হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ১৮ জানুয়ারি ২০২৩ ০৮:৪১ এএম
ছয় মাস আগে সীতাকুণ্ডের বিএম ডিপোতে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ফাইল ফটো
অগ্নি নিরাপত্তা পরিকল্পনা (ফায়ার সেফটি প্ল্যান) অনুযায়ী একটি বেসরকারি কন্টেইনার ডিপোতে স্মোক ডিটেক্টর, হিট ডিটেক্টর, ফায়ার হাইড্রেন্ট ব্যবস্থা কার্যকর থাকার কথা। কিন্তু চট্টগ্রামের অধিকাংশ বেসরকারি কন্টেইনার ডিপোতে এসব ব্যবস্থা নেই। অগ্নি নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়েই এখানে চলছে বেসরকারি কন্টেইনার ডিপোর কার্যক্রম। ছয় মাস আগে সীতাকুণ্ডের বিএম ডিপোতে বিস্ফোরণের ঘটনায় অর্ধশত মানুষ মারা যায়। তাতেও টনক নড়েনি কন্টেইনার ডিপো মালিকদের। এরপর ছয় মাস পার হলেও প্রতিষ্ঠানগুলো ফায়ার সেফটি প্ল্যান বাস্তবায়ন করেনি। ফায়ার সার্ভিস থেকে একাধিকবার চিঠি দেওয়ার পর তাতে কর্ণপাত করছেন না ডিপো মালিকরা।
ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক (চট্টগ্রাম) এমডি আব্দুল মালেক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘কন্টেইনার ডিপোগুলোকে ফায়ার সেফটি প্ল্যান অনুযায়ী, অগ্নি নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার জন্য আমরা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বলে আসছি। বেশ কয়েক দফায় চিঠিও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখনও অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান এটি কার্যকর করছে না। আমরা তাদের বলেছি, একসঙ্গে না পারলে ধীরে ধীরে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করতে। তারা সেটিও করছে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘মোবাইল কোর্ট পরিচালনার জন্য জেলা প্রশাসন থেকে একটি টিম পেয়েছি। গত ৭ জানুয়ারি ইছহাক ব্রাদার্স লিমিটেডের মালিকানাধীন কন্টেইনার ডিপোতে ওই টিম অভিযান চালিয়েছে। ধারাবাহিকভাবে অন্য কন্টেইনার ডিপোতেও অভিযান পরিচালনা করা হবে।’
২০২০ সালের ২ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম নগরীর পতেঙ্গা থানাধীন লালদিয়ার চর এলাকার ইনকনট্রেড কন্টেইনার ডিপোতে বিস্ফোরণের ঘটনায় তিনজন নিহত হন। ওইদিন দুপুর ১২টার দিকে ডিপোতে থাকা একটি লরির তেলের ট্যাঙ্ক ওয়েলডিংয়ের সময় এই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনার পর থেকেই বেসরকারি কন্টেইনার ডিপোর অগ্নি নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে কথা ওঠে। তখন প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার জন্য চিঠি দেয় ফায়ার সার্ভিস। এরপর গত বছরের ৪ জুন রাতে সীতাকুণ্ডের বিএম কন্টেইনার ডিপোতে কন্টেইনার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় ৫০ জনের অধিক মানুষ মারা যায়। হাত-পা হারানোসহ অগ্নিদগ্ধ হয়েছেন আরও অন্তত ১০০ জন। ওই ঘটনার পর কন্টেইনার ডিপোগুলোর অগ্নি নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে আবারও প্রশ্ন ওঠে। পরে বেসরকারি অন্য কনটেইনার ডিপোগুলো পরিদর্শনের উদ্যোগ নেয় ফায়ার সার্ভিস। পরিদর্শন দলের নেতৃত্বে ছিলেন ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক ফারুক হোসেন শিকদার।
তিনি জানিয়েছেন, পরিদর্শনে প্রায় ৮০ শতাংশ ডিপোতে অগ্নি নিরাপত্তার ঝুঁকি রোধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা পাওয়া যায়নি। অথচ শর্ত অনুযায়ী, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের অনুমোদিত ফায়ার সেফটি প্ল্যান কার্যকর থাকার কথা। এর বাইরে তিন মাস অন্তর ফায়ার ড্রিল। এটি সম্ভব না হলে বছরে অন্তত একবার ফায়ার ড্রিল করার কথা। কিন্তু এসব নির্দেশনার একটিও অনুসরণ করছে না প্রতিষ্ঠানগুলো।
গত ৭ জানুয়ারি ইছহাক ব্রাদার্স কন্টেইনার ডিপোতে অভিযান চালান জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট প্রতীক দত্ত। অভিযানকালে তিনি ওই প্রতিষ্ঠানে কোনো ফায়ার হাইড্রেন্ট দেখতে পাননি। পরে এ ঘটনায় তিনি প্রতিষ্ঠানটিকে দুই লাখ টাকা জরিমানা করেন।
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট প্রতীক দত্ত প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘অভিযানে গিয়ে আমরা দেখেছি কন্টেইনার ডিপোতে কোনো ফায়ার হাইড্রেন্ট নেই। ফায়ার এক্সটিংগুইশার নেই। স্মোক ডিটেক্টর, হিট ডিটেক্টর কিছুই নেই। এর বাইরে বিপজ্জনক পণ্য (ডেঞ্জারাস গুডস) রাখার জন্য কন্টেইনার ডিপোতে কোনো আলাদা শেড ছিল না। একটি ডিজেল পাম্প আছে, তারও অনুমোদন নেই।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কন্টেইনার ডিপোটস অ্যাসোসিয়েশনের (বিকডা) সভাপতি নুরুল কাইয়ুম খান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বেসরকারি কন্টেইনার ডিপোগুলো প্রতিষ্ঠা শুরু হয় ১৯৯৯ সালের দিকে। তখন ফায়ার সেফটি প্ল্যান নিয়ে এতটা কড়াকড়ি ছিল না। ৩০ বছরে কোনো কন্টেইনার ডিপোতে দুর্ঘটনা ঘটেনি। সম্প্রতি বিএম ডিপোতে বিস্ফোরণের পর ফায়ার সেফটি প্ল্যান নিয়ে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। অনেকে এখন ডিপোতে ফায়ার হাইড্রেন্ট বসাচ্ছেন। ফায়ার হাইড্রেন্ট সম্পর্কিত যন্ত্রপাতিগুলো আমদানি করতে হয় বলে একটু বিলম্ব হচ্ছে।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘১৯টি কন্টেইনার ডিপোর মধ্যে ৫-৬টি ডিপোতে ফায়ার হাইড্রেন্ট বসানোর কাজ ৯০ শতাংশের বেশি শেষ হয়েছে। অন্যগুলোতে কাজ চলছে। তবে সবগুলো কন্টেইনারে ফায়ার এক্সটিংগুইশার আছে।’