× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ছেঁড়াফাটা নোটে বাজার সয়লাব

আহমেদ তোফায়েল

প্রকাশ : ৫ ঘণ্টা আগে

আপডেট : ৫ ঘণ্টা আগে

গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

সারা দেশে খুচরা নগদ লেনদেন এখন এক বড় সংকটের মুখে পড়েছে। ঢাকা থেকে শুরু করে গ্রামের হাট-বাজারেও ছোট নোটের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

বাজারে ২, ৫, ১০, ২০ ও ৫০ টাকার নোটগুলোর সিংহভাগই এখন ছেঁড়াফাটা, জোড়াতালি দেওয়া ও অত্যন্ত ময়লাযুক্ত। অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে অনেক নোটের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিঁড়ে গেছে, স্কচটেপ দিয়ে জোড়া লাগানো হয়েছে কিংবা ব্যবহারের চোটে ভেতরের রঙ সম্পূর্ণ মুছে গেছে। প্রতিদিন এসব জরাজীর্ণ নোট নিয়ে ক্রেতা, বিক্রেতা ও পরিবহনকর্মীদের মধ্যে চরম বাগ্‌বিতণ্ডা হচ্ছে। অথচ ঠিক একই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের ভল্টে পড়ে আছে ১৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি নতুন নোট, যা এখনও বাজারে ছাড়া হয়নি। ফলে একদিকে যেমন নতুন নোটের সংকট তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে জরাজীর্ণ নোটের কারণে নগদ লেনদেনে এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

গণপরিবহন ও খুচরা বাজারে নিত্যদিনের ভোগান্তি

কাগুজে নোটের এই বেহাল দশার কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছে সাধারণ ও নিম্ন আয়ের মানুষ। কারণ, দেশের অনানুষ্ঠানিক খাতের বিশাল একটি অংশ এখনও সম্পূর্ণভাবে নগদ টাকার ওপর নির্ভরশীল। রাজধানীর মিরপুর-মতিঝিল রুটের একটি বাসের চালকের সহকারী শফিক জানান, যাত্রীরা প্রতিনিয়ত ছেঁড়া টাকা ভাড়া হিসেবে দেন, কিন্তু ভাঙতি হিসেবে ওই টাকা ফেরত দিলে তারা চরম ক্ষুব্ধ হন। বেসরকারি চাকরিজীবী নারগিস আক্তারের অভিজ্ঞতাও অভিন্ন; অফিস যাতায়াতের সময় বাসচালকের সহযোগীরা সহজে ছেঁড়া টাকা নিতে রাজি হন না। বাসের সুপারভাইজার খলিল জানান, যাত্রীদের দেওয়া ছেঁড়া টাকা দিনশেষে মালিকেরা জমা নিতে চান না, ফলে বাধ্য হয়ে অনেক সময় বাট্টা দিয়ে এসব নোট বাইরে বদলাতে হয়।

মানুষকে প্রতিদিন এমন নানা ঝামেলার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। ঢাকার একটি হাসপাতালে কর্মরত আরিফ হোসেন জানান, মানবিক কারণে দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগী ও তাদের স্বজনদের কাছ থেকে ছেঁড়া নোট নিলেও তা ব্যাংকে গিয়ে এক দিনে বদলে নেওয়া সম্ভব হয় না। এতে পেশাজীবীদের প্রচুর সময় নষ্ট হচ্ছে। মিরপুর ১ নম্বরের সবজি বিক্রেতা নাবিল বলেন, “পরিচিত ক্রেতারা ছেঁড়া নোট দিলে তা ফিরিয়ে দেওয়া কঠিন। কিন্তু ব্যাংকও একসঙ্গে সব নোট বদলে দেয় না”। 

নোট বদলে দিচ্ছে না ব্যাংক, বাড়ছে দালালের দৌরাত্ম্য

বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, দেশের সব ব্যাংকের প্রতিটি শাখায় গ্রাহকদের কাছ থেকে ছেঁড়াফাটা ও ময়লাযুক্ত নোট গ্রহণ এবং কাউন্টার থেকে সরাসরি বিনিময়ের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সাধারণ গ্রাহকদের অভিযোগ, কোনো ব্যাংকই এক দিনে সব জীর্ণ নোট বদলে দিচ্ছে না। কোথাও সীমিত পরিমাণে বদলানো হচ্ছে, আবার কোথাও কয়েক ধাপে আসার জন্য গ্রাহকদের ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত একটি ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ছোট নোটের সরবরাহ বর্তমানে সীমিত থাকায় সব গ্রাহকের জীর্ণ নোট একসঙ্গে বদলে দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না। মূলত নগদ অর্থের ভারসাম্য বজায় রাখতেই ধাপে ধাপে এই বিনিময় প্রক্রিয়া চালু রাখা হয়েছে। এ ছাড়া শাখাগুলোতে ছেঁড়া নোট বাছাই করার পর্যাপ্ত জনবলও থাকে না।

ব্যাংকগুলোর এই সীমাবদ্ধতা ও নতুন নোটের সংকটের সুযোগে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী দালাল চক্র। মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সদর দপ্তরে ছেঁড়া নোট বদলের নির্দিষ্ট কাউন্টারে প্রতিদিন শত শত মানুষের দীর্ঘ লাইন চোখে পড়ে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে না পেরে অনেকেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বাইরে দালালদের শরণাপন্ন হচ্ছেন। দালালরা ১০০ টাকার জীর্ণ নোটের বিনিময়ে সাধারণ মানুষকে মাত্র ৭০ বা ৮০ টাকা দিচ্ছে। অর্থাৎ, গরিব ও অসহায় মানুষের কষ্টার্জিত টাকা ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাট্টায় কেটে নেওয়া হচ্ছে।

কেন বাজারে আসছে না নতুন নোট

বাংলাদেশ ব্যাংকের কারেন্সি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বাজারে নতুন ছোট নোটের সরবরাহ কমার প্রধান কারণ টাকা ছাপানোর কাগজ ও কালি সংগ্রহের জটিলতা। নোট মুদ্রণের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সময়মতো পাওয়া যাচ্ছে না। কিছু ক্ষেত্রে বিদেশ থেকে আমদানি করা কাগজ মানসম্মত না হওয়ায় তা আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীর কাছে ফেরত পাঠাতে হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এ বিষয়ে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘চাহিদার তুলনায় টাকা ছাপানো যাচ্ছে না। তবে প্রতিনিয়ত টাকা ছাপা হচ্ছে। কোনো ব্যাংক যদি টাকা বদল করে না দেয়, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে বাংলাদেশ ব্যাংক সেই ব্যাংকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।’

একদিকে বাজারে কাঁচামালের অভাবে হাহাকার, অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের ভল্টে আগে ছাপানো ১৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি নতুন নোট সংরক্ষিত পড়ে আছে। দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এই বিশাল অঙ্কের নতুন নোট বাজারে ছাড়া হবে কি না, সে বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহাদৎ হোসাঈন সিদ্দিকীর মতে, ইতোমধ্যে ছাপানো নোটগুলো ব্যবহার না করে নতুন করে একই পরিমাণ নোট মুদ্রণ করতে গেলে রাষ্ট্রকে বিশাল অঙ্কের অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বহন করতে হবে। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এই দ্বিগুণ ব্যয় এড়ানোই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত।

ক্যাশলেস ভাবনার বাস্তবতা ও সীমাবদ্ধতা

গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ ব্যাংক ‘ক্যাশলেস সোসাইটি’ বা নগদবিহীন সমাজ গড়ার ওপর জোর দিচ্ছে। মোবাইল ব্যাংকিং বা এমএফএসের (যেমন : বিকাশ) ব্যবহার আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। নীতিনির্ধারকদের ধারণা ছিল, ডিজিটাল লেনদেন বাড়লে ছোট নোটের চাহিদা আপনাআপনি কমে আসবে। এ কারণে গত দুই বছর বাংলাদেশ ব্যাংক ৫০০ ও ১০০০ টাকার উচ্চ মূল্যমানের নোট মুদ্রণেই বেশি মনোযোগ দেয়, আর ছোট নোটের মুদ্রণ কোটা হ্রাস পায়।

কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। কাঁচাবাজার, টং দোকান, রিকশা ও সাধারণ গণপরিবহনে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা এখনও কার্যকরভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া একটি বড় নোট ছাপাতে যে পরিমাণ খরচ হয়, ছোট নোট ছাপতেও প্রায় কাছাকাছি খরচ হয়। অথচ মানুষের হাতে বেশি ঘোরার কারণে ছোট নোট অত্যন্ত দ্রুত নষ্ট ও জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে।

আন্তর্জাতিক মডেল ও প্রতিবেশী দেশের অভিজ্ঞতা

ছেঁড়াফাটা ও ছোট নোট ব্যবস্থাপনায় প্রতিবেশী দেশগুলোর সফল মডেল বাংলাদেশের জন্য ভালো উদাহরণ হতে পারে। ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (আরবিআই) ছোট নোটের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত ‘কয়েন মেলা’ বা ‘নোট এক্সচেঞ্জ ক্যাম্প’-এর আয়োজন করে। ১০ টাকার নোটের স্থায়িত্ব বাড়ানোর জন্য তারা পলিমার বা প্লাস্টিক নোটের পরীক্ষামূলক ব্যবহার করেছে। এ ছাড়া ভারতে বাণিজ্যিক ব্যাংকের প্রতিটি শাখায় ছেঁড়া নোট বদলের জন্য নির্ধারিত কাউন্টার থাকা বাধ্যতামূলক।

অন্যদিকে, পাকিস্তানে পাঁচ রুপির কাগজের নোটের ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করে সেগুলোকে ধাতব কয়েনে রূপান্তর করা হয়েছে। সেখানে ১০ ও ২০ রুপির জীর্ণ নোট বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ধ্বংস করার প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে তাদের বাজারে বাংলাদেশের মতো ছেঁড়া নোটের স্থায়ী কোনো সংকট তৈরি হতে পারে না।

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা