× ই-পেপার প্রচ্ছদ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি ফিচার চট্টগ্রাম ভিডিও সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বেড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়, কমেছে শিক্ষার্থী

সেলিম আহমেদ

প্রকাশ : ১৭ জানুয়ারি ২০২৩ ১২:০০ পিএম

আপডেট : ১৭ জানুয়ারি ২০২৩ ১২:২০ পিএম

বেড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়, কমেছে শিক্ষার্থী

২০১২ সালে দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল ৬০টি; শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ১৪ হাজার ৬৪০ জন। প্রায় এক দশক পর ২০২১ সালে দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে হয়েছে ১০২টি। অথচ শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ১০ হাজার ১০৭ জন। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জু্রী কমিশনের (ইউজিসি) ৪৮তম বার্ষিক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। সম্প্রতি রাষ্ট্রপতির কাছে এই প্রতিবেদন হস্তান্তর করেছে ইউজিসি।

এক দশকে বেরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আশঙ্কাজনক হারে শিক্ষার্থী কমে যাওয়া প্রসঙ্গে শিক্ষাবিদরা বলছেন, অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে লাগামহীন বাণিজ্য এবং পড়ালেখার মানও খুব একটা ভালো নয়। এ কারণে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা ভর্তি হতে চান না। পাশাপাশি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ছে এবং সেগুলোতে পড়াশোনার খরচও কম। এ কারণে বেসরকারি থেকে বিমুখ হয়ে শিক্ষার্থীরা সরকারিতে ঝুঁকছেন।

ইউজিসির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়েই যোগ্য শিক্ষক নেই। খণ্ডকালীন শিক্ষক দিয়ে ক্লাস নেওয়ার কারণে পড়ালেখার মান নেই। তাছাড়া গবেষণায় অনীহা, সনদবাণিজ্য, অনুমোদনহীন শাখা ক্যাম্পাস পরিচালনা, ট্রাস্টি বোর্ড নিয়ে দ্বন্দ্বের কারণে ঠিকমতো পড়ালেখা হয় না। আবার স্থায়ী ক্যাম্পাস না থাকার কারণে ইউজিসি এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি বন্ধসহ নানা পদক্ষেপ নিয়ে থাকে। এসব কারণে উচ্চশিক্ষা স্তরে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিন দিন বাড়লেও তারা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। 

তিনি আরও বলেন, অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে রাজনৈতিক বিবেচনায়। ইউজিসি প্রাণপণ চেষ্টা করছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিয়মের মধ্যে রাখতে, কিন্তু মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা না পাওয়ায় এটি সব সময় সম্ভব হয় না।

ইউজিসির আরেক কর্মকর্তা বলেছেন, আইনে ‘অলাভজনক’ হলেও কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় অর্থ আয়ের মেশিনে পরিণত হয়েছে। নামধারী কিছু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে টাকা দিয়েই মিলছে সার্টিফিকেট। আবার অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখার মান নেই বললেই চলে। বিষয়গুলো যখন প্রকাশ হয়েছে, তখন অনেক প্রতিষ্ঠানই চাকরির ক্ষেত্রে হাতেগোনা কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া বাকি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের গুরুত্বই দিতে চায় না। তাই ধীরে ধীরে ওই সব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমছে, যার প্রভাব পড়ছে সামগ্রিক ক্ষেত্রেই।

ইউজিসির বার্ষিক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০১৩ সালে পাঠদান চলা ৭৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ২৮ হাজার ৭৩৬ জন; ২০১৪ সালে ৮০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৩০ হাজার ৭৩০ জন; ২০১৫ সালে ৮২টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩ লাখ ৫০ হাজার ১৩০ জন; ২০১৬ সালে ৮৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩ লাখ ৩৭ হাজার ১৫৭ জন; ২০১৭ সালে ৯০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩ লাখ ৫৪ হাজার ৩৩৩ জন; ২০১৮ সালে ৯২টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩ লাখ ৬১ হাজার ৭৯২ জন; ২০১৯ সালে ৯৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩ লাখ ৪৯ হাজার ১৬০ জন; ২০২০ সালে ১০১টি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ২৮ হাজার ৬৮৯ জন। অর্থাৎ ২০১৯ সাল থেকেই ধারাবাহিকভাবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে। 

অন্যদিকে ২০১২ সালে দেশে পাবলিক ব্শ্বিবিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল ৩৪টি। তখন শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১৮ লাখ ৯০ হাজার ৫৩৪ জন। এর দশ বছর পর ২০২১ সালে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০টিতে। বেড়েছে শিক্ষার্থীর সংখ্যাও।

এ প্রসঙ্গে ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আব্দুল মান্নান বলেছেন, অভিভাবকরা বুঝে গেছেন, কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা হয় আর কোনটিতে হয় না। ১৫-২০টি ছাড়া বাকি বিশ্ববিদ্যালগুলোতে শিক্ষার্থীরা লাখ লাখ টাকা খরচ করে পড়ালেখা করলেও চাকরির বাজারে তাদের খুব একটা গুরুত্ব দেওয়া হয় না। কারণ, ওসব বিশ্ববিদ্যালয় মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত না করে সার্টিফিকেট বাণিজ্যে ব্যস্ত। এ ছাড়াও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কম খরচে পড়তে পারছেন। এ কারণে বেসরকারিতে শিক্ষার্থী কমছে।

একই মত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. এস এম হাফিজুর রহমানের। তিনি বলেন, বেসরকারিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমার একটি অন্যতম কারণ দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বাড়ছে। কোনো অভিভাবকই চাইবেন না, সুযোগ পাওয়ার পরও টাকা খরচ করে তাদের সন্তানদের পড়াতে। এ ছাড়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হাতেগোনা কিছু সাবজেক্টকেন্দ্রিক। সাধারণ সাবজেক্টগুলোকে তারা গুরুত্ব না দেওয়ায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমছে।

এ দুজন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে প্রায় অভিন্ন সুরে কথা বলেছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির সভাপতি শেখ কবির হোসেনও। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি বলেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বাড়ছে। শিক্ষার্থীরা সেখানে কম খরচে পড়ার সুযোগ পাচ্ছেন, তাই তারা সেখানে ভর্তি হচ্ছেন। আর প্রাইভেটে পড়ালেখা করতে টাকা লাগে, তাই এখানে ভর্তি কম হচ্ছে। 

তাহলে এত প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে কেনÑ এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কেউ কেউ শখের বসে করছেন। কেউ লোভে পড়ে টাকা কামাই করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় করছেন। এই দুই কারণেই দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বাড়ছে। 

বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তিতে এগিয়ে প্রাইভেট: দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তুলনায় প্রায় আড়াইগুণ বেশি শিক্ষার্থী পড়ালেখা করছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি কমার কারণে আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিং থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পিছিয়ে পড়া। শিক্ষাবিদরা বলছেন, গতানুগতিক সিলেবাস, অবকাঠামো ও আবাসন-সংকটের কারণে বিদেশিরা পড়তে আসতে চান না। তবে শিক্ষার্থীদের জন্য আধুনিক সুবিধা ও পরিবেশ নিশ্চিত করায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশিরা আসতে আগ্রহী হচ্ছেন।

ইউজিসির তথ্যমতে, ২০২১ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ১ হাজার ৬০৪ জন আর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬৭৭ জন বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছেন। বাংলাদেশে পড়তে আসা এসব শিক্ষার্থী মূলত ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ, চীন, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, ইয়েমেন, ফিলিস্তিন, গাম্বিয়া, মরক্কো, দক্ষিণ কোরিয়া, কানাডা, মৌরিতানিয়া, তানজানিয়া, অস্ট্রিয়া, রুয়ান্ডা, জিবুতি, সোমালিয়া, ইথিওপিয়া, নাইজেরিয়া, আফগানিস্তান, সাউথ সুদান, বাহরাইনসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক।

পাবলিকে বিদেশি শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের দেশে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির নীতি খুবই কঠিন। তাদের জন্য অনুকূল পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে না পারার কারণে শিক্ষার্থীরা আসতে নিরুৎসাহিত হন। আবার তারা যেখানে কম সময়ে, কম পরিশ্রমে সার্টিফিকেট পান সেই প্রতিষ্ঠানের পেছনে ছোটেন। 

বিদেশি শিক্ষার্থী কম আসা প্রসঙ্গে ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক মুহাম্মদ আলমগীর বলেন, ‘বিদেশি শিক্ষার্থী কোনো একটা জায়গায় যখন আসবে তখন সে প্রতিষ্ঠানের কোয়ালিটি, আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিং, পরিবেশ, আবাসন, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ইত্যাদি চিন্তা করে আসে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করার জন্য আলাদা সেকশন, পরিবেশ, আবাসন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পেরেছে। কিন্তু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় তা পারেনি। এ কারণেই পাবলিকে বিদেশি শিক্ষার্থী কম। তবে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থী থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর ওপর নির্ভর করে আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিং। 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০১৭১২০৩৩৭১৫ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা