওতায় সমীক্ষা চালিয়ে নদী দখলকারী প্রায় ৩৮ হাজার ব্যাক্তি-প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করেছে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন। কিন্তু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে ওই প্রকল্পের চূড়ান্ত প্রতিবেদন থেকে দখলদারদের নাম বাদ দিয়েছে সংস্থাটি।

আইনী জটিলতার ছুঁতো দেখিয়ে কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মনজুর আহমেদ চৌধুরী এককভাবে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এ নিয়ে কমিশনের সদস্য, প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তি ও নদী রক্ষা আন্দোলনে সম্পৃক্তরা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানালেও কমিশন চেয়ারম্যানের দাবি, এ সিদ্ধান্তে আইনের কোনও ব্যত্যয় ঘটেনি।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এককভাবে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার কমিশনের চেয়ারম্যানের নেই। তার সিদ্ধান্তের কারণে নদী রক্ষার কার্যক্রম ব্যাহত হবে, দখলদারেরা উৎসাহিত হবে।  

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, দখল-দূষণ থেকে দেশের নদনদীগুলোকে রক্ষার্থে গত কয়েক বছর ধরে নানামুখী তৎপরতা চালাচ্ছে সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালে ‘৪৮ নদী সমীক্ষা’ প্রকল্প হাতে নেয় নদী রক্ষা কমিশন। সরকারি অর্থায়নে ৩০ কোটি ২৭ লাখ টাকার প্রকল্পটি ২০২১ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু ওই বছরের আগস্টে মেয়াদ বাড়িয়ে প্রকল্পের সময়কাল নির্ধারণ করা হয় ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। মেয়াদের সঙ্গে প্রকল্পের খরচও বেড়েছে। গত ৩১ ডিসেম্বর শেষ হওয়া এ প্রকল্পে সবমিলিয়ে খরচ হয়েছে ৩৩ কোটি ৮২ লাখ ৯৭ হাজার টাকা। 

প্রকল্পের আওতায় দেশের ৪৮টি নদীতে সমীক্ষা চালিয়ে ৩৭ হাজার ৩৯৬ দখলদারের তালিকা করা হয়। গত ১৫ ডিসেম্বর নদী রক্ষা কমিশনের ৩২তম সভায় সংস্থার চেয়ারম্যান ড. মনজুর আহমেদ চৌধুরী প্রকল্পের চূড়ান্ত প্রতিবেদন থেকে দখলদারদের নাম, তথ্য ও সংখ্যা বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেন। শুধু চূড়ান্ত প্রতিবেদন থেকেই নয়; কমিশনের ডেটাবেইজ ও ওয়েবসাইট থেকেও দখল এবং দখলদারদের সব তথ্য মুছে ফেলার নির্দেশ দেন তিনি। ওই নির্দেশ অনুযায়ী এরই মধ্যে সব তথ্য মুছেও ফেলা হয়েছে। চেয়ারম্যানের এমন সিদ্ধান্তে হতবাক সভায় উপস্থিত কমিশনের কর্মকর্তা, নদী বিশেষজ্ঞ ও প্রকল্প পরিচালনাকারীরা। 

কার্যবিবরণী থেকে জানা গেছে, সেদিনের সভায় কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মনজুর আহমেদ চৌধুরী বলেছেন, ‘হাইকোর্টে নির্দেশনা মোতাবেক সিএস রেকর্ড অনুযায়ী না সমীক্ষা না করে পানি আইন, ২০১৩ অনুযায়ী নদীর অবৈধ দখল বা নদী তীরবর্তী স্থাপনার তালিকা করায় উক্ত তালিকা প্রকাশ করলে আইনগত ও প্রশাসনিক সমস্যা হতে পারে। তাই প্রকল্পের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের ৩০০ কপিতে অবৈধ দখল, নদী তীরবর্তী স্থাপনার নাম, তথ্য অথবা সংখ্যা কোনটিই প্রকাশ করা যাবে না।’

ওই সভায় নদী রক্ষা কমিশনের সদস্য মালিক ফিদা আব্দুল্লা খান বলেন, হাইকোর্টের সিএস রেকর্ড মোতাবেক অবৈধ দখলদার চিহ্নিত করা হয়নি বিধায় এই প্রকল্পের আওতায় চিহ্নিত ব্যাক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম কমিশনের ডেটাবেইজেও অন্তর্ভূক্ত কিংবা প্রকাশ করা যাবে না। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ৪৮ নদী সমীক্ষা প্রকল্পের বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদ মনির হোসেন চৌধুরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, পানি আইন (২০১৩) ও বন্দর আইন (১৯০৮) অনুসারে তারা সমীক্ষা চালিয়েছেন। এক্ষেত্রে তারা নদীর সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ পানির স্তরের মধ্যবর্তী অংশ, ঘোষিত নদী ও সমুদ্র বন্দর এলাকায় পানির সর্বোচ্চ স্তর থেকে তীরবর্তী মিটার এবং অন্যান্য একলাকায় পানির সর্বোচ্চ স্তর থেকে ১০ মিটার পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকাকে তালিকাভুক্ত করে দখলদার চিহ্নিত করা হয়েছে। 

কমিশন চেয়ারম্যানের আপত্তি প্রসঙ্গে মনির চৌধুরী বলেন, ‘তিনি (চেয়ারম্যান) বারবার বলছেন, আমরা যে আইনে সমীক্ষা চালিয়েছি তাতে হাইকোর্টের রায়ের আলোকপাত করা হয়নি। কিন্তু আমরা বোঝানোর চেষ্টা করেছি, যাদের চিহ্নিত করেছি সেই সংখ্যাটি আসলে নূন্যতম, সিএস রেকর্ড ধরে সমীক্ষা চালালে দখলদারের সংখ্যা আরও বাড়বে।’

তারপরও কেন দখলদারদের তথ্য মুছে ফেলা হয়েছে জানতে চাইলে এই পরিবেশবিদ বলেন, ‘চেয়াম্যান সাহেব যুক্তি দিয়েছেন, সিএস অনুসারে যেহেতু দখলদার বেশি হবে; তাই এখনকার তালিকা প্রকাশ করলে যেসব দখলদার বাদ পড়েছে তারা সুযোগ পেয়ে যাবে। আমরা (প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা) বলেছি, যে তালিকা হয়েছে সেটি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা যেত। সেক্ষেত্রে উল্লেখ করে দেওয়া যেতো যে এই সমীক্ষা পানি আইন অনুসারে নদীর ৩০ মিটারের মধ্যে করা হয়েছে। কিন্তু কমিশন বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, তালিকা সংরক্ষণ হবে না। এ ব্যাপারে যাবতীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার কমিশনের।’ তবে সরকারি অর্থ ব্যয় করে দখলদারদের যে তালিকা হয়েছে সেটি ফেলে দেওয়ার মতো নয় বলে মনে করেন তিনি। 

৪৮ নদী সমীক্ষা প্রকল্পের পরিচালক ইকরামুল হক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বর্তমান বাস্তবতায় সিএস অনুযায়ী দখলদার চিহ্নিত করায় নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বর্তমানে নদীর ওপর কি কি স্থাপনা আছে  এবং কারা করেছে তাদের চিহ্নিত করে তালিকা করা হয়েছে।’ 

চূড়ান্ত প্রতিবেদন থেকে দখলদারের তালিকা বাদ দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যেসব দখলদারের তথ্য পেয়েছি তা এরই মধ্যে সব জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু প্রকল্পটি যেহেতু নদী রক্ষা কমিশনের এখন এটি কি করবে তা কর্তৃপক্ষই সিদ্ধান্ত নেবে। দখলদারদের নাম ও তালিকা প্রকাশের পর মামলা-মোকদ্দামাসহ নানা ঝামেলা হতে পারে এমনটা ভেবেই হয়তো চেয়ারম্যান সাহেব নির্দেশনা দিয়েছেন।’ 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মনজুর আহমেদ চৌধুরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘এ মুহুর্তে ৪৮ নদী সমীক্ষা প্রকল্প নিয়ে কথা বলা সম্ভব নয়। সমীক্ষার সমাপনী প্রতিবেদনটি কমিশনে গৃহীত হয়নি। তথ্যগুলো আমরা বুঝে নিয়েছি।’

দখলদারদের তথ্য ও তালিকা বাদ দেওয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যা শুনেছেন তা অযৌক্তি নয়। তবে বিষয়ে এখনই আনুষ্ঠানিকভাবে কথা বলতে চাচ্ছি না। যথাযথ কাগজপত্র ছাড়া দখলদারদের নাম প্রকাশ করা যায়না।’ এখনো প্রকল্প প্রতিবেদন পরীক্ষা করে দেখেননি জানিয়ে ড. মনজুর আরও বলেন, ‘কেবল প্রকল্প শেষ হয়েছে, এরপর কমিশন সিদ্ধান্ত নেবে।’  

সিএস রেকর্ড অনুযায়ী দখলদার চিহ্নিত করার বিষয়টি নিয়ে বিশেষজ্ঞরা যেসব জটিলতার কথা বলেছেন সে ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান বলেন, ‘২০০৯ সালে বিচারপতি খায়রুল হক যে রায় দিয়েছেন, সেটি পূর্ণাঙ্গ রায়। এই রায় অনুসারেই নদী সংরক্ষণের কাজ করা উচিত। ওই আইনের আলোকে ব্যবস্থা নিলে নদীর জমি, খালের জমি, জলাভূমির জমি সবই উদ্ধার করা সম্ভব।’

তবে রিভার ও ডেল্পা রিসার্চ সেন্টারের চেয়াম্যান ও নদী গবেষক মোহাম্মদ এজাজ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘ভাঙণের কারণে বাংলাদেশের নদীগুলোর গতিপথ পরিবর্তিত হয়। এটাই এ দেশের নদীর বাস্তবতা। ২০০৯ সালে রায় দেওয়ার সময় হাইকোর্টের বিচারপতি ঠিকই বুঝেছিলেন, নদী সরে গেলে তা কীভাবে উদ্ধার করতে হবে। এজন্য তিনি ওই রায়ে সিএস ও আরএস জরিপ ধরে সমন্বয় করে নদীকে খুঁজে বের করতে হবে এবং সীমানা নির্ধারণ করতে হবে। হাইকোর্টের রায়টি বাস্তবায়নযোগ্য, অর্থাৎ সরেজমিনে নদী পাড়ে যে দখল আছে সেটা পানি আইন অনুযায়ী দখল এমনকি হালনাগাদ আরএস জরিপেও দখলের মধ্যে পড়ে। এখন কেউ যদি এখন বলেন যে সিএস এ নাই দেখে দখলদারদের উল্লেখ করবেন না তাহলে বলতে হবে তিনি রায়টি বুঝতে পারেননি অথবা রায়টিকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করছেন।’ 

দখলদারদের তথ্য মুছে ফেলার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে মোহাম্মদ এজাজ বলেন, ‘এমন সিদ্ধান্তের মানে হলো দখলদারদের সুযোগ এবং বৈধতা দেয়া। এটি একটি বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। নদী রক্ষা কমিশন তৈরি হয়েছিল নদীকে রক্ষা করার জন্য, নদীকে বিক্রি করে দেয়ার জন্য না।’ 

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, `আদালতের একটি নির্দেশ যদি বাস্তবিত অর্থে না হয়ে থাকে বা কোন সমস্যা তৈরি হয় তখন আদালতের দারস্থ হতে হবে। তখন দেখতে হবে যে আদালত কি সিদ্ধান্ত দেয়। প্রকল্প থেকে দখলদারদের তথ্য বাদ দেয়ার প্রশাসনিক ও আইনী ক্ষমতা নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যানের নেই। কোন তথ্যে ভুল থাকলে তিনি সেটা সংশোধন করবেন। আমাদের কষ্টার্জিত অর্থে এসব প্রকল্প। কেউ যদি ভুল করে জনগণের পয়সা অপচয় করে তাহলে তিনি (কমিশন চেয়ারম্যান) তাদের আইনের আওতায় আনতে পারেন, কিন্তু তথ্য মুছে দিতে পারেন না।’

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, নদী রক্ষা কমিশন এর আগেও দুবার সারা দেশের নদীদখলদারদের তালিকা প্রকাশ করেছে। সেখানে প্রায় ৬৫ হাজার দখলদার চিহ্নিত করা হয়েছিল। অথচ ঢাকার নদীগুলোর দখলদারের সংখ্যাও এরচেয়ে বেশি। অর্থাৎ কমিশনের তালিকায় দখলদারদের পুরো তথ্য এমনিতেই আসছে না। এবার ৪৮ নদী সমীক্ষা প্রকল্পের তালিকাও প্রকাশ হচ্ছে না। অর্থ্যাৎ তারা নদীর পক্ষে কাজ করছে না, যা উচ্চ আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে। তাই কমিশনের উচিত দখলদারদের নাম ও তালিকা দ্রুত প্রকাশ করা এবং তাদের উচ্ছেদের ব্যবস্থা নেওয়া।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা