শহিদুল ইসলা রাজী
প্রকাশ : ১৬ জানুয়ারি ২০২৩ ১১:২৯ এএম
আপডেট : ১৬ জানুয়ারি ২০২৩ ১১:৩৮ এএম
অলংকরণ প্রবা
স্বজনদের স্পর্শ, শেষ শ্রদ্ধা ও একমুঠো মাটি ছাড়াই প্রতিদিন রাজধানীতে দাফন হচ্ছে গড়ে তিন থেকে চারটি লাশ। এসব লাশের অধিকাংশেরই পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। যাদের পরিচয় শনাক্ত করা গেছে, তাদের মধ্যে ১৫ দশমিক ৬৫ ভাগ হত্যাকাণ্ডের শিকার বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। হত্যার পর কখনও মাটিতে পুঁতে বা গলা কেটে ফেলে রাখা হচ্ছে; কখনও ড্রামে ভরে রাস্তায় ফেলে যাচ্ছে দুর্বৃত্তরা। খুন করে লাশ গুম করার পর কোনোভাবে তা জনসম্মুখে এলেও ওই লাশ চেনার উপায় থাকে না।
পুলিশ প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনীহার কারণে এসব নিয়ে তেমন খোঁজখবরও নেওয়া হয় না। অজ্ঞাত লাশের পরিচয় জানতে পত্রিকায় বিজ্ঞাপনসহ নানা প্রচারকার্য চালানোর কথা থাকলেও তা মানছে না পুলিশ। তবে পুলিশ বলছে, উদ্ধার হওয়া অজ্ঞাত লাশের বেশিরভাগই সড়ক ও রেল দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া ভবঘুরে কিংবা ছিন্নমূল মানুষ।
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) সাইবার ক্রাইম অ্যান্ড ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাবের তথ্য মতে, গত সাড়ে তিন বছরে হওয়া অজ্ঞাত লাশের ৭৬ দশমিক ৭৩ শতাংশেরই পরিচয় শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। ২৩ দশমিক ২৭ শতাংশ অজ্ঞাত লাশের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে।
জানা গেছে, রাজধানীতে প্রতি মাসে গড়ে ৭০টি বেওয়ারিশ লাশ দাফন করে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম। প্রতিবছর ১ হাজারের বেশি বেওয়ারিশ লাশ দাফন করছে সংগঠনটি। দাফন হওয়া লাশের প্রায় অর্ধেকই নারী। পিবিআই বলছে, অজ্ঞাত লাশ উদ্ধারের পর সেগুলো শনাক্তের জন্য তারা ফিঙ্গার প্রিন্ট আইডেন্টিফিকেশন অ্যান্ড ভেরিফিকেশন সিস্টেম (এফআইভিইএস) ব্যবহার করে থাকে। এক্ষেত্রে তারা দুটি ভার্সনে কাজ করে থাকে। একটি ল্যাপটপ ও অন্যটি স্মার্ট ফোন দিয়ে। ফিঙ্গার প্রিন্ট স্ক্যানার দিয়ে আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করা হয়। পরবর্তী সময়ে ঘটনাস্থল থেকে তথ্য পাঠানো হয় সাইবার ক্রাইম অ্যান্ড ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাবে। সেখান থেকে নির্বাচন কমিশনের সহায়তায় পরিচয় শনাক্ত করা হয়।
যাদের তথ্য নির্বাচন কমিশনের তথ্যভান্ডারে নেই, তাদের পরিচয় শনাক্ত করা যায় না। সারা দেশে পিবিআই সদর দপ্তরসহ ৪৭টি ইউনিট অজ্ঞাত লাশ শনাক্তের কাজ করছে বলে জানায় সংস্থাটি।
পিবিআইয়ের সাইবার ক্রাইম অ্যান্ড ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালের মার্চ থেকে ২০২২ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সারা দেশে ৩ হাজার ২৯৬টি অজ্ঞাত লাশের পরিচয় শনাক্তের কাজ করে পিবিআই। এর মধ্যে ৭৬৭ জনের পরিচয় শনাক্ত করতে সক্ষম হয় তারা। ২ হাজার ৫২৯টি লাশের পরিচয় অজ্ঞাতই থেকে গেছে। শনাক্ত হওয়া লাশের মধ্যে ৫৫৫ জন পুরুষ এবং ২১২ জন নারী। তাদের ১২০ জন হত্যাকাণ্ডের শিকার। যার মধ্যে নারী ৪১ এবং পুরুষ ৭৯ জন। এসব অজ্ঞাত লাশের বেশিরভাগই ঢাকা, গাজীপুর, ফরিদপুর, ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রাম এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।
পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার (ফরেনসিক) মোস্তফা কামাল রাশেদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, উদ্ধার হওয়া লাশের বেশিরভাগই সড়ক ও রেল দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া ভবঘুরে কিংবা ছিন্নমূল মানুষ। এ ছাড়া কিছু ক্লুলেস হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব হয়েছে।
অজ্ঞাত লাশের বেশিরভাগের পরিচয় শনাক্ত না হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অজ্ঞাতপরিচয়ের লাশের একটি অংশের জাতীয় পরিচয়পত্র থাকে না। এক্ষেত্রে ম্যানুয়ালি পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করা হয়। আবার অনেক সময় জাতীয় পরিচয়পত্র থাকা সত্ত্বেও ফিঙ্গার প্রিন্ট মেলে না। এ কারণে লাশ শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। পচে যাওয়া বা আগুনে পুড়ে মৃত্যু হওয়া অজ্ঞাতপরিচয় লাশের পরিচয়ও মেলানো যায় না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ তৌহিদুল হক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আইনশৃঙ্খলার দৃষ্টিতে যদি আমরা বিচার করি, তাহলে একটি দেশের জন্য বেওয়ারিশ লাশ অথবা পরিচয়বিহীন লাশ ভালো কোনো খবর নয়।
ব্যক্তিগত, রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বসহ নানা কারণে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। হত্যার পর অনেক সময় লাশ বিকৃত করে ফেলা হয়। ফলে পরবর্তী সময়ে আত্মীয়-স্বজন বা পরিবারের সদস্যরা ভুক্তভোগীর অবস্থান খুঁজে পান না। তাদের অবস্থান হয় বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে। এ ছাড়া বিভিন্ন দুর্ঘটনার কারণে পরিচয় মিলছে না অনেক লাশের।
তবে পুলিশ যদি ঘটনার বিবরণ বা লাশের কিছু ক্লু দিয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয়, তাহলে সেই বিজ্ঞাপন দেখে নিখোঁজ ব্যক্তির স্বজনরা তৎপর হতে পারে। এভাবে লাশ খুঁজে পাওয়াটা সহজ হবে।
তিনি আরও বলেন, কোনো ঘটনা গণমাধ্যমে প্রচারিত হলে বা নানা চাপে লাশ ময়নাতদন্ত শেষে পুলিশ গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। কিন্তু যেসব ঘটনার ক্ষেত্রে এই ধরনের তৎপরতা থাকে না, সেটাকে বেশি গুরুত্ব দেয় না পুলিশ। এ ছাড়া আত্মীয়-স্বজনও ভুক্তভোগীকে খুঁজে না পেয়ে এক সময় ভুলে যান। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মনোযোগটাও ওইভাবে থাকে না। আস্তে আস্তে স্বজন-পুলিশ সবারই মনোযোগ কমতে থাকে, তখন অজ্ঞাতপরিচয়ের লাশগুলো বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন হয়।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) নির্বাহী পরিচালক নূর খান লিটন বলেন, দেশে অনেক মানুষই বিভিন্নভাবে মারা যান বা নিহত হন। হাজার হাজার অজ্ঞাতপরিচয়ের মধ্যে হত্যাকাণ্ডের শিকারও আছেন অনেকে। সেটি পরিসংখ্যানে আসে কি না আমার জানা নেই। তবে শনাক্ত না হলেও কিন্তু অজ্ঞাত লাশের ময়নাতদন্ত করার কথা এবং তার ছবি সংরক্ষণ করার কথা। সেই ছবি ইন্টারনেটে প্রকাশ করার এই প্রক্রিয়ার কোথাও কোথাও ছেদ দেখা যায়।
আবার আঞ্জুমান মুফিদুলের কাছে যখন লাশ দাফনের জন্য হস্তান্তর করা হয়, তারাও ছবি সংরক্ষণ করে রাখে। সমস্যা হচ্ছে এই ছবিগুলো প্রচার করা হয় না।
অজ্ঞাতপরিচয় লাশের ছবি দিয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে একটি তথ্যভান্ডার থাকা উচিত উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ তথ্যভান্ডারে যদি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয় বা ছবি প্রকাশ করা হয়, তাহলে ৯৯৯-এ ফোন দিয়ে স্বজন বা ওই ব্যক্তির পরিচিত কেউ তার লাশ শনাক্ত করতে পারেন।