কূটনৈতিক প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৬ জানুয়ারি ২০২৩ ০৯:৩১ এএম
আপডেট : ১৬ জানুয়ারি ২০২৩ ১১:২৯ এএম
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনের সঙ্গে বৈঠকের পর যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের উন্নতির বিষয়ে ইতিবাচক বার্তা দিয়ে গেলেন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু। রবিবার (১৫ জানুয়ারি) দুপুরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনের সঙ্গে বৈঠক শেষে ডোনাল্ড লু সাংবাদিকদের বলেন, দুই দেশের বন্ধুত্ব শক্তিশালী করতেই তিনি ঢাকায় এসেছেন। সম্পর্ক জোরদার কীভাবে করা যায় তা নিয়েই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জাঁদরেল কূটনীতিক আরও জানান, র্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রসঙ্গ, ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি (আইপিএস) এবং যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পণ্যের জিপিএস সুবিধা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
বৈঠকে অত্যন্ত গঠনমূলক আলোচনা হয়েছে জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন সাংবাদিকদের বলেন, সামনের ৫০ বছরে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক কীভাবে আরও এগিয়ে নেওয়া যায় সে বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। মন্ত্রী আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের গঠনমূলক পরামর্শ গ্রহণ করবে বাংলাদেশ।
মোমেন-লু বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন ও ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিটার ডি হাস।
দীর্ঘ তিন দশক ধরে মার্কিন প্রশাসনে কাজ করছেন ডোনাল্ড লু। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর আগে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ সফর করলেও ঢাকায় এটিই লুর প্রথম একক সফর। র্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা, ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাসহ নানা বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের টানাপড়েন যখন অনেকটাই দৃশ্যমান, ঠিক তখন নির্বাচনী এই বছরে ডোনাল্ড লুর ঢাকা সফরকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তার সফর ঘিরে গেল কিছুদিন ধরেই নানা আলোচনা চলছে কূটনৈতিক পাড়ায়।
যুক্তরাষ্ট্রের এই সহকারী মন্ত্রীর সফর প্রসঙ্গে ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কথার চেয়ে কাজকে বেশি গুরত্ব দেয়। যে ইস্যুতে যে পদক্ষেপ দরকার তা সময়মতো সম্পন্ন হওয়ার বিষয়টিই তাদের কাছে জরুরি। সে কথা মাথায় রেখে দ্বিপক্ষীয় বিষয়গুলো এগিয়ে নিলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা ফলপ্রসূ হবে বলে মনে করেন এই কূটনীতিক।
লু যা বললেন : সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে ডোনাল্ড লু বলেন, শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যুক্তরাষ্ট্র গণতন্ত্র এবং মানবাধিকার রক্ষাকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। তিনি ঢাকায় এসেছেন বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক শক্তিশালী করতে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব দৃঢ় করতে চায় এবং বাংলাদেশও বন্ধুত্বের হাত সম্প্রসারণ করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ জানিয়ে তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সমুন্নত রাখতে বিশ্বাস করে। এ বিষয়গুলো নিয়ে বাংলাদেশের মতো অংশীদারদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করে যুক্তরাষ্ট্র। কোনো সমস্যা দেখলে তখন সে বিষয়টি উত্থাপন করা হয় এবং পরামর্শ দেওয়া হয়।
র্যাবের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ডেনাল্ড লু বলেন, ‘আপনারা নিশ্চয় লক্ষ করেছেন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বিবৃতিতে বিচারবহির্ভূত হত্যার সংখ্যা কমানোর ক্ষেত্রে র্যাবের অসাধারণ অগ্রগতির কথা স্বীকার করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সরকারও এই অগ্রগতির বিষয়টি স্বীকার করে। এটি একটি অসাধারণ কাজ। এতে প্রমাণ হয় যে মানবাধিকার সমুন্নত রেখে র্যাব আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও সন্ত্রাসবাদ দমনে ভালো কাজ করছে। এ কারণেই র্যাবের বিষয়ে বৈঠকে ভালো আলোচনা হয়েছে।’
ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত রূপরেখা আইপিএস নিয়ে আলোচনা সম্পর্কিত প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আইপিএস কোনো ক্লাব নয়, এটি একটি কৌশল। আইপিএস নিয়ে বৈঠকে চমৎকার আলোচনা হয়েছে। এ আলোচনা অবশ্যই একটি চলমান প্রক্রিয়া।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের জিএসপি সুবিধা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে লু বলেন, এ বিষয়ে এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস যদি জিএসপি পুনর্বহালের কোনো সিদ্ধান্ত নেয়; সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ অবশ্যই প্রথম তালিকায় থাকবে।
ব্রিফিংয়ে ডোনাল্ড লু আরও জানান, বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার সম্পর্ক আরও দৃঢ় করতে চায় তার দেশ। এজন্য প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বলেও জানান তিনি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী যা জানালেন : যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, বৈঠকে অত্যন্ত গঠনমূলক আলোচনা হয়েছে, খোলামেলা আলোচনা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পুরোনো বন্ধু। দুই বন্ধুরাষ্ট্র সামনের ৫০ বছর কীভাবে সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি, সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যদি গঠনমূলক পরামর্শ দেয় তবে তা গ্রহণ করবে বাংলাদেশ। দুই দেশের মধ্যে যদি কোনো কিছু নিয়ে প্রশ্ন থাকে, তবে আলোচনা করেই তার সমাধান করা হবে। যদি কোনো দুর্বলতা থাকে, সেটিও দূর করা হবে। গঠনমূলক পরামর্শ থাকলে বাংলাদেশ তা গ্রহণ করে, এর নমুনা আমরা দেখিয়েছি।’
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রসঙ্গ তুলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরাও অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চাই। আওয়ামী লীগ সব সময় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ব্যালটের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছে, বুলেটের মাধ্যমে নয়।’
এ সময় পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন বলেন, ‘গত বছরের মতো এবারও বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ঐকমত্য হয়েছে। আর তা হচ্ছে একটি সময়সূচি ধরে চলমান মেকানিজমের মাধ্যমে লক্ষ্য অর্জনের জন্য সম্পর্ককে পরের ধাপে নিয়ে যাওয়ার জন্য উভয় পক্ষই কাজ করবে।’
বিশেষজ্ঞের দৃষ্টিতে : ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির ডোনাল্ড লুর বাংলাদেশ সফর এবং রবিবারের বৈঠক সম্পর্কে বলেন, ডোনাল্ড লু বাংলাদেশে এসেছেন এবং দ্বিপক্ষীয় ইস্যুতে বৈঠক করেছেন, নিঃসন্দেহে সেই বৈঠক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আবার বিশ্বরাজনীতি, অর্থনীতি এবং বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির কথা বিবেচনা করলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কও সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, বৈঠকের আলোচনায় র্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রসঙ্গ এসেছে। সেখানে ডোনাল্ড লু বলেছেন, তাদের নিষেধাজ্ঞার পর র্যাবের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কমেছে। বোঝা যাচ্ছে, স্যাংসনের ভয়ে র্যাব বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড করছে না। স্যাংসনের ভয়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ হওয়াও ইতিবাচক। কিন্তু যেখানে মানুষের জীবনের বিষয়, মৌলিক অধিকারের বিষয়ে সেখানে র্যাবের দৃষ্টিভঙ্গিতে কী পরিবর্তন এসেছে, চিন্তায়, মানসিকতায় কী পরিবর্তন এসেছে, প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মকানুনে কী পরিবর্তন হয়েছে, হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ। সেই ইতিবাচক পরিবর্তন যখন আসবে তখনই র্যাব নিয়ে আর কোনো প্রশ্ন উঠবে না এবং একটা সাসটেইনেবল আউটকাম পাওয়া যাবে।
আইপিএস সম্পর্কে এই কূটনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, আইপিএস এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র সেভাবে স্ক্রিস্টালাইজ করেনি। আইপিএস এখনও যে ফরমে ডেভেলপড হয়েছে তা মোস্টলি মিলিটারি ফরম। কিন্তু বাংলাদেশের পক্ষে এ ফরমে কাজ করা সম্ভব নয়, সক্ষমতাও নেই। আইপিএসে যখন বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক বিষয় প্রাধান্য পাবে, তখন বাংলাদেশ এ নিয়ে আরও মিনিংফুল আলোচনা করতে পারে। যেমন যখন সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তার প্রশ্নটি পৃথিবীর সব দেশের মতোই বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। অতএব আইপিএস নিয়ে আলোচনা এখন যা হচ্ছে তার সবকিছুই ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে।
জিএসপি সুবিধা সম্পর্কে তিনি বলেন, একটা কথা মনে রাখতে হবে যুক্তরাষ্ট্র কথার চাইতে কাজ বোঝে বেশি। জিএসপি সুবিধা ফিরে পাওয়ার জন্য তো আপনাকে অ্যাকশন প্ল্যান বাস্তবায়ন কমপ্লিট করতে হবে। কিন্তু আমাদের সমস্যা হচ্ছে আমরা শুরু করেই মনে করি শেষ করে ফেলেছি। আর যুক্তরাষ্ট্র মনে করে একটা কাজ শেষ হলেই কেবল কাজটা শেষ হয়েছে। অতএব যতক্ষণ না বাংলাদেশ ১৬ পয়েন্টের অ্যাকশন প্ল্যান আগে বাস্তবায়ন করতে হবে, তার পূর্বপর্যন্ত আশ্বাসের কোনো গুরুত্ব নেই। এক্ষেত্রে জিএসপি সুবিধা রেস্টোর করার জন্য বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় পক্ষকেই উদ্যোগ নিতে হবে।